কিন্তু সত্যিই বুঝছে না সত্য?
সত্য ভেবে পাথর হয়ে যাচ্ছে, সরল কি বলে মাস্টার মশাইকে ডেকে নিয়ে এল?
এতটুকু লজ্জা করল না?
ওরা কী না জানে?
দেখে নি মাস্টার মশাইকে কী অপমানিত হয়ে চলে যেতে হয়েছে এ বাড়ি থেকে?
হঠাৎ বিপদে পড়ে গিয়ে তাকেই ডেকে আনার মত প্রস্তাব নবকুমারের পক্ষে সম্ভব হতে পারে, কিন্তু সত্যর গর্ভের সন্তান স্বচ্ছন্দে সেই নিলর্জ কাজটা করতে পারলো কি করে?
সত্যর মাথাটা ধুলোয় লুটিয়ে দিল সত্যর ছেলে! আর কার কাছে? যেখানে সব চেয়ে সম্ভ্রম ছিল সত্যর।
সত্য তবে এখন কী করবে?
কাকে জিজ্ঞাসা করবে, সারাজীবন আমি যে পথে চলে এলাম, সে পথ কি ভুল পথ?
রান্নার কাজ শেষ হয়ে গিয়েছিল তবু চুপ করে বসেছিল সত্য রান্নাঘরে। ডেকে খেতে দেবার উৎসাহ পাচ্ছে না।
সদু চলে গেছে, কাজেই তাকেও ডেকে খেতে দিতে বলতে পারছে না। অনেকক্ষণ পরে সুবর্ণ খেলা ফেলে ছুটে এল। বলল, আজ বুঝি খাওয়াদাওয়া নেই? শুধু বসে বসে চিন্তা করলেই চলবে?
এত কথা শেখার বয়সটা নয়, তবু সারাক্ষণ ঠাকুমা এলোকেশীর সঙ্গে থেকে থেকে কথার ওস্তাদ হয়ে উঠেছে, কথা বললে বোঝে কার সাধ্যি ছ-সাত বছরের মেয়ে!
অবশ্য কেবলমাত্র এলোকেশীর দোষ দেওয়াও অধর্ম। পাকা কথা, প্রচুর কথা এ তো সুবর্ণর ঐতিহ্য, অনুক্রম!
সত্য কি ভুলে গেল সেকথা? তাই সত্য মেয়ের দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে তীব্রস্বরে বলল, ফের পাকা কথা?
সুবৰ্ণ মায়ের মূর্তিতে ভয় পেল। তাড়াতাড়ি বলে উঠল, খিদে পায় না বুঝি?
সত্যর জ্বলন্ত দৃষ্টি ঈষৎ কোমল হয়ে এল। বলল, দিচ্ছি ভাত, বাবার দাদাদের ঠাই করে দাও গে।
হ্যাঁ, ঠাই করা কী এক ঘটি জল দেওয়া এ সুবর্ণ শিখেছে। আরো কাজ শিখেছে, বিছানা পাতা বিছানা ভোলা, তাও টেনে টেনে পারে। পারে মায়ের সঙ্গে বসে শাক বেছে দিতে।
কাছে বসিয়ে কাজ শেখাতে শেখাতে বইয়ের পদ্যও শেখায় মেয়েকে। মুখে বানান শেখায়।
ঠাই করতে চলে গেল সুবর্ণ।
আর ওর পথের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবতে লাগল সত্য, এবার কি তবে শেষবারের মত এই মেয়েটার উপরই সব আশা রাখবে সত্য? সুহাসের মত হবে সুবর্ণ?
সুহাসকে সত্য গড়লো, ভোগ করতে পেল না।
অবিশ্যি মেয়েসন্তান ভোগ্যবস্ত নয়, তবু সুহাসের যদি এমন অদ্ভুত অঘটনের জীবন না হত, এমন করে তো চিরদিনের মত সব সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলতে হত না সত্যকে। সত্য তো তাকে দেখতে পেত।
নব নব রূপে বিকশিত হত সে সত্যর চোখের উপর। এ আর সত্যর দেখার উপায় রইল না, কেমন সংসার করছে সুহাস।
সুবর্ণ সত্যর চোখের সামনে বিকশিত হবে।
ছেলেরা শেষ অবধি বংশের ধারায় কাপুরুষই হবে। হবে স্ত্রী-বশ!…যেমন ছিলেন ঠাকুর্দা নীলাম্বর, যেমন নবকুমার!
নীলাম্বর অসৎচরিত্র, তবু স্ত্রীর ভয়ে কাঁটা। নবকুমারের তো কথাই নেই!
কিন্তু?
সত্য আজ নিজেকে বিশ্লেষণ করে দেখছে… সত্য কি নবকুমারের এই বশ্যতার পরিবর্তে উল্টোটা হলে সুখী হত?… অনেকবার মনের কোণে কোণে আলো ফেলে ফেলে দেখেছে সত্য, হত সুখী? সত্যর স্বামী যদি সত্যর যুক্তি খণ্ডন করে স্বমতে প্রতিষ্ঠিত থেকে বিপরীত ভাবে নিজেকে চালাতে পারতো, তাতেও সত্য সুখী হত?
নবকুমার তা নয়।
নবকুমার ফী কথার তাল ঠুকে স্ত্রীর কথার প্রতিবাদ করে। কিন্তু ওই পর্যন্তই। নিজের কোনো মত খাড়া করতে পারে না। শেষ পর্যন্ত সত্যই জয়ী।
কিন্তু কেবলমাত্র জয়ী হয়েই কি সুখ? পরাজয়েও কি সুখ নেই? যে পরাজয় স্বেচ্ছায় স্বীকার করে নেওয়া যায়, তেমন পরাজয়ের স্বাদ জীবনে কখনো পেল না সত্য।
তবে সুবর্ণই উঁচু হোক, মস্ত হোক। তাই ভাল, মেয়ের কছে ছোট হবে সত্য। যেন অবাক হয়ে বলতে পারে, বাবা কত বুদ্ধি তোর! এত কথা, এত তত্ত্ব, এত তথ্য শিখলি কি করে? যেন বলতে পারে, সুবর্ণ, তুই আমার মুখ রেখেছিস!
.
বাপ-ভাইকে গিয়ে যখন জানালো সুবর্ণ, ভাত বাড়া হয়েছে, তারা যেন হাতে চাঁদ পেল। যাক তা হলে সংসারটা আবার ছন্দে এলো। ওরা তো বসে বসে ভাবছিল আজ আর সত্য রান্নাবান্না করে নি!
এই মূল কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা ঘটলেই বড় মুশকিল।
ওরা কৃতার্থ হয়ে নিঃশব্দে এসে খেতে বসলো।
নবকুমার যে সাহেবের উপস্থিতির সময় মনে করেছিল, ওরা একবার চলে যাক, সে একবার হেস্তনেস্তটা দেখে নেবে, সে কথা আর মনে পড়ে না। তখন নিজের গালে নিজে চড়ানোর পরই সমস্ত সাহস উপে গেছে তার। এখন অবিরত সদুর কথাটাই মনে পড়ছে।
মাথাটাই খারাপ বৌয়ের!
খারাপ!
নচেৎ আচরণ এমন উল্টোপাল্টা হয়? যাক, তার মধ্যে যেটুকু সোজা করে তাই মঙ্গল। খেতে বসতে পেয়ে ধন্য হল বাপ-ছেলেয়।
সুবৰ্ণ পাকা গিন্নীর মত বলতে লাগলো, আর দুটি ভাত নাও না বাবা?
তা নবকুমার আবার এখন সত্যর মন রাখতে ভাতও দুটি নিল চেয়ে। তারপর যখন খাওয়া হয়ে গেছে, তখন সত্য এসে তার সংকল্প ঘোষণা করলো।
সহজ গলায় বললো।
বললো, অসুখটা হয়ে অবধি শরীরটা মোটে ভাল যাচ্ছে না, তাই ভাবছি কাশীতে বাবার কাছে গিয়ে কিছুদিন থাকবো। পশ্চিমের হাওয়ায় স্বাস্থ্য-শরীরটা একটু ভালো হতে পারে।
নবকুমারের মনে হল, সত্য যেন হঠাৎ তাকে বর দিতে এলো!
বোধ করি মনের মধ্যে এই ধরনের একটা সুরই বাজছিল। কিছুদিন কোথাও ঘুরে আসুক সত্য। তা হলে সেও সারবে, নবকুমারও বাঁচবে।
