কিন্তু সতীনকে সদু সত্যিই মেয়ের অধিক যত্ন করে। যে মানুষটা আস্ত এত বড় একটা সংসার সদুকে ভোগ করতে দিয়েছে, তার ওপর কৃতজ্ঞতা থাকবে না সদুর?
মুকুন্দ বলেন, কী গো, তুমি যে দেখি অসাধ্য সাধন করতে পার! মড়াটাকে যে দিব্যি সারিয়ে তুললে?
মড়া কেন হবে? তোমার অছেদ্দা-অযত্নয় ঘুণ ধরে যাচ্ছিল। ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে সদু নিজস্ব স্বভাবে, শুকনো গাছটাতেও নিয়মিত জল দিয়ে ফুল ধরে, বুঝলে?
তা তো বুঝলাম–, মুকুন্দ ভারী যেন এক রহস্যের ভঙ্গিতে বলে, সতীনকাটাকে জীইয়ে তুলছ, ফিরে উল্টে তোমায় আবার বিধবে না তো?
সদু বলে, বেঁধার ভয় সৌদামিনী করে না। হুঁ, কন্টকশয্যাতেই তো জীবন গেল!
মুকুন্দ বিগলিত মুখে বলেন, এখন তাই ভাবি, কি কাজই করেছি এতকাল! এমন একখানা ঘরণী-গৃহিণী পরিবার থাকতে
সদু একটু আনমনা হয়।
বলে, মামা-মামীর সন্যে একটু কষ্ট হয়। মামী তো গতরটি নাড়তে চাইত না, এখন হাঁড়ির হাল হচ্ছে আর কি!
মুকুন্দ সতেজে বলেন, তা তাঁদের বেটা বেটার-বৌ থাকতে হাঁড়ির হাল হয় তো বলতে হবে অভাগ্যির কপাল! সে দায়িত্ব আমার নয়!
নয়ই বা বলি কি করে? অসময়ে আশ্রয়দাতা তো বটে? মামী না টানলে কোথায় ভেসে বেড়াতাম, কে বলতে পারে?
এ কথাগুলো মুকুন্দর গায়ে লাগে।
অতএব আরো সতেজ উত্তর দেন তিনি, টেনেছেন তোমার দরকারে নয়, নিজের দরকারে। তা ছাড়া যার হাঁড়িতে যার যতদিন অন্ন মাপা থাকে, কেউ রদ করতে পারে না, এ হচ্ছে শাস্ত্রের কথা!
শাস্ত্রবাক্যের পর বোধ করি আর তর্কের সাহস হয় না সদুর। অথবা অনেক দুঃখের শেষের এই পাতার আশ্রয়টুকু হারাবার ভয়।
মামা-মামীর কথা মনে পড়লে মন কেমন করে না তা নয়, কিন্তু আবার সেখানে ফিরে যাবার কথা ভাবতেও গা শিউরোয়।
.
তা গা শিউরোয় সকলেরই।
নবকুমার পর্যন্ত এখন শহর-জীবনের সুবিধে-স্বাচ্ছন্দ্যে এমনই অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে দেশে যাবার নাম করে না।
কিন্তু তার এই নিশ্চিন্ত জীবন রইল না। হঠাৎ এল বিপর্যয়। খবর এল নীলাম্বর বাঁড়ুয্যে মৃত্যুশয্যা নিয়েছেন।
খেয়ে উঠে ঘাট থেকে আঁচিয়ে ফিরছিলেন, হঠাৎ ঘাড় লটকে অজ্ঞান। কেউ বলছে সন্ন্যাস রোগ, কেউ বলছে ভূতে পাওয়া। তবে বাঁচার আশা নেই আর।
খবর পেয়ে নবকুমার উথলে উথলে কাঁদতে থাকে এবং এযাবৎকাল যে কোনদিনই পুত্র-কর্তব্য পালন করে নি, সে কথা তুলে ইনিয়ে বিনিয়ে বিলাপ করতে থাকে। তার সঙ্গে এ আমেজটুকুও থাকে, পরিবারের প্ররোচনাতেই তার এই অকর্তব্য আর অকৃতজ্ঞতা।
সত্য একটা ছোট তোরঙ্গে কয়েকটা কাপড়চোপড় পুরে নিচ্ছিল, নবকুমারের শোক উদ্দাম হয়ে উঠেছে দেখে উঠে এল। কঠিন গলায় বলে উঠল, তা স্ত্রৈণ পুরুষের তো এরকম হবেই। সে পুরুষের তুলনা ভেড়ার সঙ্গে। কেঁদে হাট বাধিয়ে আর কি হবে? এখুনি যাতে যাওয়াটা হয় সে ব্যবস্থা কর। কাঁদবার জন্যে অনেক সময় পাবে এর পর।
নবকুমার গলা ঝেড়ে নিয়ে বলে, আমি তো এখুনি রওনা দিচ্ছি।
তুমি একা নও, আমিও যাব।
তুমি! তুমি?
অবাক হচ্ছ কেন? কথাটা খুব আশ্চয্যি লাগছে?
না, মানে তুমি এখন হঠাৎ যাবে কি করে? সামনে ওদের একজামিন—
ওদের একজামিন, ওরা দেবে। তার জন্যে আমার আটকাচ্ছে কিসে?
আহা, বলি ভাত-জল তো দিতে হবে ওদের?
সে ওরা দু-ভাইয়ে দুটো ফুটিয়ে নিতে পারবে। সব গুছিয়ে বলে দিয়েছি।
অর্থাৎ ব্যবস্থা যা করবার সব করে ফেলেছে সত্য এই ক-ঘণ্টার মধ্যে।
নবকুমার হাঁ-হাঁ করে ওঠে, ওরা নিজেরা? তার মানে আর একটা বিপদ ডেকে আনা? সবতাতেই গা-জোর! তার থেকে সদুদির কাছে থাক কদিন
না।
না? কেন, না কেন?
কেন, কী বিত্তান্ত এত কথা কওয়ার আমার সময় নেই এখন–
বেশ, কুটুমবাড়িতে যদি আপত্তি থাকে, নিতাইয়ের বৌ ডাল-তরকারি দিয়ে যাক্, ওরা শুধু দুটো ভাত সেদ্ধ করে
হয়েছে থাম তো তুমি! তুচ্ছ ব্যাপারকে এতখানি করে তুলো না। যে কদিন আমি না আসতে পারব পাতে-ভাতই খাবে, ব্যস!
নবকুমার আবার ডুকরে ওঠে, কদিন থাকতে হবে জান তুমি? বাবার যদি ভাল-মন্দ কিছু হয়?
যা হবার তা হবেই। আগে থেকে ভেবে লাভ?
সদু বললো, বৌ, আমিও যাই তোমাদের সঙ্গে
সত্য সদুর শুকনো মুখটার দিকে তাকাল।
ভাবল এই শুষ্কতা কি শুধুই নিকট আত্মীয়ের জীবনমরণ নিয়ে দুশ্চিন্তায়? নাকি অন্য কিছু?
সদু কি ভয় পাচ্ছে, এরা সদুকে রোগীর সেবার জন্যে ঠেলে দেবে? ভয় পাচ্ছে, বাইরে কেউ ঠেলা না দিলেও, ঠেলার হাত এড়াতে পারবে না সে! ভিতরের ঠেলায়–
সত্য কী বুঝল কে জানে? বলল,
না ঠাকুরঝি, তোমার আর এখন গিয়ে কাজ নেই। আমরাই তো যাচ্ছি।
তা হলেও আমার একটা কর্তব্য তো আছে?
সত্য বলে, থাক ঠাকুরঝি, অনেক সমুদ্র পার হয়ে সবে একটু মাটি পেয়েছো, এখন আর নড়াচড়ায় কাজ নেই।
সদু অবাক হয়।
এ ধরনের কথা সত্যর মুখে যে বড় দুর্লভ। সদুর সতীনের ঘর করতে যাওয়াটা যে সত্যর সমর্থন পায়নি, এ কি সদু বোঝে না? তবে?
তবেটা কী, সত্য নিজেও ভাবে। ভেবে ঠিক করতে পারে না, সদুর প্রতি সেই ঘৃণা আর ধিক্কারের ভাবটা তার চলে গেল কী করে? আর কবেই বা গেল? এখন দেখছে সে জায়গায় এসেছে যেন করুণা, মমতা।
চিরবঞ্চিত সদুর মুখের পরিতৃপ্তির ছাপটাই কি সত্যর পাথর মনকে গলিয়েছে?
নাকি আজকের সদুর মাতৃমূর্তি দেখে উপলব্ধি করছে সত্য, কত বঞ্চিত ছিল সদু!
