সামনে সদু সামনে মুকুন্দ মুখুয্যে, সামনে সরল, সেই মুহূর্তে সাধন সন্দেশের ঠোঙা হাতে নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে।
সত্য কি কারো দিকে তাকিয়ে দেখে?
বোধ হয় না।
সত্য নিঃশব্দে রান্নাঘরে গিয়ে ঢোকে। আর বোধ করি ফেলে ছড়িয়ে চলে যাওয়া হাতের কাজটা আবার গুছিয়ে তুলতে থাকে।
সদুতে সদুর স্বামীতে একটা অর্থপূর্ণ দৃষ্টিবিনিময় হয়। তারপর সদু উত্তেজিত নবকুমারকে বসিয়ে একখানা হাতপাখা দিয়ে মাথায় বাতাস দিতে দিতে খাদে গলা নামিয়ে বলে, আর ক্ষেপে উঠে কি করবি ভাই? এতদিনে তো সবই পরিষ্কার হয়ে গেল। চিরদিন মাথাটা একটু ইয়ে ছিল, এখন ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তোর কপালে ভগবান এমন তেতুল গুলবেন, তা কখনো ভাবি নি।
মামীর কাছে থাকতে সদুর যেমন ধারালো পরিষ্কার কথাবার্তা ছিল তেমন যেন আর নেই। সদু গেরস্থর গিন্নী হয়েছে। তাই গিন্নীদের মত কথা রপ্ত করেছে।
নবকুমার বলে, এক ঘটি জল দাও সদুদি!
সদু তাড়াতাড়ি জল এনে হাতে দিয়ে বলে, খা, খেয়ে এইবার মনের বল করে কবরেজ ডেকে এনে চিকিচ্ছে করা। নেহাত হাতেপায়ে ছেকল না পরাতে হয়, সেটা তো দেখতে হবে!
নবকুমারের বোধ করি জল খেয়েই বল বাড়ে। সে বীরবিক্রমে বলে, পাগল না হাতী! সব বদমাইশি! লোকের সামনে আমাকে হেয় করাই ওর একমাত্র কাজ। জীবন-ভোর তাই দেখলাম।
হ্যাঁ, বড় হয়ে পর্যন্ত ছেলেরাও তাই দেখছে। ছেলেবেলায় মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল সহানুভূতি ছিল, মায়ের কথা বেদবাক্য বলে ভাবতো ছেলেরা এবং বাবাকে “অল্পবুদ্ধি” বলে মনে মনে করুণা করতো। কিন্তু বাবার ওপর করুণাটা বজায় থাকলেও, বড় হয়ে পর্যন্ত মায়ের ওপর থেকে যেন সহানুভূতি অনেকটা চলে যাচ্ছে, বিশেষ করে বড় ছেলেটার।
সে ভাবতে থাকে
এ কী!
প্রত্যেকটা ব্যাপারে তাল ঠুকে লড়াই।
শান্তির সংসারে সেধে অশান্তি ডেকে আনা, আর বাবাকে হেয় করা!
এটা অন্যায়।
সুহাসকে নিয়ে কী কাণ্ডই করলেন! তবু তার পিছনেও না হয় একটা যুক্তি আছে। মানুষটার একটা গতি করার দরকার ছিল। কিন্তু নিতাই কাকার শালী যে মরে ভূত হয়ে গেছে, তার জন্যে এ কী কেলেঙ্কারী! নিজের স্বামী-পুত্রকে এইভাবে শাস্তি দিয়ে, সেই অদেখা অচেনা অপরাধীকে শাস্তি দেওয়াতে হবে?
বাঁচবে তাতে মড়া?
বাঁচবে না। শুধু নবকুমার আর তার ছেলেদের মৃত্যুতুল্য অপমান বয়ে বেড়াতে হবে। পাড়াসুদ্ধ সমস্ত লোক তো দেখলো সাহেব পুলিস ঢুকলো তাদের বাড়িতে। সবাই জল্পনা-কল্পনা করবে না, হয়েছে কি?
কে তাদের বোঝাতে যাবে?
আর বোঝালেই বা কে বিশ্বাস করবে? এরপর হয় এ পাড়ার বাস ওঠাতে হবে, নয় দু’গালে চুনকালি মেখে আর কানে তুলো দিয়ে পথে বেরোতে হবে। পিসী যা বলছে, তাই হয়তো সত্যি। মাথার মধ্যে কোনো গোলমালই আছে।
আশ্চর্য।
এত বুদ্ধি, এত বিদ্যে, এত কর্মদক্ষতা, তার মাঝখানে এ একটা কি বিটকেল বুদ্ধি?
ছেলেবেলাকার মাকে মনে পড়ে।
কত উজ্জ্বল, কত আনন্দময় সেই স্মৃতি। অন্তত ছেলেদের কাছে সত্যর সেই উজ্জ্বল আনন্দময়ী মূর্তিটাই ছিল।
নবকুমারের আড়ালে চুপি চুপি ছেলেদের সঙ্গে কত জল্পনা-কল্পনা। ভবিষ্যতের ছবি এঁকে কত রঙের তুলি বুলোনো! দুই ছেলে সত্যবতীর দুই দিকপাল হবে, দেশ থেকে যত অনাচার কুসংস্কার আর কু-প্রথা দূর করবার চেষ্টায় লাগবে একজন, আর একজন দেশ স্বাধীন করবার কাজে আত্মনিবেদন করবে।
তবে সকলের আগে বিদ্যার্জন।
বিদ্বান না হলে কোনো কাজেই লাগতে পারবি না তুড়ু, কেউ তোকে পুঁছবে না। আর তা ছাড়া ভালমন্দ-বোধই বা আসবে কোথা থেকে? তোরা জজ হবি, ম্যাজিস্ট্রেট হবি, নয়তো ডাক্তার আর মাস্টার হবি। এমন গুণ দেখাবি, লোকে বলবে, হ্যাঁ, ছেলেদের মানুষ করেছে বটে।
শিশু-মনে এই চাকচিক্যের ছবি কি মনোরম প্রভাবই বিস্তার করতো। কিন্তু বড় হয়ে ক্রমশই দেখছে মায়ের ভিতরের সেই ঔজ্জল্য যেন আগুন হয়ে উঠছে।
দেড়-দু’বছর বারুইপুরে থেকে এসে আরো যেন বদলে গেছে মা। এই মায়ের জন্যে ভালবাসার থেকে ভয় আসে বেশী।
ছোট ছেলেটা অবশ্য অনেকটাই মায়ের ভাবে অনুপ্রাণিত। কিন্তু এই সব চেঁচামেচি অশান্তিকে সে বড় ঘৃণা করে। সমাজের বিকৃতির বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে মানুষ নিজে যেন বিকৃত না হয়ে যায়, সেটাও তো দেখতে হবে।
নিতাইকাকার শালীর মৃত্যুর জন্যে মা যা করে বসলেন, তার মধ্যে সাহসের পরিচয় আছে সত্যি, কিন্তু একটু যেন দুঃসাহসই! অন্তত ছেলেদের সঙ্গে তো পরামর্শ করে কাজটা করতে পারতেন। তাছাড়া সাহেবদের যদি তাড়াতেই চাই আমরা, অসুবিধেয় গড়ে ওদের সাহায্য চাইতে যাব কেন? মার যদি সহজ অবস্থা থাকতো, কথাটা জিজ্ঞেস করতো সে। কিন্তু মা এখন ক্ষেপে আছে।
কিন্তু সত্যর ছেলেরা যা ভাবছে তা নয়। সত্য এখন আর ক্ষেপে নেই। সত্য স্তব্ধ হয়ে আছে। আর সত্য এখানকার সমস্ত কিছু বিস্মৃত হয়ে শুধু ভাবছে, সত্যর ছেলেরাও সাহেব দেখে ভয় পেয়ে পিছনে থাকলো, এগিয়ে গিয়ে কথা বলল না, মায়ের বক্তব্যটা বুঝিয়ে এবং গুছিয়ে বলবার জন্যে মায়ের পাশে এসে দাঁড়াল না!… যে ছেলেদের কলেজে পড়ানোর জন্যে জীবন পণ করছিল সত্য, যে ছেলেদের উপরই জীবনের সমস্ত আশা রেখে এসেছে সত্য!
হয় তো সত্যর আশাটা একটু বড়।
সত্য ছেলেদের ডিগ্রীটাই দেখছে, বয়েসটা দেখছে না। এই ব্যাপারটা ওদের বিচলিত করবার পক্ষে যথেষ্ট তা বুঝছে না।
