নবকুমার লজ্জাকে চাপা দেয় ব্যস্ততা দিয়ে।… হ্যাঁ হাঁ, বলছি তো তাই! বললাম না, বিপদের সময় চক্ষুলজ্জা শাস্ত্রের বারণ! তুই আমার নাম করেই ডেকে আন্। বলগে ভয়ানক গুরুতর কাণ্ড, পুলিস এসেছে বাড়িতে। বোধ হয় তোদের মার হাতে দড়ি পড়বে, এ শুনলে আর
দড়িটা মার হাতে পড়বে কেন, বিপদের সময় চক্ষুলজ্জার নিষেধটা কোন শাস্ত্রে আছে, সে প্রশ্ন করে না সরল, ফতুয়াটা গায়ে দিয়ে বেরিয়ে যায় রান্নাঘরের পিছনের দিকের দরজাটা দিয়ে।
এই দোরটা ছিল তাই রক্ষে।
নইলে সদর চেপে তো বসেছে বাঘা এক সাহেব পুলিশ।… কম্পিত কলেবরে নবকুমারের এগিয়ে দেওয়া চেয়ারখানায় বসে সত্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
হ্যাঁ, সত্যকেই প্রশ্ন করছে।
ছোটখাটো ইংরিজি-মিশেল হাস্যকর উচ্চারণ-সমৃদ্ধ বাংলায়। আর পাথর-বাধানো-বুক সত্য সেই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে ঠায় দাঁড়িয়ে।
সাহেব পুলিসের নামে ডাকাবুকো মুখুয্যে মশাইও প্রথমে আসতে চান নি, কিন্তু সদুর একান্ত ব্যাকুলতায় আসতে বাধ্য হয়েছেন। হয়েছেন বটে, তবে সদরমুখো হন নি, পৈতে হাতে ধরে দুর্গানাম জপ করতে করতে সদুর পিছু পিছু সেই পিছন দরজা দিয়ে!
ঢোকা মাত্রই সুবর্ণ কেঁদে ওঠে, সদুর হাঁটু জড়িয়ে ধরে বলে, পিসি, মাকে ধরে নিয়ে যেতে গোরা এসেছে!
বালাই ষাট, দুগ্গা দুগগা, ধরে নেবে কেন? বলে মেয়েটাকে কোলে তুলে নিয়ে সদু ফিসফিসিয়ে বলে, ঘটনাটা কিরে তুড়ু? হল কি?
সাধন শুকনো মুখে যা বিবৃতি দেয়, তার সার অর্থ এই, সত্যবতী কারুর সঙ্গে কোনো পরামর্শ করে, কারুকে না জানিয়ে পুলিস সাহেবের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিল কারুর জবানীতে পর্যন্ত নয়, নিজের নামে। সেই চিঠির সূত্রে এনকোয়ারিতে এসেছে পুলিস।
চিঠির কারণ?
কারণ অদ্ভুত। কারণ অভাবনীয়।
নিতাইয়ের বৌ ভাবিনীর বোনের শোচনীয় অকালমৃত্যুই নাকি কারণ।
মেয়েটাকে তার স্বামী আর শাশুড়ীতে মিলে কী রকম নৃশংসভাবে হত্যা করেছে, তা জ্বলন্ত ভাষায় বর্ণনা করে দৃপ্ত আবেদন জানিয়েছে সত্যবতী, এই দানবীয় অত্যাচারের সুবিচার হোক, সেই খুনী যুগলের উচিতমত শাস্তি হোক। তা যদি না হয়, বৃথাই তাঁদের ধর্মাধিকরণের নাম করে আদালত খুলে বসে থাকা।
আসামীদের নাম ধাম ঠিকানা সবই জানিয়েছে সত্যবতী সেই আবেদনপত্রে।
সব শুনে সদু নিঃশ্বাস ফেলে বলে, সেদিনের সেই বিকারেরই ঝোঁক এসব তুড়ু, দেহের রক্ত মাথায় চড়ে উঠেছিল জ্বরের ধমকে, সেই চড়া রক্তই বুদ্ধিসুদ্ধি বিগড়ে দিয়েছে। নচেৎ বাঙালী গেরস্থঘরের মেয়ের পক্ষে এ কাজ সম্ভব? আমি তোকে নির্ঘাৎ বলছি তুড়ু, তোর ওই মা একদিন মাথার শির ছিঁড়ে সন্যেস রোগ হয়ে মরবে! চিরদিনই মেয়েমানুষের আধারে ও একটা দস্যি পুরুষমানুষ! তাই এই দুরন্ত রোগ!
সাধন আরো শুকনো মুখে বলে, রোগই বলব, তা ছাড়া আর কি! চিরদিন এই এক রোগ, কোথায় কোনখানে কে কী অন্যায় করল, যেন মার ওপরই করেছে। সকলের জ্বালা-যন্ত্রণা নিজের ঘাড়ে নিয়ে কেবল কষ্ট পাওয়া রোগ। বাড়ির বাসনমাজা ঝিটা একদিন তার ছেলেকে মরে যা’ বলে গাল দিয়েছিল বলে মা তাকে তক্ষুনি ছাড়িয়ে দিলেন!
ছিষ্টিছাড়া, সবই ছিষ্টিছাড়া, চিরকেলে ছিষ্টিছাড়া! আশ্চর্যি!, ভগবান রূপ গুণ সবই দিয়েছিল, কিছু সার্থক করতে পারল না! এখন আবার নাকি শুনছি সেদিন জ্বরের ঘোরে তোর বাপকে দিব্যি গালিয়েছে, পঁচিশ বছর বয়েস না হলে সুবর্ণর বিয়ে দেওয়া চলবে না!
দিব্যিটা অবশ্য নিতান্তই হাস্যকর, অতএব এ নিয়ে মাথা ঘামায় না সাধন। প্রলাপের ঘোরে কী না বলে মানুষ!…. তবে ওরও মনে হয়, বাস্তবিকই মাকে মা’র বিধাতা অনেক বুদ্ধিসুদ্ধি দিয়েছেন, শুধু জেদটা যদি ঈষৎ কম দিতেন।
আপনি একটু ওদিকে যাবেন পিসেমশাই? সাধনের এই প্রশ্নে মুখুয্যে মশাই বিচলিত স্বরে বললেন, আমি আর কেন বুড়োমানুষ! এইমাত্র স্নান সেরেছি, এখনো আহ্নিক হয় নি। এখন ওই স্লেচ্ছস্পর্শে
না না, ছোঁবেন কেন? এমনি।
এই দেখ পাগল ছেলের কথা! বাক্যবিনিময় মানেই তো ছোঁয়া। বাক্যের দ্বারা স্পর্শ, সেও বড় কম নয়। তা ছাড়া তোমরা কলেজে পড়েছ, ইংলিশ শিখেছ…
শিখেছে।
শিখেছে সেটা সত্যি কথা।
কিন্তু এ তো লেখাপড়ার কথা নয়। সাহেব মাস্টার নয়। এ হল বিশ্রী একটা গোলমেলে ব্যাপার। এক্ষেত্রে প্রবীণ লোকই ভাল।
কিন্তু প্রবীন লোক দ্বিতীয়বার স্নানের ভয়ে গেলেন না। শুধু উঁকিঝুঁকি মেরে দেখতে লাগলেন, সত্য কিভাবে সাহেবের দিকে তাকিয়ে কথা বলছে।
হ্যাঁ, তখন সত্যই বলছে, বলো তবে কী জন্যে আদালত খুলে বসে আছো তোমরা? সতীদাহ করে মেয়েমানুষগুলোকে পুড়িয়ে মারতো আমাদের দেশ, তোমরাই সে পাপ থেকে উদ্ধার করেছো আমাদের। তবু এখনো কিছুই হয় নি। এথনো অনেক অনেক পাপ জমানো আছে। চারযুগ ধরে জমছে এই পাপের বোঝা। এই পাপ দূর করতে পারো, তবেই বলি শাসনকর্তা সেজে বসে থাকা শোভা পাচ্ছে!… নচেৎ পরের দেশে রাজগিরি কিসের? জাহাজ বোঝাই হয়ে ফিরে যাও না?
মা!
সাধন এগিয়ে যায় মাকে নিবৃত্ত করতে। দেখছিল “বাংলা-নবীশ” সাহেব তার মা’র এই ওজস্বিনী বক্তৃতার সামনে পড়ে সমস্ত বাংলা জ্ঞান হারিয়ে “হোয়াট? হোয়াট?” করছে!
এই বক্তৃতার স্রোতে দোভাষীর কাজ করতে এলে, তার এফ. এ পড়া বিদ্যে স্থলকূল পাবে, ভরসা হল না। তাই মা বলে ডেকে নিবৃত্ত করতে চাইলে।
