এ লোকসান সওয়া বুঝি কঠিন উঠছে ক্রমশ।
অথচ সুবর্ণকে দোষ দেওয়া যায় না। ঠাকুমার কাছেই যে সর্ববিধ প্রলোভনের বস্তু। ঠাকুমার সঙ্গে পাড়া বেড়ানো, ঠাকুমার সঙ্গে ঠাকুরতলায় গিয়ে বসে থাকা, ঠাকুমার কাছেই যত অপথ্যি কুপথ্যি আর ঠাকুমার কাছেই যত গল্প।
শুধু রূপকথার গল্প নয়। এমনি গল্পও চলে।
এলোকেশী বলেন, তোর মার কি ইচ্ছে জানিস? কলকাতায় গিয়ে তোকে মেমের ইস্কুলে পড়িয়ে আপিসে চাকরি করতে পাঠাবে। বিয়ে দেবে না, গয়না কাপড় দেবে না, খালি চোখ রাঙাবে আর পড়াবে। আর যদি আমার কাছে থাকিস তো লাল টুকটুকে বর এনে বিয়ে দেব, এত এত গয়না দেব, লাল বানারসী শাড়ি দেব। তারপর সে বিয়েতে কতো ঘটা করবো!
উৎসুক আগ্রহে অধীর শিশু ঠাকুমার কাছ ঘেঁষে বলে, কি গয়না দেবে ঠাকুমা?
এলোকেশী সোৎসাহে বলেন, এই মাথার মটুক, গলায় চিক, সাতনরী, দানার মালা, হাতে তাগা বাজুবন্ধ মুড়কি মাদলি, নীচের হাতে বাউটি কঙ্কণ, বালা শাখা, পায়ে মল চরণপদ্ম
সুবৰ্ণ বিগলিত কণ্ঠে বলে, আর খোঁপায় ফুল দেবে না ঠাকুমা? ও বাড়ির কাকীমার মতন?
হুঁ, তাও দেব। মাথায় ফুল, কানে সেঁড়ি ঝুমকো। এখন বল্ আমার কাছে থাকবি, না মার সঙ্গে কলকাতায় যাবি?
বলা বাহুল্য সুবর্ণ সতেজে বলে, তোমার কাছেই থাকবো।
তোর মা থাকতে দিলে তো? মেনে মেরে নিয়ে যাবে!
ই! দেবে না বৈকি! যাবে বৈকি! আমি তা হলে এমন কাঁদবো, আকাশ ফেটে যাবে!
এলোকেশী সহর্ষ চিত্তে বলে, তা তুই পারবি। সে জোর আছে। ওই মায়ের মেয়ে তো! মা যেমন কুকুর, তার উপযুক্ত মুগুর হবি তুই!
তিলে তিলে কাজ এগোয়।
দিনে দিনে পূর্ণশশী রাহুগ্রস্ত হতে থাকে। তা ছাড়া মাকে ঠিক একান্ত আপন হিসেবে দেখতেই বা পেল কবে সুবর্ণ?
নিতান্ত শৈশবটা তো কেটেছে পিসির কাছে, তার পর সত্যর উদাসীনতায় বাপের কাছেই বেশী বেশী। আবার বাপ চলে যাবার সময় বলে গেছে, তোর মা তোকে আমার সঙ্গে যেতে দিলে না!
তার উপর মানেই পড়া-লেখা। যে পড়া-লেখাকে ঠাকুমা বিষ দেখে। আর সুবর্ণরও কিছু মধু ঠেকে না।
অতএব মা সম্পর্কে একটু বৈরীভাবই গড়ে উঠছে সুবর্ণর। পরিপূরক হিসেবে ঠাকুমার প্রতি বন্ধুভাব।
সত্য এই ধ্বংসের ছবি দেখতে পায়।
তীব্র যন্ত্রণায় রাত্রে প্রায়ই ঘুম আসে না সত্যর। মাঝে মাঝে মনের মধ্যে এ প্রশ্নও আসে আমি কি ভুল করেছি? নবকুমারের প্রস্তাবেই কি রাজী হওয়া উচিত ছিল তখন?
কিন্তু কে জানতো মৃত্যু এমনভাবে কুটিল ব্যঙ্গ করবে সত্যর সঙ্গে? কে জানতো একটা অনুভূতিহীন মাংসপিণ্ডও পৃথিবীর মাটি কিছুতে ছাড়তে চাইবে না?
আবার ভাবে, ছি ছি এ কী ভাবছি আমি! এ রকম চিন্তাতেও যে প্রায়শ্চিত্তের প্রয়োজন!
অবশেষে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছায় সত্য। আর সেই সিদ্ধান্তের বশে নবকুমারকে চিঠি লেখে। তুমি অবশ্য করে কয়েক দিনের ছুটি নিয়ে বাড়ি আসবে। সুবর্ণকে নিয়ে যাবে তুমি। নিয়ে গিয়ে স্কুলে ভর্তি করে দেবে। যতদিন না আমি যেতে পারি, ঠাকুরঝির কাছেই থাকুক। এমন ভাবে ইহকাল পরকাল মাটি হতে দিতে পারব না মেয়েটার। ঠাকুরঝির কাছে ভালই থাকবে, বলতে গেলে সুবর্ণ তো তারই।
এই প্রথম নবকুমারকে চিঠি লেখা
এর আগে যা লিখেছে বা লেখে সবই ছেলেদের কাছে।
প্রথম পত্র, কিন্তু প্রেমপত্র নয়।
এ চিঠি নিয়ে নবকুমার সদুর কাছে গিয়ে সত্যর আক্কেল এবং নির্বুদ্ধিতা সম্পর্কে খুব গলাবাজি করে। কিন্তু সদুই থামায়। বলে, অন্যায়টা কি বলেছে বৌ? একদিকে জড় না-মনিষ্যি রুগী, একদিকে সংসার, আর একদিকে ওই দামাল ছটফটে মেয়ে। তার ওপর আবার মামীর মধুমাখা বাক্যি তো আছেই। পেরে উঠবে কেন তার? নয় নয় করে প্রায় দেড় বছর হয়ে গেল। না না, তুই তাকে নিয়েই আয়। আমি দেখবো। আহা, পড়া পড়া করে বাঁচে না বৌটা!
নবকুমারের মুখে আসে, তার চাইতে তুমিই যাও না দুদিন– ও চলে আসুক!
কিন্তু বলতে পারে না।
মুকুন্দ মুখুয্যে সামনে আসীন। এখন ওই বাজখাই এবং রাশভারী পুরুষটির গিন্নী সদু, মামার বাড়ি পড়ে থাকা হতভাগী ভাগ্নী নয়।
ঘাড় গুঁজে বলে, বেশ, তাই যাবো।
.
কিন্তু অলক্ষ্য দেবতা বোধ হয় তখন অলক্ষ্যে উপস্থিত ছিলেন আর কৌতুকের মেজাজে ছিলেন। তাই
তা বিধাতার কৌতুক ছাড়া আর কি?
এতদিন যে জড় মাংসপিণ্ডটা শুধু পরমায়ু ফুরোনোর অভাবেই পৃথিবীর খানিকটা জায়গা জুড়ে থেকে অজপা’র ঋণশোধ করছিল, সেই জড়পিণ্ডটা আচমকা এমন একটা মুহূর্তে তার বহু বছরের দখলীকৃত জমিটা ছেড়ে দিয়ে চলে গেল যেটা একটা চরম মুহূর্ত।
অনেক কাটখড় পুড়িয়ে অনেক নিন্দে কুড়িয়ে আর এলোকেশীর অনেক শাপমন্যি উড়িয়ে দিয়ে সত্যবতী যখন কোন প্রকারে সুবর্ণকে নবকুমারের সঙ্গে বাড়ির বার করাতে সমর্থ হয়েছে, আর ক্রুদ্ধ ক্ষুব্ধ কণ্ঠরুদ্ধ নবকুমার মনে মনে প্রতিজ্ঞা করতে করতে পা বাড়িয়েছে, সুবর্ণকে নিয়ে গিয়ে ওই মায়ামমতাশূন্য হৃদয়হীনা পাষাণী মায়ের নাম ভুলিয়ে ছাড়বে, ঠিক সেই সময় বিধাতা সেই কৌতুকের হাসিটি হাসলেন। সে হাসির ফলে এলোকেশী সহসা প্রচণ্ড এক চিৎকারে গগন বিদীর্ণ করে ঘর থেকে আছড়ে এসে উঠোনে পড়লেন।
এত বিরাট চিৎকারের মধ্য থেকে কথা হৃদয়ঙ্গম করা শক্ত, তবে করতে পারলে শুনতে পাওয়া যেত, এলোকেশী সর্দমৃতকে উদ্দেশ করে চিৎকার করছেন, ওগো, হাতে করে মেরে ফেলল তোমায়, বেটা বেটার বৌ হাতে করে মেরে ফেলল!
