রামকালী এবার আর একটু হেসেছিলেন, তোমার মেজ বৌমার যদি এমন ইলুতে আশা হয়েই থাকে তো সে আশায় ছাই পড়াই উচিত মা।
ছাই পড়াই উচিত?
আঁচল দিয়ে চোখ মুছেছিলেন দীনতারিণী। মেজ বৌমার আশাভঙ্গের কল্পনায় যত না হোক, নিজের আশাভঙ্গে। কুঞ্জ যে জন্মভোর গায়ে হাওয়া দিয়ে বেড়িয়ে সংসারের সব কিছুর সেরা ভাগটা ভাগ করে, এটা কি চিরকাল সহ্য হয়? দীনতারিণীর আশা ছিল, এই ঘরখানার ব্যাপারে অন্তত কুঞ্জ আর কুঞ্জের বৌয়ের মুখটা ছোট হবে। সেই আশায় ছাই পড়ল। তাই কেঁদে ফেলে বললেন, ছাই পড়াই উচিত?
উচিত বৈকি। ভবিষ্যতে তা হলে আর কখনও এমন বেয়াড়া আশা জন্মাতে পাবে না।
এর পর দীনতারিণী নীরবে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছিলেন চন্দননগর থেকে ছুতোর এসে ঢুকল সেই ঘরে। হ্যাঁ, জোড়াপালঙ্ক বানাতে হলে ঘরের মধ্যে বসেই বানাতে হয়, বাইরে থেকে গড়ে এনে লাগিয়ে দেওয়া রীতি তখনও হয় নি।
বহুবিধ কারুকার্য করা পালঙ্ক।
ওর জন্যে চন্দননগরের ছুতোরদের ভাত যোগাতে হয়েছিল মাস দেড়েক ধরে। খেয়ে, মজুরি নিয়ে আর নতুন কাপড়ের জোড়া বখশিশ আদায় করে ছুতোররা চলে গেল, তার পরই বিয়ে হল রাসুর। নতুন পালঙ্কে ফুলশয্যে হল।
সেই পালঙ্ক ছেড়ে সারাদিন আজ মাটিতে পড়েছিল সারদা। এখনও খুড়শাশুড়ীর নির্দেশমত নিঃসাড়ে ঘরে ঢুকে হুড়কোটা লাগিয়েই ছেলের তল্লাসমাত্র না করে ঝুপ করে শুয়ে পড়ল মাটিতেই।
ঘরে ঢুকে না তাকিয়েও টের পেয়েছিল সারদা, তার আশার আশঙ্কাটা মিথ্যে নয়। আঘ্রাণে, অনুমানে, হৃৎস্পন্দনে বুঝিয়ে দিয়েছিল সারদাকে ঘরে তোমার সাতরাজার ধন মানিক।
এ যেন আবার নতুন বিয়ের নতুন বর। দ্বিরাগমনে এসে প্রথম রাত্তিরে যখন পাঁচটা সমবয়সী মিলে সারদাকে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে দরজায় শিকল লাগিয়ে পালিয়েছিল, তখন এমনি বুক ধড়াস করেছিল সারদার। তবু তো তখন মাত্র বারো বছর বয়েস। আর এখন ষোলো। ষোড়শীর হৃদয় তো আলোড়নে আরোই উত্তাল হবে।
.
ঘরে যে অপরাধী আসামী অবস্থান করছিল তার অবস্থাও অবশ্য সারদার চাইতে কিছু উন্নত নয়। তার বুকের মধ্যে হাতুড়ি পিটছে। জীবনে আর কখনও সারদার মুখোমুখি দাঁড়াতে পারে, এ আশা বুঝি ছিল না রাসুর। সারাদিন শুধু ভেবেছে জীবনের সমস্ত আনন্দ-আহ্লাদের সমাধি হয়ে গেল তার।
মেজখুড়ী কেন অন্দরে ডেকে পাঠিয়েছিল, তাও ঠিক বুঝতে পারে নি। ভেবেছিল আবার কোন বিষম শাসনের পাকচক্রে পড়তে হবে এসে, কিন্তু এসে যা শুনল অভিনব।
সারদা নাকি রান্নাঘরে কাজে ব্যস্ত, আর ভুবনেশ্বরীরও কাজের তাড়া, ভাঁড়ারের দিকে না গেলেই নয়, তাই ঘুমন্ত খোকাকে একটু আগলাতে হবে রাসুকে।
কিছু নয়, শুধু ঘরে একটু থাকা।
বোকা রাসু তখনও কিছু সন্দেহ করে নি। শুধু একটু তাজ্জব বনে গিয়েছিল প্রস্তাবে। দেশসুদ্ধ লোক থাকতে কিনা ছেলে আগলাবার জন্যে রাসুকে ডাকিয়ে আনা হল বার-বাড়ি থেকে! আশ্চর্য নয় তা কি যে রাথুর মা ডাকতে গিয়েছিল, সে-ই তো পারত কাজটা। করেও তো বরাবর তাই। তবু কিছু বলতেও পারে নি। না প্রতিবাদ, না প্রশ্ন। নতুন বৌয়ের ব্যাপারে যতটা লজ্জা, ঠিক ততটাই লজ্জা এই নতুন ছেলের বিষয়েও।
সুড়সুড় করে তাই ঘরে ঢুকেছিল রাসু। আর ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই বুকের মধ্যে সন্দেহের হাতুড়ি পড়েছিল।
মেজখুড়ীর এই ডাকিয়ে আনাটা ছল নয় তো! মেজখুড়ীকে তো এমনিতেই খুব ভালবাসে রাসু, এবার যেন ইচ্ছে হল পুজো করে তাকে। ফস্ করে প্রদীপটা নিভিয়ে দিয়ে কাঠ হয়ে ভাবতে লাগল।
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে খেয়াল করল ঘরে খিল পড়েছে, আর পরমূহুর্ত থেকেই অনুভব করল, বাতাসহীন ঘরের চাপা গুমোটটা যেন একটা কান্নার ধাক্কায় কেঁপে উঠছে।
টপ টপ্ করে দু’ফোঁটা জল পড়ল রাসুর চোখ থেকে। পুরুষ মানুষ! তা হোক, মানুষ তো বটে।
ধড়মড় করে উঠে বসল সারদা। একটা বলিষ্ঠ আবেষ্টন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করতে করতে রুদ্ধকণ্ঠে বলল, আর কেন, আর কেন?
আর কিছু বলতে পারল না। চোখ দুটো বিশ্বাসঘাতকতা করে বসেছে। সারাদিন ধরে প্রতিজ্ঞা করেছিল, যদি কখনও সেই নিষ্ঠুরটার সঙ্গে দেখা হয়, কাঁদবে না, মুখ মলিন করবে না। পরস্য পরের মত উদাসীন থাকবে। কিন্তু পরিস্থিতিটা সমস্তই গোলমাল করে দিল।
তাই কি দু-চার ফোঁটা?
একেবারে ধারার শ্রাবণ!
একে কি করে রোধ করবে সারদা? কোন্ বাঁধ দিয়ে ঠেকাবে?
বড়বৌ!
এতটুকু শব্দের মধ্যে কত মিনতি কত আবেদন!
কিন্তু এই করুণ মিনতিভরা ডাকেই বা সাড়া দিচ্ছে কে?
বড়বৌ, আমার কি দোষ? আমার ওপর বিরূপ হচ্ছ কেন? বুঝতে পারছ না আমার প্রাণটাও গুড়ো হয়ে যাচ্ছে!
ধারা শ্রাবণে বন্যা এল।
থাক থাক, আর মন-মজানে মিছে কথায় কাজ নেই। পুরুষের প্রাণে আবার দরদ!
বড়বৌ, এই আমার মাথা খাও, বিশ্বাস কর তোমার মতনই জ্বলে পুড়ে খাক হচ্ছি আমি। তুমি যে আমাকে বিশ্বাসঘাতক ভাবছ, এ কষ্ট আমি রাখব কোথায়?
রাখবার দরকার কি? সারদা কান্না সামলে কঠোর হবার চেষ্টা করে, কাল তোমার নতুন ফুলশয্যে, নতুন সুখ, আজ আবার এত দুঃখ কষ্টর পালা গাইবার কি আছে?
বড়বৌ, বল কি করলে তুমি আমায় বিশ্বাস করবে?
বলিষ্ঠ আবেষ্টনের চাপটা যেন পিষে ফেলতে চাইছে সারদাকে, কি করে আর কঠিন থাকবে সারদা? তবু শেষ চেষ্টা করে, আমার বিশ্বাস অবিশ্বাসে কি এসে যাচ্ছে তোমার? ছেলের মা বুড়ীকে ছেড়ে এখন কচি তালশাঁস—
