পুরুষমানুষ কি তাই পারে?
রাসুর মত মেরুদণ্ডহীন পুরুষ?
তবু এমনি মিথ্যে শপথের চোরাবালির উপরই তো ঘর বাঁধতে হয় মেয়েমানুষকে।
১৩. যজ্ঞির জন্যে ছানাবড়া ভাজা হচ্ছে
যজ্ঞির জন্যে ছানাবড়া ভাজা হচ্ছে। ভিয়েনের ‘চালা’য় বড় বড় কাঠের উনুন জ্বেলে কারিগররা লেগে গেছে ভোর থেকে। প্রথমে বোঁদে ভেজে স্তুপাকার করে রেখেছে কাঠের বারকোশে, এখন থেকে শুরু হয়েছে। ছানাবড়া। প্রচুর পরিমাণে না করলেও চলবে না, নিমন্ত্রিতদের পেট উপচে খাওয়ানোর পর আবার সরাভর্তি ছাঁদা দিতে হবে তো। তা ছাড়া যখন কুল্লে ওই দু-রকম মিষ্টি!
তাড়াহুড়োর যজ্ঞি, ওর বেশী আর সম্ভব হল না, অথবা সেটাও হয়তো ঠিক কথা নয়, মোটামুটি কথা মাত্র। রামকালী চাটুয্যে যদি দরকার বুঝতেন, তা হলে একদিনের মধ্যেই কাটোয়া কি গুপ্তিপাড়া থেকে ওস্তাদ ময়রা আনিয়ে পাঁচ-সাত রকম মিষ্টি বানিয়ে তোলাও অসম্ভব হত না তার পক্ষে। কিন্তু দরকার বোধ করেন নি তিনি।
রাসুর প্রথম বিয়েতে ঘটা হয়েছিল বিস্তর, গ্রামে এখনও তার গল্প ফুরোয় নি। মিষ্টির কারিগর এসেছিল নাটোর থেকে, কেষ্টনগর থেকে, মুড়োগাছা থেকে। কাঁচাগোল্লা ক্ষীরমোহন মতিচুর সরভাজা ছানার ছিলিপি খাজা অমূতি নিখুঁতি ইত্যাদি করে বারো-তেরো রকম মিষ্টি হয়েছিল। আর মাছের কথা তো বলেই শেষ হবে না। এক-একজনের পাতে বড় বড় এক-একটা মালসা ভর্তি মাছের তরকারি বসিয়ে দিয়ে আবার তিন-চারবার করে পরিবেশন। তা ভিন্ন রান্নার পদ তো বাহান্ন রকম, বাহান্ন ব্যঞ্জন নইলে আবার ঘটা কিসের?
কুমোরবাড়ি বরাত দিয়ে সাইজের হাঁড়ি গড়িয়ে আনা হয়েছিল ঝোড়া ঝোড়া, তাতেই গলা উপচে মিষ্টির ছাঁদা। যজ্ঞির জের চলেছিল দিন পনেরো ধরে।
সে কথা আলাদা। সে বিয়ের সঙ্গে এ বিয়ের তুলনা করার কোনও মানেই হয় না। অন্য বাড়ি হলে যজ্ঞিই করত না, নেহাৎ রামকালী চাটুয্যের বাড়ি বলেই এত আয়োজন। পরিমাণে প্রচুরই হচ্ছে, তবে ওই মাত্র দুরকম মিষ্টি, মোলো-কুড়ির মত রান্নার পদ। রান্না এখন চাপে নি, পাশের চালায় তার তোড়জোড় চলছে, হালুইকর ঠাকুর স্নান করতে গেছে।
এ গ্রামে হালুইকর ঠাকুর এনে রাধানোর প্রথা প্রবর্তন করেছেন রামকালীই। মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে দেখেছিলেন এ ব্যবস্থা। নইলে এ গ্রামে চিরদিন কাজেকর্মে গ্রামের ব্রাহ্মণ কন্যারাই বেঁধে থাকেন। সেটা রীতিমত একটা সম্মান-সম্ভ্রমের ব্যাপার। ডাকসাইটে রাঁধুনী বলে খ্যাতি আছে যাদের তাদেরই ডাকা হয় অনেক তোয়াজ করে। রান্নায় বসবার আগে পূর্ণপাত্র, নতুন কাপড়ের জোড়া, সধবা ব্রাহ্মণী হলে আলতা সিঁদুর–এই সব দিয়ে তবে পাকশালে ঢোকাতে হয় তাদের।
তথাপি এই রান্নার পর্ব থেকেই অনেক গদাপর্ব মুষলপর্ব বেধে যায়। গ্রামের যে একদল ছুতো খুঁজে বেড়ানো লোক আছে, তারাই যজ্ঞি দেখলে দক্ষযজ্ঞের আয়োজন করবার তালে ঘোরে। মন কষাকষি, কথান্তর, মান-অভিমান, এসব প্রায় যজ্ঞিরই অঙ্গ। রামকালী ওসব ঝামেলার মধ্যে নেই। পরমা দিয়ে লোক আনাবেন, কাজ করাবেন, চুকে গেল। রাধুনী বামুনের হাতে খেতে যাদের আপত্তি, তারা যাও বিধবার হেসেলে ভর্তি হও গে। মাছ জুটবে না।
তা সে দু-চারজন নিতান্ত নিষ্ঠাপরায়ণ গ্রামবৃদ্ধ ছাড়া না হু করে সকলেই বসে পড়ে রামকালীর বাড়ির ভোজে। ওস্তাদ কারিগরের রান্নার হাত, রামকালীর দরাজ হাত, আর রামকালীর প্রতি সমীহ (শোধ এই ত্রিশক্তির আকর্ষণে সকলেই প্রায় নরম হয়ে আসে। পয়সা যে এ অঞ্চলে কারুরই নেই তা তো নয়, কিন্তু এমন দরাজ হাত? এত বড় দিলদরিয়া মন?
খাঁটি গাওয়া ঘিয়ে সদ্য কাটানো টাটকা ছানার মিষ্টান্ন ভেজে তোলার সুগন্ধে শুধু আশপাশেরই নয়, সারা গ্রামখানারই বাতাস যেন ম ম করছে। বাড়ি বাড়ি ছোট ছেলেপুলেদের ঘরে আটকে রাখা দুঃসাধ্য হচ্ছে তাদের অভিভাবকদের।
পায়ে রূপোর বোল দেওয়া খড়ম, গায়ে বেনিয়ান, পরনে নেত্রকোণার থান। সবদিকে চৌকস হয়ে তদারকি করে বেড়াচ্ছেন রামকালী। শুধু মিষ্টির ভিয়েনে শেকড় গেড়ে বসে থাকবার ভারটা দিয়েছেন বড়দা কুঞ্জকে। ওর থেকে বেশী দায়িত্বর কাজ কুঞ্জকে দেওয়া চলে না।
.
গয়লারা দইয়ের ‘ভার’ এনে নামিয়েছে, ক’মণ দইয়ের যোগান দিতে পেরেছে তারা, দাঁড়িয়ে তারই হিসেব নিচ্ছিলেন রামকালী, হঠাৎ নেড়ু এসে কাছে দাঁড়াল। রামকালী গ্রাহ্য করতেন না, কিন্তু নেড়ু একেবারে গায়ের কাছে দাঁড়িয়েছে, ভাবটা যেন কিছু বক্তব্য আছে। গয়লাদের উপর চোখ রেখেই রামকালী মাথাটায় একবার হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, কি রে নেড়ু?
নেড়ু সভয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে আস্তে বলল, একবার অন্দর বাড়িতে যেতে বলছে।
অন্দরবাড়িতে যেতে বলছে? কাকে বলছে?
তোমাকে।
রামকালী ভুরু কুঁচকে বলেন, আমাকে এখন যেতে বলছে? পাগলটা কে হল? অগ্রাহ্যভরে আবার অদূরবর্তী গোয়ালাদের দিকেই মন দেন, বলিস কি রে তুই, ওই পাঁচ মণ বৈ দই দিয়ে ওঠতে পারছিস না! তা হলে আমার উপায়? তুই ভরসা দিলি
তুষ্টু মাথা চুলকে বলে, আজ্ঞে ভরসা তো দেছলাম, কিন্তু মা ভগবতীরা যে আমাকে নিভর্সা করে ছাড়লেন। কাল রেতে তো আর নিদ্রেই দিই নি, চৌদিকে সকল গোহালার ঘরে ঘরে বরাত দিয়ে দিয়ে বেড়ায়েছি, তা সবাইয়ের ঘরের দই যোগসাজস করে এই হল!
