ভাবিনী একটু চমকায়।
সত্যর চোখের ওই দৃষ্টি এবার ওর দৃষ্টিপথে পড়ে। কেমন থতমত খেয়ে বলে, আর প্রতিকারের কি আছে ভাই, যা হবার তা তো হয়েই গেছে
যা হবার! এই হবার ছিল?
তা–তা ছাড়া আর কি! শেষ বয়সে মায়ের আমার এই শাস্তি ছিল কপালে–
চমৎকার! আর ওদের কারুর কোনো শাস্তির দরকার নেই? ওই খুনে মা-বেটাকে ফাঁসিকাঠে ঝোলাবার চেষ্টা করবে না তোমরা?
ভাবিনী কপালে করাঘাত করে বলে, আর সে চেষ্টায় লাভ কি বল? পুঁটি তো আমাদের ফিরে আসবে না তাতে! মিথ্যে থানা পুলিসের ঝামেলা!
মিথ্যে ঝামেলা!
মিথ্যে ঝামেলা!
সত্য কঠোর গলায় বলে, দেশে আরো হাজার হাজার পুঁটি নেই? তাদের ওপর অত্যাচার নেই?
হাজার হাজার পুঁটি! সেটা আবার কি?
তাজ্জব বনে যায় ভাবিনী।
সত্যকে হঠাৎ অমন পাগল দেখাচ্ছে কেন? না বুঝেসুঝেই ভাবিনী ভয়ে ভয়ে বলে, অত্যাচার তো আছেই ভাই জগৎ জুড়ে। মেয়েমানুষ তো পড়ে মার খেতেই জন্মেছে। তবে দুধের বাছাটা গেল সেটাই বড় কষ্টের। এখনকার যে একটু বয়স হয়ে বে হচ্ছে সেটা ভাল। তোমার সুন্নকে যে ইস্কুলে ভর্তি করে দিয়েছ ভাল করেছ। তবু একটু বল-বুদ্ধি হোক। আহা, পুঁটিটা আমার নিপাট ভাল মানুষ ছিল ভাই!
হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠে সত্য বলল, বাড়ি যাব।
বাড়ি যাব!
নবকুমার এই অসভ্যতায় অবাক হয়। মানুষটাকে দুটো সান্ত্বনার কথা বলা নেই কিছু না। ব্যস্ত হয়ে বলে, যাবে তো! একটু রও না!
না বসতে পারছি না আমি। মাথার মধ্যে কেমন যাতনা হচ্ছে। কিছু মনে কোর না বৌ, শুধু একটা জিনিস চাই। তোমার ওই বোনের বরের নাম ধাম ঠিকানা আমায় দাও দিকি।
নাম ধাম ঠিকানা!
নবকুমার চমকে এবং ধমকে বলে, ওদের নাম ধাম ঠিকানা নিয়ে তুমি কি করবে? তোমার কি?
আছে কাজ। তুমি দাও তো বৌ!
ভাবিনী শিথিল স্বরে বলে, নাম তো রামচরণ ঘোষ, শ্বশুরের নাম ছিল তারাচরণ
থাকে কোথায়? ঠিকানা কি?
নবকুমার আর একবার ধমক দেয় কী মুশকিল। তাদের ঠিকানায় তোমার কাজ কি? কড়া চিঠি লিখতে যাবে নাকি?
কড়া চিঠি? তাদের? নাঃ! সত্য একটু কঠোর কঠিন হাসি হেসে বলে তাদের চিঠি লিখে কি হবে? অনুতাপে খানখান হবে?
তবে?
আছে কাজ। তুমি বল বৌ।
ঠিকানা আর কি ভাবিনী যেন একটু অনিশ্চাসত্ত্বেই বলে, এই তো হাওড়া পঞ্চাননতলা। চৌমাথায় কোথায় একটা অশ্বথ গাছ আছে–
ওসব যাক। সত্য নবকুমারকে বলে, তুমি যদি আর একটু বসো তো থাকো, আমি যাচ্ছি
নবকুমার ব্যস্ত হয়ে বলে, না, না, আমি আর কি করবো, নিতাইও নেই, তোমরাই বরং গল্পসল্প করো, আমি যাই।
হঠাৎ নিজেই সে তড়বড় করে পালায়।
যেন ভয় পেয়েছে।
সত্যকে ভয় সে চিরকালই করে, তবু তার মধ্যেও কোথায় যেন একটু ভরসা ছিল। কিন্তু এই দু’বছরকাল দূরে থাকা অবধি কেমন যেন ভরসাছাড়া ভয় গ্রাস করেছে নবকুমারকে। যেন সত্যর মুখের দিকে তাকাতে সমীহ আসে। যেন চট করে আড়াল পেয়ে হাতটা একবার চেপে ধরতে পারবে, নিজের ওপর এ আস্থা নেই।
নবকুমারের চলে যাওয়ার দিকে একটুক্ষণ কেমন একরকম তাকিয়ে থেকে আস্তে বলে সত্য, পাড়ার লোক তো খবরটা বলে গেল, কারণটা কিছু বলল? বৌয়ের কোন অপরাধে হঠাৎ মাথায় খুন চাপলো তাদের?
ভাবিনী আজ আর সত্যর প্রত্যেকটি কথার পিঠে ঠিকরে উঠছে না। বোধ করি পারছে না বলে উঠছে না। এ কথার উত্তরে আর একবার আঁচলে চোখ রগড়ে গলার স্বর নামিয়ে বলে, অপরাধ? সে আর কি বলবো ভাই, বলতে লজ্জা, শুনতে লজ্জা! তোমার উনি’ বসেছিলেন তাই বলতে পাচ্ছিলাম না। অপরাধের মধ্যে একটু হুড়কো-হুড়কো ছিল পুঁটি। তা ওই তো পাকাটির মতো মেয়ে, দেখেছ তো সেবার? বিয়ের জল গায়ের পড়েও কিছুই সারে নি। সেই মেয়ে, আর দোজপক্ষের বর! সা-জোয়ান একটা তাগড়া বেটাছেলে, বৌ মরে খাই-খাই অবস্থা! তার কাছে যেতে ওর সাহস হয়? যেতে চায় না, মাটি ধরে পড়ে থাকে, সেই নিয়ে নাকি রোজ মায়ে-বেটায় দুজনে মিলে শতেক খোয়ার লাথি ঝাটা জুতো গলাধাক্কা! তাই বলি পুঁটিটাকেও, মুখ্যর অগ্রগণ্য। দেখছিস তো ওদের জোর আঠারো আনা, তোর কানাকড়িরও নেই, যা বলছে তাই শোন! তা নয়, মাটি ধরে উপুড় হয়ে পড়ে থাকবো, কিছুতেই বরের ঘরে ঢুকব না! পারলি লড়তে? দুশমন রাক্ষসের রাগ চড়ে উঠল। একেই তো এক্ষেত্রে বেটাছেলেদের মাথায় আগুন জ্বলে, দিগ্বিদিক জ্ঞান থাকে না, তার ওপর মা সহায়। সোনায় সোহাগা! অদেষ্ট, সবই অদেষ্ট!
তা তো বটেই, সত্য রূঢ়স্বরে বলে, সবই অদেষ্ট বৈকি! এই হতচ্ছাড়া দেশে মেয়েমানুষ হয়ে জন্মানোই এক দূরদিষ্ট! চোখের ওপর একখানা করে পুরু পর্দা ঝুলিয়ে বসে থাকবো আর অদেষ্টকে দোষ দেবো!
ভাবিনী কাঁদতে কাঁদতে ভুরু কুঁচকে বলে, পর্দার কথা কি বললে?
কিছু বলি নি বৌ। শুধু বলছি নোড়া কি শুধু তাদেরই ছিল? তোমাদের ঘরে ছিল না? ছুঁড়ে মেরে মাথা দু-চির করে দেওয়া যেত না সেই মা-ছেলের? আর তো মেয়ে বিধবা হবার ভয় নেই, ভয় নেই মেয়ের লাঞ্ছনা হবার!
ভাবিনী এবার একটু বিরক্ত হয়েছিল, তোমার যে কী ছিষ্টিছাড়া কথা দিদি! আমরা সে কাজ করে পার পাবো? হাতে দড়া পড়বে না? বিয়ে করা পরিবারকে মারতে পারো, কাটতে পারো, হেঁচতে পারো, কুটতে পারো, আর কাউকে করা যায়?
আমি হলে করতাম। ওই জামাইয়ের মাথা উঁটিয়ে গুঁড়ো করে দিতাম। তারপর ফাঁসিকাঠে ঝুলতাম! সত্য আগুন মুখে বলে।
