সত্য মৃদুস্বরে বলে, না, একাই যাবেন।
এলোকেশীর মুখে হাসির আভাস দেখা দেয়। কারণ এদিকে যত পাজীই হোক, কাজেকর্মে যে চৌকস। ও এসে পর্যন্ত তো এলোকেশীকে কোনো দিকে তাকিয়ে দেখতে হচ্ছে না। অত বড় রুগী, এই সংসার, গরুবাছুর, গাছপালা হাঙ্গাম তো কম নয়!
তাছাড়া মেয়েটার ওপর মায়া পড়ে গেছে এলোকেশীর, চলে যাবে ভেবে হাত পা আছড়ানি আসছিল, যাবে না শুনে আহ্লাদ গোপন করতে পারলেন না। ছেলে যে তার চিরকালের পিতৃমাতৃভক্ত সেটি সত্যর কাছে সাড়ম্বরে ঘোষণা করে বান্ধবীদের কাছে বলে বেড়াতে লাগলেন, যাবার জন্যে লাফিয়েছিল হারামজাদী! নবা কান করে নি! মুখে নাথি মেরে একা চলে যাবে। বলেছে! সেই নিয়ে ভাই কী ঝগড়া, কী ঝগড়া! কাক ওড়ে তো চিল পড়ে!
সত্য অপ্রতিবাদে শুনে যায় এসব কথা, স্থির-ধৈর্যে আপন কাজ করে যায়। সত্যকে ঈর্ষা-বিদ্বেষ ও সমীহর দৃষ্টিতে দেখছিল, কিন্তু যখন দেখল নবকুমার চলে গেল সত্যকে রেখে এবং সত্য ঠিক তাদেরই মতন জীবনযাত্রার মধ্যে নির্ভুল চলছে, তখন সাহস সঞ্চয় করে হৃদ্যতা করতে এল।
অবিশ্যি তারাও নেহাত খুকী নয়, কারো দু-একটা জামাই হয়ে গেছে, কারো নাতি-নাতনী রয়েছে। সত্যর বেশী বয়সে সন্তান হয়েছে, তাও প্রথমটি নেই, দ্বিতীয় তৃতীয় দুটি ছেলে। কোলপোছা এই মেয়েটার কবে বিয়ে হবে কে জানে! তাই সত্যর জীবনে পরিণতি আসে নি।
ওরা ওদের পরিণত বুদ্ধি নিয়ে বলে, বাব্বাঃ, দজ্জাল শাশুড়ী ঢের দেখছি, বৌ-কাঁটকী শাশুড়ীও দেখেছি, তোমার শাশুড়ীর মত এমন আর দেখলাম না! কী অকথা কুকথা কইতে পারে বাবা!
সত্য বলে, ভীমরতির বয়সে অমন কত আজেবাজে কথা বলে মানুষ! আমরাও বুড়ো হলে অবিশ্যিই বলব! রাগ করে লাভ কি?
ওরা কিছুদিন পরে দেমাকী বলে ত্যাগ করে সত্যকে।
.
ধীরে ধীরে মাস গড়ায়, মাস গড়াতে গড়াতে বছর। নীলাম্বর একই অবস্থায় আছেন, না জীবিত মৃত। আর তার সঙ্গে আরও একটা মানুষ নিতান্ত কর্তব্যবোধে জীবন্মৃত হয়ে পড়ে আছে। নবকুমার মাঝে মাঝে ছুটি-ছাটায় আসে। ছেলেরাও আসে। কিন্তু নীলাম্বরের জীবদ্দশায় যে সত্যকে নিয়ে যাওয়া যাবে এ বিশ্বাস আর নেই তাদের।
নবকুমার রায় দিয়েছে, ভূতে পেয়েছে ওকে। ওই খিড়কির দরজায় রাতবিরেতে যাওয়া! বেলগাছ কাঁঠালগাছ ছিষ্টি!
সত্যি ভূতে না পেলে কেউ এমন করে নিজের মাথা নিজে খায়? নিজের পায়ে নিজে কুড়ল মারে? সাধন-সরলও মায়ের দৃঢ়তায় অবাক হয়ে যায়।
তা এক হিসেবে ওই ভূতে পাওয়া কথাটাই হয়তো সত্যি। যে সত্য মেয়েকে স্কুলে দেবার জন্যে, মেয়ের বয়সটা অন্তত গোটাপাঁচেক হবার জন্যে একটি একটি করে দিন গুনছিল, সে হঠাৎ সে বিষয়ে এমন নির্বিকার হয়ে গেল কি করে?
কিন্তু সত্যি কি নির্বিকার?
ওই একটা কারণেই কি মাঝে মাঝে কর্তব্যবোধের বন্ধন ছিন্ন করে এখান থেকে ছুটে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে না সত্যবতীর?
সে তো ভেবে নিয়েছিল অবস্থাকে মানিয়ে নিয়ে চলতেই হবে। অতএব নিজেই পড়িয়ে পড়িয়ে দুটো ক্লাসের যুগ্যি করে তুলবে সুবর্ণকে। কিন্তু এলোকেশী যেন ওইটিতেই বাগড়া দিতে বদ্ধপরিকর।
সত্যকে মেয়ে নিয়ে পড়াতে বসতে দেখলেই রেগে জ্বলে মরবেন তিনি, আর ছুতোয়নাতায় ডাক দিয়ে উঠিয়ে ছাড়বেন তাকে। সুবর্ণ যদি একবার পেন্সিল নিয়ে বসবে তো দূর করে দে, ফেলে দে ইত্যাদি তীব্র মন্তব্যে দিশেহারা করে তুলবেন বেচারাকে।
ক্রমশ আরো চালাকি চালাচ্ছেন, সুবর্ণ পড়তে বসলেই ডাকবেন, সুবর্ণ, তোর ঠাকুদ্দা তোকে ডাকছে!
সুবৰ্ণ মায়ের মুখের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করে, সত্য চোখের আগুন চোখে চেপে বলে, যাও। শুনে এসো।
কিন্তু দু-এক ঘণ্টার মধ্যে আর ফেরে না মেয়ে। ফিরতে দেন না এলোকেশী।
ঠাকুর্দার গায়ে হাত বুলোনোর কাজে তাকে নিযুক্ত করে, মেয়েমানুষের বিদ্যে শেখা যে কতদূর গর্হিত কাজ তাই বোঝাতে চেষ্টা করেন নাতনীকে। এতেও কাজ না এগোলে সারা দুপুর তাকে নিয়ে পাড়া বেড়াতে বেরোন।
সত্য এক-আধদিন বলে, ঠাকুরকে ফেলে আপনি বেরোন, আমি কাজে থাকি, উনি একা পড়ে থাকেন।
এলোকেশী অপ্রতিভতা ঢাকতে বিরক্তিটা বাড়ান, তা থাকবেন না আর কি হবে? কথাতেই আছে নিত্যি নেই, দেয় কে? নিত্যি রুগী দেখে কে? আর ওই মানুষের কাছে বসা না-বসা! কথা জড়িয়ে গেছে, রাতদিন মুখ দিয়ে নাল গড়াচ্ছে, কী কথা কইব? কী সেবা করব? আমার আর রুচিও নেই। আজন্ম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খেলেন, এখন বিছানায় পড়েও জ্বালিয়ে যাচ্ছেন! কই, যে লক্ষ্মীছাড়া মেয়েমানুষটা চিরটাকাল দখল করে বসে থাকল, সে এসে সেবা করতে পারছে না?
সত্য কখনো লজ্জা পেয়ে চুপ করে যায়, কখনো মৃদু প্রশ্ন করে, করতে এলে আপনি বাড়িতে ঢুকতে দেবেন?
এলোকেশী সদম্ভ চিৎকার করেন, ঢুকতে দেব? মুড়ো খ্যাংরা নেই বাড়িতে? ভাঙা আঁশবাটি? এই বুড়োর চোখের ওপর ঝেটিয়ে বিষ ঝাড়ব না? অঙ্গই পড়ে গেছে, চোখ দুটো তো আছে? দেখবে প্যাট-প্যাট করে!
আর প্রশ্ন করে না সত্য। আর উত্তর দেয় না।
আড়ালে সত্য সুবর্ণকে পড়ার জন্য তাড়না করে।
সুবৰ্ণ কখনো কাঁদে, কখনো সতেজ জবাব দেয়, আমি কী করবো? ঠাকুমা যে ডাকে! পড়লে গাল দেয়! ঠাকুমা যে রাগী!
বলে, তবু সত্য দিনে দিনে অনুভব করে, ঠাকুমার দিকেই ঢল নামছে মেয়ের, ঠাকুমারই ন্যাওটা হচ্ছে।
