কারণ বোঝাতে বসি, এত ধৈর্য আমার নেই। সুবর্ণ আমার সঙ্গে যাবে, এই হচ্ছে কথা। সত্যর শেষ কথা।
অতএব এ কথার নড়চড় নেই।
তা ছাড়া ওদিকে ছেলে দুটো তালেবর হয়ে উঠেছে, আর মা-অন্ত প্রাণ তাদের, বাপের সঙ্গে আদৌ বনে না। কাজেই পৃষ্ঠবল সত্যরই বেশী।
কলেজ কামাই হচ্ছে বলে চলে গেল ছেলেরা, কিন্তু যাবার সময় বলে গেছে, মা যা বললেন, নিশ্চিত তাই যেন করা হয়।
এ কী বেপরোয়া কথা! এ কি দুঃসাহসিক কথা! বাপ তুচ্ছ মা প্রধান?
নবকুমার এ সমালোচনা তুলেছিল, কিন্তু সত্যর ব্যঙ্গ থামিয়ে দিয়েছে তাকে। সত্য বলে। উঠেছিল, আহা, তা ওতে রাগের কি আছে? মাতৃভক্তির বংশ, মাতৃভক্ত হবে না? কেন, মাতৃভক্তি কি খারাপ বস্তু?
যদিচ মেয়েকে আর বৌকে এই দীর্ঘকাল পরে নিয়ে যেতে পেরে কৃতার্থ হচ্ছে নবকুমার, তবু স্বভাববশেই এই তর্ক এই প্রতিবাদ। যথারীতি শেষ পর্যন্ত সত্যই ইচ্ছাই জয়ী হল। প্রায় দু বছর পরে আবার শ্বশুরবাড়ির চৌকাঠ ডিঙোল সত্য, স্বামীর সঙ্গে মেয়ের হাত ধরে।
পিছনে মড়াকান্না কাঁদতে লাগলেন এলোকেশী আছড়ে আছড়ে, কপালে ঘা মেরে মেরে।
.
এবার কিন্তু গ্রামের লোক এলোকেশীর কাজকে তেমন সমর্থন করল না। বলতে লাগল, ছেলে-বৌ নিয়ে যেতে চাইছিল গেলেই হত! কালী–গঙ্গার দেশ, কতবড় একটা তীর্থস্থান! যেতে বাধা কি ছিল? সত্যি তো আর ছেলে অফিস ছেড়ে দিয়ে বসে থাকবে না? আর বৌও চিরকাল স্বামী-পুতুরের সংসারকে ভাসিয়ে বসে থাকবে না! তবে? একা ঘরে কোন দিন মরে থেকে পাড়ার লোকের হাড় জ্বালাবি! তা ছাড়া ছেলেটা যাত্রা করছে, মহাগুরু নিপাতের বছর পড়ল তার, মড়াকান্না কেঁদে এ কী অকল্যেণ করা?
এ যাবৎকাল এলোকেশীর সকল প্রকার আচার-আচরণই সমর্থনযোগ্য ছিল, এই প্রথম তাতে ভাঙন ধরলো।
কে জানে কেন? কে বলতে পারে কারণ?
এলোকেশী একা থাকায় পরোক্ষে পাড়ার লোকের ওপর কিছুটা দায়িত্ব পড়ল, তাই কি?
অথবা বেশ কিছুটা বেওয়ারিশ জমিজমা বাগান পুকুর গাছগাছালির সূক্ষ্ম লোভে বাগড়া পড়ল তাই? ফলে-ভর্তি তিনটে বাগান এলোকেশীর মাছে-ভর্তি দুটো পুকুর। তাছাড়া এদিকে ওদিকে আরো কত সব!
নাকি অত লুব্ধমনা নয় এলোকেশীর বান্ধবীরা? এ শুধু চিরাচরিত প্রভাব। বৈধব্যে স্ত্রীলোকের বাজারদর একটু পড়েই যায়। “কর্তার গিন্নী”র দামই আলাদা। কর্তা গত হলে যা কিছু জোর গলার জোর।
সে যাই হোক, মোট কথা অবস্থাটা এই।
এমন কি নিতাইয়ের বৌ পর্যন্ত নবকুমারের মুখে ওই মড়া কান্নার গল্প শুনে সত্যবতীর পক্ষ হল। হল হয়তো মনের অবস্থা তার হঠাৎ একটা কারণে ভয়ানক খারাপ হয়ে গেছে বলেই। শ্রাদ্ধের নেমন্তন্ন সেরে বেশ উৎফুল্ল মনেই কলকাতায় ফিরেছিল বেচারী, এসেই মাথায় বাজ! অভাবনীয় কাণ্ড!
মায়ের কোলপোছা একেবারে সব ছোট বোনটা– এই কিছুদিন আগে বিয়ে হয়েছিল, বেগোরে প্রাণ হারিয়েছে তার আগে বোন। এসে দেখল ভাই বসে হাউ হাউ করে কাঁদছে। জানালো, মেরে ফেলেছে তাকে শাশুড়ীতে আর বরেতে মিলে। স্রেফ মেরে ফেলেছে। মেরে ফেলে রটিয়েছে রাত্রিকালে ঘাটে যেতে আছাড় খেয়ে পড়ে মরে গেছে।
মেরে ফেলেছে! হা হয়ে গেল নবকুমার।
নবকুমার আর সত্যবতী দুজনেই এসেছিল ভাবিনীর এই শোকতাপ শুনে। ইদানীং ভাবিনী নবকুমারের সঙ্গে একটু আড়াল রেখে একরকম কথাই কয়। এখন শোকের সময় আরো বাধ ভেঙেছে।
মেরে ফেলল! নবকুমার বলে তীব্র স্বরে, এ কি মগের মুলুক?
তা ছাড়া আর কি, ভাবিনী চোখ মুছতে মুছতে বলে, সকল খুনের শাস্তি আছে, দেশে বৌ খুনের তো আর শাস্তি নেই! ওই ছেলের আবার এক্ষুনি ড্যাংডেঙ্গিয়ে বিয়ে দেবে মাগী। যেতে আমাদেরই গেল। কচি বাচ্ছা, ন বছর পেরিয়ে এই সবে দশে পা দিয়েছে ভাই, কিছু জানে না কিছু বোঝে না। আর কী ভাল মানুষ! শ্বশুরবাড়ি যাবার নামে সাত দিন ধরে খায় নি দায় নি, শুধু কেঁদেছে। গেল আর একটা মাসও না যেতেই এই। মায়ের আমার অবস্থাটা ভাবো।
আরো বহুবিধ আক্ষেপ করতে থাকে ভাবিনী।
বলে, নিজের তার পেটে একটা জন্মায় নি। মায়ের এই কোলপোঁছা মেয়েটাকে সন্তানতুল্য দেখত, যেতে কিনা সেটাই গেল! স্তব্ধ হয়ে বসে শুনছিল সত্য, সান্তনা দেবার চেষ্টা করে নি, অনেকক্ষণ পরে আস্তে বলে, মেরে ফেলেছে, সে কথা কে বললে? এমনি যা বলছে, হতেও তো পারে?
ওই ভাই, এ কথা কি চাপা থাকে? তাদের পাড়ার লোক এসে আমার বাবার কাছে চুপি চুপি খবর দিয়ে গেল! ভাবিনী আর একবার ডুকরে কেঁদে ওঠে, তারা নাকি বলেছে, একেবারে নিশংস কাণ্ড মশাই! নোড়া দিয়ে ঘেঁচে মেরে ফেলেছে, মাথা ফেটে একেবারে ছাতু!
সত্য হঠাৎ যেন কেমন হয়ে যায়, সত্যর চোখের মধ্যে যেন উন্মাদ মানুষের দৃষ্টি।
নোড়া দিয়ে ছেঁচে মেরে ফেলেছে!
নবকুমার সত্যর এ পরিবর্তনে ভয় পায়, কিন্তু ভাবিনী তেমন লক্ষ্য করে না, একই ভাবে বলে, ও দিদি, সেই নিশংস কান্ডই করেছে। বেটা আগে মেরে আধমরা করেছিল, মা দেখলে আধমরা হয়ে থাকায় বিপদ, তার চেয়ে পুরো শেষ করে দিই, আর কথা বলবে না। দিলে ঠুকে। বল ভাই, এরা মানুষ না রাক্ষস? ভদ্দরলোকের সাজে সেজে বেড়ায়, ভেতরে বাঘ সিংহী!
ভাবিনী আবার চোখ মুছতে থাকে।
সত্য হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে, বসে বসে কাদবে, এ অন্যায়ের কোন প্রতিকার করবে না?
