কিন্তু সত্য বুঝি তখন সত্যিই পরিবেশ পরিস্থিতির জ্ঞান হারিয়েছে, তাই ছেলের এই ডাকের ইশারায় কর্ণপাত না করে বলতেই থাকে, তোমার দেশে তো শুনি মেয়েমানুষের অনেক মান, অনেক সম্মান। সেই চোখ খুলে দেখতে পাও না, এই হতভাগা দেশে মেয়েমানুষকে কী অপমানের মধ্যে, কী লাঞ্ছনার মধ্যে ফেলে রেখেছে? আইন করে বন্ধ করতে পারো না এসব? নিত্যি নিত্য অনেক আইন তো বার করছো
বড়বৌ!
নবকুমার আর থাকতে পারে না, চেঁচিয়ে ডেকে ওঠে, আর ঠিক এই সময় ভবতোষ মাষ্টার এসে দাঁড়ান সরলের সঙ্গে সঙ্গে।
ঢুকবার মুখেই বোধ করি সত্যর এই তীব্র ভাষা তার কানে ঢুকেছে। তাই সত্যকেই উদ্দেশ্য করে শান্ত স্বরে বলে, ভিন্ দেশের লোক এসে আইন করে এদেশের সমাজের গ্লানি দূর করবে, এ আশা করো না বৌমা। দেশকেই করতে হবে।
মাস্টার মশাইকে এ বাড়িতে দেখে অবাক হতে গিয়েও, সঙ্গে সরলাকে দেখেই রহস্যভেদ হয়ে গেল সত্যর কাছে।
আস্তে মাথার কাপড়টা টেনে দিয়ে দূর থেকে আলগোছে একটা প্রণামের মত করে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল।
একটা নাকি প্রবাদ আছে, “বুক থেকে পাহাড় নামা”-ভবতোষ আসার পর নবকুমারের সেই অবস্থা। যাক বাবাঃ, আর তার করণীয় কিছু নেই! এবার সে ঘরে ঢুকে চৌকিতে শুয়ে পড়ে হাতপাখা নেড়ে হাওয়া খেতে পারে!
এখন অপেক্ষা মাস্টার আর সাহেবটার বিদেয় হওয়া। তারপর একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে। বহু সহ্য করেছে সে, আর নয়। মুখুয্যে মশাই এইমাত্র বলেছেন, স্ত্রৈণ পুরুষের স্ত্রীরা এইরকমই হয়। সেই বাক্য-দাহ সর্বাঙ্গে জ্বালা ধরাচ্ছে!
মাস্টারের সঙ্গে কিন্তু বেশী কথা হল না সাহেবের, শুধু সত্যর প্রেরিত চিঠি দেখাল সাহেব এবং একটু পরেই ‘গুডবাই’ বলে বিদায় নিল সে। ভবতোষ তাকে রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে এসে, এদের উঠোনে আর একবার এসে দাঁড়ালেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন, তোমার মাকে বলো সাধন, সাহেব কথা দিয়ে গেছে দোষীকে খুঁজে বের করে যথোপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করবে।… আর– মাস্টার মশাই একটু হাসালেন, আর তোমার মাকে অনেক অভিনন্দন জানিয়ে গেছে।
এতক্ষণে মুকুন্দ মুখুয্যের গলা নিজের কাজ করে। তিনি হুঁকো হাতে দাওয়া থেকে উঠে উঠোনে নেমে এসে বলেন, শুনলাম আপনি একসময় নবকুমারের শিক্ষক ছিলেন, সে হিসাবে নমস্কার জানানো উচিত, তা জানাচ্ছি, কিন্তু ওই যে কি বললেন, সাধনের মাকে সাহেব কি দিয়ে গিছে
অভিনন্দন ইয়ে প্রশংসা।
হুঁ, বুঝেছি। তা প্রশংসাটা কিসের?
ভবতোষ একবার এই গায়ে-পড়া অভব্য বুড়োটার দিকে দৃষ্টিপাত করেন, তারপর হয়তো ব্যঙ্গের খাদ মেশানো একটু পরিহাসের ধরনের হাসি হেসে বলেন, বুঝতে তো খুব অসুবিধে বার কথা নয়? সাহসের জন্য প্রশংসা করেছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সাহস কজনের থাকে। বলুন?
মুখুয্যে মুখ বিকৃত করে বলেন, লোকের ঘরে আগুন লাগাবার, লোকের মাথায় লাঠি বসাবার সাহসও একরকম সাহস, তা সকলের থাকে না স্বীকার করছি। তবে সাহস মানেই প্রশংসা পাবার যোগ্য সেটা স্বীকার করব না।
না করলেই বা কি করবার আছে! বলে ঈষৎ হেসে চলে যেতে চান মাস্টার। যাওয়া হয় না। নবকুমার তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসে বলে, মাস্টার মশাই, চলে গেলে চলবে না, একটু জল খেয়ে যেতে হবে।
বোধ করি বিপদতারণ মধুসূদনরূপী মাস্টার মশাইয়ের পরম উপকারের একটা প্রতিদান আবশ্যক বলে মনে করার প্রতিক্রিয়া এই প্রস্তাব!
তবে মাস্টার মশাই এ প্রস্তাবের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তাই চমকে তাকালেন আর বোধ হয় ভাবলেন, ধৃষ্টতার কেন সীমা থাকে না!
কিন্তু একদা যে ভবতোষ মাস্টার রামকালীকে তাঁর মেয়ের শ্বশুরবাড়ির দুঃখদুর্দশা বর্ণনা করে ওজস্বিনী ভাষায় চিঠি দিয়েছিলেন, সেই ছেলেমানুষ ভবতোষ তো আর নেই। তারপর অনেকগুলো দিন পার হয়ে গেছে। অনেক মানসিক দ্বন্দ্বের টানা-পোড়েনে পোড়খাওয়া আর অনেক জ্ঞান-অর্জনে পরিণত হয়ে ওঠা প্রৌঢ় ভবতোষ ভয়ানক কিছু একটা জবাব দিয়ে বসলেন না। শুধু মৃদু হেসে বলেন, পাগল!
পাগল কেন? বাঃ! ঋণী থাকবো না এই বাসনাতেই হয়তো নবকুমার আবার জেদ করে, এই রোদে তেতেপুড়ে এলেন। আপনার বৌমার মান-মর্যাদা রক্ষা করলেন, সে অমনি কেন ছাড়বে? আপনার বৌমা বলছে, একটু মিষ্টিমুখ না করিয়ে ছাড়বে না আপনাকে।
ভবতোষ আর একবার ভয়ঙ্কর ভাবে চমকালেন। বোধ করি কোনও একখানে হিসাব মিলাতে পারলেন না, কেমন অসহায় ভঙ্গীতে বললেন, কে? কে ছাড়বে না বলেছে?
এই যে, আপনার বৌমা! চোখের ইশারায় ইতিমধ্যেই সাধনকে দোকানে পাঠিয়ে ফেলেছে নবকুমার, তাই বুকের বল আছে। অতএব জোর গলায় বলে, সে এখন কলসীর জল ঢেলে আপনার জন্যে মিছরির পানা করছে—
নবকুমার ভেবেছিল এই ইশারাতেই মিছরির পানা বানানো হয়ে যাবে। কিন্তু কথা শেষ করতে হয় নি নবকুমারকে।
কলসীর ঠাণ্ডা জলে’র ইশারা কাজে লাগানো না। সত্যবতী বেরিয়ে এসে দৃঢ়স্বরে বললো, মিথ্যে কেন রোদে দাঁড়িয়ে পাগলের প্রলাপ শুনছেন মাস্টার মশাই! বাসায় যান!
ভবতোষ সহসা একবার স্পষ্ট চোখে সত্যর মুখের দিকে তাকালেন, তারপর আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেলেন।
ঠিক সঙ্গে সঙ্গে নবকুমার একটা কিম্ভুতকিমাকার কাজ করে বসলো। হঠাৎ দু হাতে ঠাস ঠাস করে নিজেই নিজের গালে চড়িয়ে বলে উঠলো, আর কেন, এইবার একখানা জুতো এনে মুখে মারো! মোলকলা সম্পূর্ণ হোক! ওইটুকুই তো বাকী আছে। স্ত্রৈণ পুরুষের ওইটাই বোধ হয় শেষ শাস্তি।
