তার মানে তুমি থাকবে?
নবকুমার চোখে অন্ধকার দেখে।
নবকুমার যেন অকূল সমুদ্রে পড়ে।
সত্য যে এমন একটা অদ্ভুত সংকল্প করে বসে আছে, এ কথা তো স্বপ্নেও ভাবে নি সে। বরং উল্টোটাই ভেবেছিল। ভেবেছিল সত্য কলকাতায় যাবার জন্যে এক পায়ে খাড়া আছে, প্রস্তাবটা উঠতে যা দেরি!
কিন্তু এ কী?
প্রথমটা সত্যর সংকল্পকে “অবাস্তব” বলে উড়িয়ে দিতে চেষ্টা করে নবকুমার, অসম্ভব বলে অভিহিত করে, তারপর কাকুতি-মিনতি করতে থাকে। ছেলেদের মুখ চাইতে বলে, নিজের টাইমের ভাতের কথা তোলে এবং শেষ অস্ত্র হিসাবে বলে ওঠে, আর এই যে বলেছিলে সামনের মাস থেকে সুবর্ণকে ইস্কুলে ভর্তি করে দেবে, তার কি হবে?
তার? সত্য স্থির অবিচল গলায় বলে, হবে না।
হবে না? শখ মিটে গেল?
শখ?
সত্য কঠিন গলায় বলে, তা শখই যদি বলছো তো বলতে হয়, কর্তব্যের কাছে শখ বড় নয়।
নবকুমার আবার মিনতি শুরু করে। বার বার বোঝাতে থাকে, ভালমত একটা লোকের ব্যবস্থা করে দিতে পারলে মা ঠিক চালিয়ে নিতে পারবে
সত্য একভাবে বলে, তা হয় না।
আর আমি যদি বলি সুবর্ণকে ছেড়ে আমি থাকতে পারব না।
ওটা বাজে কথা! ‘ছেড়ে থাকতে পারব না’ বলে কোনো কথা নেই জগতে। কত কারণেই ছাড়তে হয়।
নবকুমার কাঁদো কাঁদো হয়।
স্বামীপুরকে একেবারে ভাসিয়ে দেবে তুমি? বাবার তো এখন
পাগলামি করছো কেন? ধরো রোগটা যদি আমারই হত!
অতঃপর যুক্তির পথ ত্যাগ করে–এলোমেলো পথ ধরে নবকুমার। বলে, নবকুমারের কিংবা ছেলেদের যদি হঠাৎ অসুখ-বিসুখ করে?
সত্য মৃদু হেসে বলে, সে যদি করে, কপালে যদি লেখা থাকে, আমি কি আটকাতে পারবো?
আটকাতে না পারো সেবা করতে পারবে। সেটা?
কি মুশকিল! অত কথাই বা ভাবছো কেন? সহজ সুস্থ মানুষ, তিন বাপ-বেটায় থাকবে খাবে, এত ভাবনার কি আছে? আর তেমন দরকার হয়, ঠাকুরঝি তো রয়েছেন-
নবকুমার এবার মারমূর্তি হয়।
প্রায় খিঁচিয়ে উঠে বলে, তা তোমার সেই ঠাকুরঝিটিই বা কলকাতায় বসে সুখ করবেন কেন? তিনি এসে মামার সেবা করতে পারেন না? চিরকালটা এখানে কাটল
সত্য বিরক্ত হয়।
নিজের দায় অপরের ঘাড়ে চাপাব, অমন অন্যায় ইচ্ছে কেন? ঠাকুরঝির করার কথা, না আমার করার কথা?
নবকুমার অগ্নিশর্মা মুখে বলে, তারও কিছু কম কর্তব্য নয়! যে মামা এতকাল ভাত-কাপড় দিয়ে পুষল–
থামো। নীচ কথাগুলো আর বোলো না। ভাত-কাপড়ের কথা যদি বললেই তো বলি– তার দামও উসুল করে নেওয়া হয়েছে। পরের বাড়ি খাটলে বরং ভাত-কাপড়ের ওপর মাইনে বলে হাতে কিছু জমতে।
চিরকালের স্পষ্টবক্তা সত্য স্পষ্ট অভিমত প্রকাশে ভয় পায় না।
কিন্তু নবকুমার যোগ দেখাতে পারছে না। যতবারই ভাবছে যে একলা ফিরে যেতে হবে, আর সেই বাসাবাড়িটায় নিতান্ত বাসাড়ে হয়ে কাটাতে হবে কতকাল কে জানে, ততবারই বিশ্বভুবন অন্ধকার লাগছে তার।
এতর পরেও তর্ক করতে ছাড়ে না সে।
খোটা দিয়ে বলে, এতকাল তো শ্বশুর-শাশুড়ী-মুখো হতে ইচ্ছে হত না সত্যবতীর, হঠাৎ এত ছেদ্দা উথলে উঠল কেন? বলল, আর কিছু নয়, টাইমের ভাত রেঁধে রেঁধে আলিস্যি এসে গেছে, তাই গাঁয়ের বেটাইমের সংসার ভাল লাগছে।… ভয় দেখাল, ছেলেরা বড় হয়ে উঠেছে, এখন মায়ের চোখছাড়া হয়ে বেশীদিন থাকলে স্বভাব-চরিত্র খারাপ করে বসতে পারে। আরো অনেক রকম বলতে লাগল উল্টোপাল্টা সামঞ্জস্যহীন। তবু সত্যবতী নিজ সংকল্পে অটল।
ছেলেদের স্বভাব-চরিত্রের কথা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়া দেখে শুধু ভুরু কুঁচকে বলল, তেমন ছেলে যদি মানুষ করে থাকি তো নিজের হাতে খাবারে বিষ মিশিয়ে মেরে ফেলব ছেলেকে, আর নিজে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলব।
.
মোট কথা নবকুমারকে একাই ফিরতে হল। সুবর্ণ বাবা বাবা করে পথ অবধি ছুটে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরল।
নীলাম্বরকে নিয়ে এখন সদসর্বদা আর জীবনমরণ সমস্যা নেই, অতএব এলোকেশী পেয়ারাতলার উত্তপ্ত বাদ-প্রতিবাদটির মূল রহস্য ভেদ করতে ঘর থেকে বেরিয়ে কাঁঠালপাতার ঝরাপাতা পরিষ্কার করতে থাকেন। কিন্তু পোড়া বয়সের এমনি জ্বালা, কানটা ভোতা হয়ে গিয়ে শত্রুতা সাধে। ভাল বুঝতে দেয় না।
অগত্যাই জিজ্ঞেস করতে হয়, অত কিসের রাগারাগি হচ্ছি নবার সঙ্গে?
সত্য উত্তর দেয় না তা নয়, দেয়, বলে, ছেলে ছেলের বৌয়ের ঘরোয়া কথা, ও আপনি শুনে কি করবেন মা?
আপনি!
হ্যাঁ, কলকাতা থেকে ফিরে শাশুড়ীকে আপনিই বলতে সত্য!
এলোকেশী এই “মেয়েমর্দানি” দেখে অবাক হয়েছিলেন। বলেছিলেন, মেয়েমানুষের মুখে বৈঠকখানার বেটাছেলের মত আপনি! আপনি-টাপনি বোলো না বাছা, শুনে গা জ্বলে যায়!
সত্য বলেছিল, যা সভ্যতা সৌজন্য তা করতে দোষ কি? বেটাছেলেরই সভ্য হতে আছে, মেয়েমানুষেরই নেই? গুরুজনকে আপনি বলাই তো ভাল।
একে হাড়জ্বালানো কথা, তায় সে আপনি! এলোকেশী বেসামাল হন। কোমরে কাপড় খুঁজতে খুঁজতে চিৎকার করেন, ওরে তোর ভেতরটা চিনতে আর আমার বাকী নেই! ওই আধমরা শ্বশুরকে ফেলে বাসায় যাবার জন্যে মরছিলি কোদল করে! বুঝি না আমি কিছু?
সত্য প্রায় হাসির সুরে বলে, তা আপনি আর বুঝবেন না কেন, প্রাচীন হয়েছেন, জগতের কত দেখেছেন!
দেখেছি, তবে তোর মতন আর দুটো দেখিনি। আর আমার ওই ভ্যাড়াকান্ত ছেলের মতন ছেলেও দুটো দেখি নি। যাবে তো নিয়ে মাথায় করে!
