ভিতরের কথা ভিতরই জানে, তবে আজকাল সত্য সদুকে মমতা করে। এখনও করল।
সত্য তার বারুইপুর যাওয়াটা সমর্থন করল না দেখে কৃতজ্ঞতায় চোখে জল এল সদুর। সেই চোখ মুছে বলল, মামী ভাববে সদু কত বড় বেইমান।
সত্য মৃদুস্বরে বলে, প্রাণ উচ্ছুজ্ঞু করেও কেউ কারুর ভাবা আর বলা আটকাতে পারে না ঠাকুরঝি, ও নিয়ে মন খারাপ করো না। ছেলে দুটো রইল, একটু দেখোশুনো।
সদু আক্ষেপের সুর তোলে, দেখাশুনোর আর পথ কোথায় রাখছিস বৌ, স্বপাকের ব্যবস্থা করে যাচ্ছিস শুনছি! কেন, পিসির কাছে দুদিন খেলে কি ওদের জাত যেত?
সত্য একটুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর আস্তে আস্তে বলে, জাত যাওয়ার কথা নয় ঠাকুরঝি, নিজের ভার যে নিজে বইতে হয় এইটুকুই শুধু ওদের শেখাতে চাই আমি। ওরা যেন ওদের বাপের মতন অসাড় না হয়।
.
পাড়ার কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি ঘর-বার করছিলেন এবং ভিতরে মহিলাকুল এলোকেশীর পুত্রভাগ্যের নিন্দাবাদে পঞ্চুমুখ হয়ে উঠেছিলেন।
এলোকেশীও নিঃসংশয় হয়েছিলেন, তার গোবর-গণেশ ছেলেকে বৌ হারামজাদী আসতে দেবে না। ছেলে থাকতে ছেলের হাতের আগুন পাবে না মানুষটা, এই আক্ষেপে তৎপর হচ্ছিলেন এলোকেশী, মানুষটার দেহে প্রাণ থাকতেই।
এই সময় হঠাৎ একজন ছুটে এসে খবর দিল, ওগো এসেছে!
কে? কে? আমার নবু এল?
নবু বৌ দুজনেই এসেছে।
কে? বৌ এসেছে?
এলোকেশী কি আশাভঙ্গ হন? ঈশ্বর জানেন। তবে এলোকেশী রোগী ফেলে ঘরের বাইরের এসে দাঁড়ান।
আর গরুর গাড়ি থেকে নেমে মানুষ দুটো বাড়ির উঠোনে পা দিতেই চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন, ওরে নবা লক্ষীছাড়া হতভাগা, এই শেষাবস্থায় এলি তুই বাপের মরা মুখ দেখতে? এলি এলি, তুই একলা এলি না কেন? ওই মায়াবিনী রাক্ষুসীকে নিয়ে এলি কেন? কী দেখতে এসেছে ও? মজা দেখতে? চিরদিনের দাপটে শাশুড়ীর তেজ-দপ্ন ভাঙা দেখতে এসেছে? শাঁখা-সিঁদুর ঘোচা দেখতে এসেছে?
সত্য গলায় আঁচল দিয়ে প্রণাম করছিল। উঠে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বলে, বিপদের সময় ধৈর্য হারাতে নেই মা, ধৈর্য ধরতে হয়।
.
কিন্তু সেযাত্রা নীলাম্বর মরলেন না। যম যেন বড় একটা কামড় বসিয়ে আবার ফেলে দিয়ে চলে গেল। শুধু কামড়ের দাগটা রইল মোক্ষম। কোমর থেকে নীচের দিকটা সব পক্ষাঘাতে অসাড় হয়ে গেল নীলাম্বরের।
কবিরাজ বললেন, এ রোগের এই দস্তুর। তড়ি-ঘড়ি গেল তো গেল, নচেৎ পক্ষাঘাত।
কিন্তু পাড়ার লোক গালে হাত দিল। বলতে লাগল, ধন্যি বটে এলোকেশী বামনীর শাখা সিঁদুরের জোর! নইলে সন্নেস রোগ হয়ে কেউ কখনো বাঁচে?
হতাশও একটু হল কেউ কেউ।
শাশুড়ী বিধবা হলে ওই অহঙ্কারী শহুরে বৌ কী রকম ব্যাভার করবে এবং কলকাতার মোটা মাইনেওলা চাকরে ছেলে বাপের শ্রাদ্ধে কী রকম ঘটা-পটাটা করবে এই জল্পনা-কল্পনা করছিল তারা, সেটা আপাতত দেখার সৌভাগ্য হল না। বুড়ো এখন এই ন্যাকড়ার ফালির মত লটপটে বা দুখানা আর অবশ কোমর নিয়ে কতকাল বাচবে কে জানে!
কবরেজ তো বলছে, এ অবস্থায় দীর্ঘকাল টিকে থাকতে দেখা যায়।
নবকুমারের ছুটি ফুরিয়ে গেছে, কামাইয়ে চলছে এখন। কিন্তু আর কতদিন চলবে? আড়ালে আবডালে কথাটা একদিন তুলল নবকুমার।
আড়ালেই, কারণ এখন আর রাত্রে একত্র হতে পারা যাচ্ছে না। সত্য সুবর্ণকে নিয়ে শ্বশুরের ঘরের পাশে ছোট্ট একটা ঘরে শুচ্ছে, দু’ঘরের মাঝখানের দরজা খুলে রেখে।
অতএব দিনের বেলাতেই—
ঘাটে যাচ্ছিল সত্য, পেয়ারাতলার ছোপটায় ধরল তাকে নবকুমার।
এ কি! ছিঃ!
সত্য হাত ছাড়িয়ে নেয়।
নবকুমার অপ্রতিভ হাস্যে বলে, তুমি যে একেবারে ডুমুরের ফুল হয়ে উঠেছ। দরকারী কথাও তো আছে!
সত্য বলে, বল।
বলছি এবার তলপী গোটাও। ছুটি তো কবে শেষ হয়ে গেছে। নেহাত সায়েব সুনজরে দেখে, তাই সাহস করে এতদিন কামাই চলছে। কিন্তু মাত্রা রাখতে হবে তো?
সত্য একবার আশশ্যাওড়ার বেড়া-ঘেরা আর কাটা-নটের জঙ্গলে ভরা উঠোনটায় চোখ বুলোয়, একবার ভরা আকাশটার দিকে তাকায়, তারপর নবকুমারের দিকে তাকিয়ে বলে, তা বেমাত্রা কাজ করবেই বা কেন? দুর্গা বলে বেরিয়ে পড় এইবার।
বেরিয়ে পড় বললেই তো পড়া হচ্ছে না। পাজিপুঁথি দেখতে হবে, বাড়িতে মায়ের কাছে থাকতে একটা ঝিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। তোমাকে সেটা জানান দিচ্ছি। মায়ের কাছেও তো রয়েসয়ে পাড়তে হবে কথাটা?
সত্য শান্ত গলায় বলে, সায়েবের আপিসের চাকরি, ছুটি ফুরিয়ে গেলে অধিক দিন থাকা চলে, এ কথা কচি ছেলেটাও বোঝে, মাকেই বা বোঝাতে হবে কেন?
হবে কেন! জানো না মা চিরকালে অবুঝ! তোমার দ্বারা যতটি হচ্ছে, ততটি ঝিয়ের দ্বারা হবে না সেটা তো সত্যি। কাজে কাজেই
ঝিয়ের দ্বারা করাতে হবে কেন? সত্য স্থির গলায় বলে, আমার তো আর আপিসের ছুটি ফুরোয় নি? আমি তো চলে যাচ্ছি না কোথাও?
আমি তো যাচ্ছি না!
এ কী নিদারুণ বাণী!
নবকুমার আকাশ থেকে পড়ে।
তুমি যাচ্ছ না?
না, আমি এক্ষেত্রে যাব কি করে?
বুঝলাম। মানলাম সেটা অকর্তব্য হবে। কিন্তু ওদিকে? ছেলে দুটো কতকাল হাত পুড়িয়ে খাবে?
তা যতকাল না তাদের ঠাকুর্দার রোগ সারে
ও রোগ আর সেরেছে–, নবকুমার আক্ষেপে ডুকরে ওঠে, ও কি সারবার রোগ? এখন শুধু পড়ে পড়ে দিন গোনা!
সত্য সামান্য হেসে বলে, তা সে দিন তো কেউ একা বসে গোনে না, দিন গোনার সঙ্গী হতে হয় আত্মীয় বন্ধু ছেলেমেয়েকে।
