হ্যাঁ, শেষ পর্যন্ত এই কলঙ্কই মাথায় বইতে হল সত্যবতী আর নবকুমারকে, হাতে করে মেরে ফেলেছে তারা নীলাম্বরকে। এলোকেশী আকাশ ফাটিয়ে বোঝাচ্ছেন সবাইকে, নাতনীটা তার প্রাণপাখী ছিল, সেটাকে টেনেহিঁচড়ে বাড়ির বার করে নিয়ে গেল স্বামী-স্ত্রীতে পরামর্শ করে। আর বাচে মানুষ? যেই বার করে নিয়ে গেল, সেই বরফড়িয়ে প্রাণটা বেরিয়ে গেল। যাবে না? এত বড় দাগা বুক বুকে সয়? রোগজীর্ণ খাঁচাখানা মনের কষ্টে খুঁড়ো হয়ে গেল।
যে শুনল সে ছিছিক্কার দিল শহুরে ছেলে-বৌয়ের হৃদয়হীনতাকে। কেউ এ প্রশ্ন তুলল না, মন কেমন করবার মত মনটা নীলাম্বরের ছিল কোথায়?
দীর্ঘকাল ধরে বোধহীন অনুভূতিহীন একটা জড় মাংসপিণ্ড মাত্র হয়ে পড়ে ছিল যে প্রাণীটা শুধু পরমায়ু ফুরোনোর অপেক্ষায়, তার প্রাণপাখীর খবরটা এলোকেশী জানলেন কোন উপায়ে? নবকুমার এসে যখন বাবা বাবা করে সহস্র ডাক ডেকেছিল, এতটুকু চৈতন্যের স্ফুরণও তো দেখা যায় নি সেই পিণ্ডটার মধ্যে। সুবর্ণ চলে যাচ্ছে এই ভয়াবহ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কি তবে ঝলসে উঠল তার রোগ চৈতন্য অনুভূতি?
না, এসব প্রশ্ন কেউ তোলেনি।
সত্যবতীর পাষাণীত্বটাই প্রধান হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু সে যাক, নিন্দে তো সত্যবতীর সঙ্গের সাথী, সমস্যা অন্য। সমস্যা এল পরে। বাপের শ্ৰাদ্ধশান্তি তো নবকুমার সাধ্যের অতিরিক্ত করল। সত্যর প্রবল প্ররোচনায় অনিচ্ছাসত্ত্বেও অনেক খরচ করতে হল তাকে। বৃষৎসর্গ, পণ্ডিত বিদায়, শত ব্রাহ্মণকে ছত্র পাদুকা দান, অনেক কিছুই বিধান বার করেছিল সত্য। সদু এসেছিল মামার শ্রাদ্ধর ঘটায় এবং একা আসে নি, বরকে আর দুই ‘ছেলে’কে সদু সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। সদুর পাতাচাপা কপাল দেখে হাঁ হয়ে গিয়েছিল সবাই। তা ছাড়া নিতাই, নিতাইয়ের বৌও এই উপলক্ষে গ্রামে ঘুরে গেল একবার। এ পর্যন্ত সবই বেশ। গোল বাধল যাত্রাকালে।
এখন আর সত্যবতীর এখানে থাকার কারণ নেই, অতএব যাবে। কিন্তু এলোকেশীর একা থাকার প্রশ্নটাও ফেলনা নয়। সত্যবতী প্রস্তাব তুললো, ঠাকরুণও এবার চলুন আমাদের সঙ্গে!
এ প্রস্তাবের খবরে সদু অবশ্য আড়ালে বলেছিল, মর নির্বুদ্ধির ঢেঁকি, নিয়ে যাওয়া মানে তো চিরকালের মত নিয়ে যাওয়া! তার মানে তোর সুখের সংসারে কুলকাঠের আংরা জ্বেলে দেওয়া! এতগুলো দিন তো হাড়মাস কালি করলি, স্বামীপুরের হাঁড়ির হাল হল। তার পুরস্কার হল খানিক বদনাম। আবার এখন শাউড়ীকে মাথায় করে নিয়ে যা, আর ও তোর বুকে ভাতের হাঁড়ি বসাক! বলেছিল সদু, কিন্তু নবকুমার হাতে চাঁদ পেল। মার যদি এত বড় একটা সুব্যবস্থা হওয়া সম্ভব হয়, আর ভাবনা কি? সত্যিই সত্যর বুদ্ধি আছে সাহসও আছে।
কিন্তু এলোকেশী এ সুব্যবস্থায় কর্ণপাত করলেন না। তিনি আর একবার ছেলেকে ধিক্কার দিলেন, বাপ মরতে না মরতে ভিটের সন্ধ্যেপিদ্দিম বন্ধ করার প্রস্তাবে।
সন্ধ্যাদীপ? তা তার জন্যে জ্ঞাতিদের কাউকে বলে কয়ে এলে?
গলায় দড়ি এলোকেশীর!
যাদের দেখলে বিষ ওঠে তার, তাদের শরণাপন্ন হতে যাবেন? তা ছাড়া এই চিরকালের জায়গা ছেড়ে বৃদ্ধ বয়সে শহুরে খাঁচায় দমবন্ধ হয়ে মরতে যাবেন তিনি, বিবি বৌয়ের সুবিধে করতে? এসব দুর্মতি ছাড়ক নবকুমার!
তা হলে?
সমস্যার সমাধানটা কি?
কি আবার, রাতে আগলাতে একটা শক্তপোক্ত মেয়েলোক ঠিক রেখে যাক নবকুমার মায়ের জন্যে, আর মায়ের এই শোকাতাপা প্রাণ শীতল করতে মেয়েটাকে রেখে যাব। এখুনি ওজে ছিঁড়ে নিয়ে গেলে এলোকেশীও নির্ঘাত পতি-পদাঙ্ক অনুকরণ করবেন।
নবকুমার মাথায় হাত দিয়ে বলেন, শুনলে কথা?
সত্যবতী যাত্রাকালের গোছগাছ করছিল, সে গোছ বন্ধ না রেখেই বলল, শুনলাম বৈকি।
এখন উপায়?
উপায় আর কি! মাকে দমবন্ধ করে মেরে ফেলার ব্যবস্থা করে তো লাভ নেই? তার থেকে একটা ঝিয়ের ব্যবস্থাই কর।
আর সুবর্ণ?
সুবর্ণ আমাদের সঙ্গে যাবে। সংক্ষেপে রায় দেয় সত্য।
তা তো যাবে, কিন্তু একেই তো বাবার জন্যে বদনামের শেষ নেই, তার ওপর আবার যদি মা সত্যিই
কি? যদি মন-কেমন করে মরে যান? সত্য তীক্ষ্ণ একটু হেসে বলে, তা হলে তো সহমরণের পুণ্যিই হয়ে যায়। একই অনলে দগ্ধ হয়ে উভয়ের মৃত্যু!
তামাশা করছ?
পাগল! এ কী আবার তামাশার কথা?
আমি কিন্তু বলতে পারব না মাকে।
তোমায় বলতে হবে না। যা বলবার আমিই বলবো।
কিংকর্তব্যবিমূঢ়, নবকুমার বুঝে উঠতে পারে না, এক্ষেত্রে কি করা উচিত। মা যেটা বলেছেন সেটা অযৌক্তিক, বৌ যেটা বলছে সেটা অকর্তব্য। তা হলে?
অবশ্য একটা কাজ আছে নবকুমারের। চিরকালের কাজ। প্রথমে একবার সত্যর কথার প্রতিবাদ করে নেওয়া। সেটাই করে। বলে, পিতৃহত্যার পাতক হয়েছি, আবার মাতৃহত্যার পাতক হবো?
সত্য অবিচল।
উপায় কি? তোমার ললাটে যদি বিধাতা এই দণ্ড লিখে থাকে, তাই হবে!
সুবর্ণ তোমার একলার নয়। বাপ-ঠাকুমারও ওর ওপর দাবি-দাওয়া আছে!
তা অবশ্যই আছে। তবে কতখানি আছে তার ফয়সালা করতে তো আবার তোমাদের আইন আদালত করতে হয়।
কী বললে? কী বললে তুমি?
কিছু না। সত্য হাতের কাজে মন রেখে বলে, যা বলাচ্ছ তাই বলতে হচ্ছে।
শ্বশুরের সময় তো কর্তব্য উথলে উঠেছিল, আমাকে একেবারে ধুলোর অধম করছিলে, এখন শাশুড়ীর বেলায় এমন মারমূর্তির কারণ?
