ভাবিনী আর একবার কেঁদে ফেলে, মাও আমার রাতদিন ওই কথাই বলছে দিদি, বলছে আর কেঁদে মরছে। কিন্তু সত্যি তো আর তা হবার নয়? বরং আমার এক জ্ঞাতি পিসি মাকেই দুষছিল। বলছিল, যেমন ন্যাকা করে তৈরি করা, হবে না শাস্তি? বিয়ে হয়েছে, বরের ঘরে যাব না! আহ্লাদ! দোজপক্ষের বর, শুধু তোকে পুতুল খেলনা কিনে দিতে বে করেছে! কি বলবো দিদি, নির্ঘাত পিসির মতলব খারাপ! নিজের একটা বারো-তেরো বছরের ধেড়ে ধিঙ্গী মেয়ে আছে।
সত্য কিন্তু ততক্ষণে যাবার জন্যে পা বাড়িয়েছে, মাপ কর বৌ, আর থাকতে পারছি না, মাথার মধ্যে বড় যাতনা হচ্ছে।
ভাবিনীর এত দুঃখেও সান্ত্বনা দেয় না সত্য দেখে ভাবিনী মনে মনে বলে, সত্যিই বটে কাঠপ্রাণ! পরের শোক-দুঃখ দেখলে ভাবিনীর তো প্রাণ ফেটে যায়। মানুষকে যে কতরকম করেই গড়েন ভগবান!
৪৬. নিতাইয়ের বাড়ি থেকে
নিতাইয়ের বাড়ি থেকে চলে এসেছিল সত্য মাথার মধ্যে যাতনা হচ্ছে বলে, কিন্তু সেই যাতনা থেকে যে এমন জোর জ্বর হবে, সেকথা কে জানত?
সত্য নিজেও যখন শুয়ে পড়েছিল, তখন বুঝতে পারে নি। উঠল না, রান্না করল না দেখে সরল এসে আস্তে কপালে হাত দিয়ে দেখল, জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে! আর কি যেন বলছে বিড়বিড় করে।
ভয়ে প্রাণ উড়ে গেল বেচারার, বাবাকে ডাকল।
কিন্তু বাবাই বড় ভরসাদার!
সে তো বিপদ দেখলেই মেয়েমানুষের মত কপালে করাঘাত করে। সে ডুকরে উঠে বলল, ছুটে গিয়ে পিসিকে ডেকে আন্!
সদু এসে মাথায় জলপটি, পায়ে গরম গামছা ভিজিয়ে সেঁক ইত্যাদি প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করল। এদের জন্য দুটো ভাতে-ভাতও ফুটিয়ে দিয়ে খাইয়ে-দাইয়ে বিদায় নিল অনেক রাত্রে।
না, রাত্রে থাকল না।
সতীনের ছোট ছেলেটা নাকি বড়মা’কে নইলে ঘুমোয় না। আর মুখুয্যে মশাইয়েরও রাতে দশবার তামাক লাগে।
তবে আশ্বাস দিয়ে গেল সদু, ভোরেই আবার আসবে।
তখনো সত্য অজ্ঞান-অচৈতন্য।
নবকুমার মাথায় বাতাস দিচ্ছে।
অনেক রাত্রে হঠাৎ সত্য চোখ তাকিয়ে বলে উঠল, শোনো, কাছে এসো, আমার গা-টা ছোও!
শিউরে উঠল নবকুমার, কী এ? প্রলাপের ঘোর? না আসন্ন মৃত্যুর আভাস?
ছোঁও, গা ছোঁও!
নবকুমার ভয়ে ভয়ে গায়ে একটু হাত ঠেকাল।
সত্য উত্তেজিত স্বরে বলল, গায়ে হাত দিয়ে দিব্যি করলে কি হয় জানো তো?… মনে রেখো। শোন–আমি যদি মরে যাই, সুবর্ণকে তুমি সাতসকালে বিয়ে দেবে না। বল, বল, দিব্যি কর!
রোগীর প্রলাপ।
এতে সায় না দিলে প্রকোপ বাড়বে। নবকুমার তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, করছি।
বল, মুখে বল, ষোলো বছর বয়েস না হলে বিয়ে দেবে না সুবর্ণর?
ষোলো?
মেয়ের বয়েস?
ষোলো বছর পর্যন্ত আইবুড়ো রেখে দেবে?
নবকুমার ভাবল, হঠাৎ এত বড় জ্বর কেন হল সত্যর যে এতখানি ভুল বকা শুরু করেছে।
কিন্তু কারণ যাই হোক, ঠাণ্ডা রাখতে হবে।
নবকুমার ব্যস্ত সুরে বলে, আচ্ছা আচ্ছা, তাই হবে।
তাই হবে বললে হবে না! সত্য প্রায় তেড়ে উঠে বসে, নিজে মুখে বল, ষোলো বছরের আগে সুবর্ণর বিয়ে দেব না!
পাগলের সঙ্গে চাতুরিতে দোষ কি?
আর প্রলাপের রুগীর সঙ্গে পাগলের প্রভেদই বা কি? টুক করে সত্যর গা থেকে হাতের স্পর্শটুকু তুলে নিয়ে নবকুমার বলে ওঠে, এই তো বলেছি, তোমার ইচ্ছে ব্যতীত বিয়ে দেব না সুবৰ্ণর!
আসল কথাটাই বললে না তুমি? সত্য চেঁচিয়ে বলে ওঠে, আসল কথায় ফাঁকি দিও না। সুবর্ণকে মেরে ফেলো না। ওকে বাঁচাতে হবে, হাজার হাজার সুবর্ণকে বাঁচাতে হবে।
ধপ করে শুয়ে পড়ে সত্য।
নবকুমার পাখাটা আরো জোরে জোরে নাড়তে থাকে। হাজার হাজার সুবর্ণ! ভগবান, এ যে ঘোর বিকার!
ভগবান, এ কী করলে তুমি?
হে মা কালী, রাতটা পোহাতে দাও, আমি নিজে গিয়ে খাড়া-ধোয়া-জল এনে খাইয়ে দেব।
দেশের কালীর কাছেও মানত করে বসে নবকুমার। আবার হরির লুটও মানে। কী করবে?
নবকুমার যে শুনেছে, বিকারের রক্ত মাথায় চড়লে ভুল বকতে বকতে আর মাথা চালতে চালতে মরে যায় মানুষ! লক্ষণ তো দেখাই দিয়েছে, রাত্তিরের মধ্যে যদি জ্বর না কমে, সেই পরিণতিই তো অনিবার্য।
.
মা কালীর দয়াই বলতে হবে।
খাড়া-ধোয়া-জল না খেয়েই জ্বর কমে গেল।
শেষ রাত্তিরের দিকেই কমে গেল। ঘামের তোড়ে বিছানার চাঁদর সপসপিয়ে বিজিয়ে দিয়ে জ্বর প্রায় বিদায় নিলই বলা যায়।
কিন্তু ঠাণ্ডা গায়ের রক্ত, পাঁচদিন জ্বর ছেড়ে যাওয়ার পরের রক্ত বিকারের তীব্রতা পেল কি করে? বিকারের বেগ? সেই তীব্রতার বেগ বিকারের বিকৃতি নিয়েই তো মাথায় চড়ে উঠল। নইলে ত্রিভুবনে কে কবে এমন কাণ্ড শুনেছে?
কোনো বাঙ্গালীর মেয়ের, গেরস্থ ঘরের মেয়ের পক্ষে কখনো সম্ভব এমন ভয়ানক কাণ্ড করা?
সত্যর চির অনুগত এবং চির সমর্থক ছেলেরা পর্যন্ত স্তম্ভিত হয়ে গেল মায়ের এই ধারণাতীত দুঃসাহসে।
খিড়কির দরজা দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে সদুকে আর তার বরকে ডেকে আনল সাধন, তথাপি নবকুমার ব্যাকুল হয়ে সরলকে বলে বসল, বিপদে পড়ের চক্ষুলজ্জা করতে নেই, শাস্ত্রের নির্দেশ, তুই যা বাবা, একবার মাস্টার মশাইকে ডেকে নিয়ে আয়!
মাস্টার মশাইকে!
সরল হাঁ হয়ে রইল।
বাবা ডাকতে বলছেন তাঁর মাস্টার মশাইকে! যার নাম করেন না, মুখ দেখেন না, সুহাসদি পর্যন্ত যার জন্যে চিরকালের মত পর হয়ে গেছে!
