বড়বৌ, তুমি এমন ব্যাভার করলে আমার আত্মঘাতী হওয়া ছাড়া আর উপায় থাকবে না তা বলে দিচ্ছি– রাসুও কঠিন হতে জানে, তাই বাধন আলগা দিয়ে বলে, এই চললাম মেজকাকার ওষুধের ঘরে। তাজা গোখরো সাপের বিষ সঞ্চয় আছে। কোথায় আছে তাও আমার জানা। এর পর কিন্তু বিধবা হলে দোষ দিও না আমায়!
বিধবা!
বুকটা থর থর করে ওঠে সারদার। বরং একশটা সতীন নিয়ে ঘর করবে সারদা, বিধবা হওয়ার মত অভিশাপ আর কি আছে? কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে বলাই বা যায় কি?
তা হলে চললাম। এই জনের শেষ দেখা। বলে রাসু দরজার কাছে এগোয়, আশা এই যে এবার সারদা মাথা খাওয়ার অনুরোধ জানাবে, কিন্তু সারদা যেন অনড়।
ভেবেছিলাম ওকে চিরদিনের মত ত্যাগ দিয়েই রাখব, তুমি আমার যে প্রাণেশ্বরী সেই প্রাণেশ্বরীই থাকবে- স্বগত উচ্চারণে আক্ষেপ প্রকাশ করে দরজার হুড়কোয় হাত লাগায় রাসু, কিন্তু তুমি পতিহন্ত্রী হয়ে নিজের পায়ে কুড়ল মারলে বড়বৌ!
হুড়কোটা খুলে পাশে রাখল রাসু।
এবার সারদা কথা বলল, কিন্তু এ কী কথা! এই কি প্রেমে পাগলিনী অবলা বালার ভাষা?
রুদ্ধকণ্ঠে সারদা বলে উঠেছে, ঘরের পরিবারের সঙ্গে যাত্রা-গানের মতন কান্নার সুরে কথা কইছ কেন? হুড়কো খুলে বেরিয়ে গেলেই বুঝি খুব পৌরুষ হবে? তোমার গোখরো বিষ আছে, আর আমার দড়ি-কলসী নেই?
তোমার প্রাণটা পাথরে গড়া বড়বৌ! মেজকাকা যখন আমার গলায় গামছা মোড়া দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে গেল, তখন তার সামনে গিয়ে বলতে পারলে না, আমারও দড়ি-কলসী আছে! ঠিক আছে, সবাইকে এবার দেখিয়ে দিচ্ছি–ভালমানুষ রাসু কি করতে পারে!
এই প্রকাণ্ড বীররসের ভূমিকাটি অভিনয় করে কপাটটা ধরে হ্যাঁচকা টান মারল রাসু, কিন্তু–টানার সঙ্গে সঙ্গেই পরিস্থিতিটা বুঝতে দেরি হল না, দরজার বাইরে শেকল এ কাজ কে করল?
মেজখুড়ী?
কিন্তু তাঁর পক্ষে কি এ ধরনের চপল রসিকতা সম্ভব? অথচ তা ছাড়া আর কে? রাসু যে বাড়ির মধ্যে এসেছে, তাই তো কেউ দেখে নি। মেজখুড়ী তো আজকের নাট্যকার।
বাইরে থেকে বন্ধ!
একটা বিপন্ন স্বর আস্তে ঘরে ছড়িয়ে পড়ল।
বন্ধ!
সারদারও এতক্ষণকার নীরবতা ভঙ্গ হল বিস্ময়ে ভয়ে।
তাই তো দেখছি রাসুর কণ্ঠে ব্যাকুলতা, এখন উপায়? যদি সকাল পর্যন্ত বন্ধ থাকে? বড়বৌ, কি হবে?
সহসা অদ্ভুত একটা কাণ্ড ঘটে।
একেবারে অভাবিত অপ্রত্যাশিত। হয়তো বা সারদা নিজেও এক মুহূর্ত আগে এটা কল্পনা করতে পারত না। ভাবতে পারত না তার কান্নায় বুজে আসা কণ্ঠ সহসা অমন কৌতুকের লীলায় হেসে উঠবে। সে হাসির শব্দ চাপা বটে তবু রহস্যে উচ্ছ্বসিত।
তা এই ধরনেরই স্বভাব বটে সারদার, নিতান্ত দুঃখের সময়ও হাসির কথা হলে হেসে ফেলা। কিন্তু আজকের কথা যে আলাদা। আজ সারদার মরণ-বাচনের সমস্যা। আজ কান্নায় গলা বুজে রয়েছিল সারদার। তবু রাসুর এই বিপন্ন বিপর্যস্ত কণ্ঠ থেকে তাকে কী যে কৌতুকের যোগান দিল, উচ্ছ্বসিত রহস্যে হেসে উঠল সে। হেসে উঠে বলল, কী আর হবে! দায়ে পড়ে মশাইকে এখন পরনারীর সঙ্গে রাত কাটাতে হবে!
রাসু চমকে গেছে, থমকে পড়েছে। তবে কি এতক্ষণ ছলনা করছিল সারদা? সতীন হওয়ায় তেমন কিছু লাগে নি তার? এ হাসি এ কথা তো রীতিমত প্রশ্রয়ের।
অতএব দরজা নিয়ে মাথা পরে ঘামালেও চলবে, এখন এদিকের ঘাঁটি সামলে নেওয়া যাক।
খোলা হুড়কো আবার দরজায় উঠল।
অনাদৃত পালঙ্কের বিছানা আবার স্পর্শের উষ্ণতা পেল।
না, একেবারে সহজে ধরা দেবে না সারদা। সে সত্যবদ্ধ করিয়ে নেবে স্বামীকে।
থাক, আমাকে স্পশ্য করতে হবে না, আগে মা সিংহবাহিনীর নামে দিব্যি কর, আমি বেঁচে থাকতে ছুটকিকে ছোঁবে না?
রাসুর বুকটা কেঁপে ওঠে।
শপথটা যে মারাত্মক। ভয়ে ভয়ে বলে, সিংহবাহিনীর নামে দিব্যি করা কি ভাল বড়বৌ?
মনে পাপ থাকলে ভাল নয়। একমন একপ্রাণ থাকলে ভয়ের কি আছে?
তবু, ঠাকুর-দেবতা বলে কথা!
বেশ তো, আমি তোমায় সাধি নি। নাই বা আর স্পশ্য করলে আমায়!
হায় মা সিংহবাহিনী, এমন ঘোরতর বিপদে তোমার গ্রামের আর কেউ কখনও পড়েছে?
একদিকে একখানি অপরাধবোধের ভারে পীড়িত আর নতুন আশায় উদ্বেল ব্যাকুল হৃদয়, আর অপরদিকে এক অনমনীয়া পাষাণী।
তবে কি হাসিটাই ছল?
তাই সম্ভব, নইলে দিব্যি গুছিয়ে ছেলের কাছ ঘেঁষে শোবার আয়োজন করছে কেন সারদা?
বড়বৌ!
আঃ, কেন জ্বালাতন করছ? সারদার বুকে পরম ভরসা দরজার বাইরে শেকল লাগানো, রাগ করে ছিটকে বেরিয়ে যাবার উপায় নেই রাসুর।
আঃ, কে সেই দেবী, যে রাসুকে এমন বন্দী করে ধরে দিয়েছে সারদার কাছে? স্বয়ং মা সিংহবাহিনী নয় তো?
তা হলে তোমার দয়া হবে না?
সোয়ামী, গুরুজন, তুমি আবার দয়ার কথা তুলছ কেন গো? পরিবারই হল গিয়ে কেনা দাসী।
আচ্ছা বেশ, করছি দিব্যি। হল তো?
কই করলে?
মনে মনে করেছি।
মনে মনে? হু! মনের কথা বনে যায়। মুখে বল।
বেশ বেশ, এই বলছি, তুমি ছাড়া আর কাউকে ছোঁব না, সিংহবাহিনী সাক্ষী।
আমি ছাড়া নয়, আমি বেঁচে থাকতে
এটুকু অনুগ্রহ করে সারদা।
ওই হল। কে আগে যায় কে পরে যায়, বলা যায় কি?
আমার কুষ্ঠিতে আছে সধবা মরব। সারদা আত্মপ্রসাদের হাসি হাসে, কিন্তু মনে থাকে যেন মা সিংহবাহিনী সাক্ষী!
থাকবে থাকবে।
কিন্তু সত্যিই কি মনে ছিল?
রাসু কি শেষ অবধি মা সিংহবাহিনীর মর্যাদা রাখতে পেরেছিল?
