সংঘর্ষটা আজকাল কম।
কারণ সত্যর একটা কাজ বেড়েছে, সে কাজ সুবর্ণর। সুবর্ণর মধ্যে বুঝি নিজের জীবনের সম্পূর্ণতা দেখবে সত্য। তাই ছোট্ট থেকেই তার ভাঙাচোরা খণ্ডগুলো জড়ো করে পালিশ করতে চায় সে, নক্সা কাটতে চায় তাতে।
এদিকে নবকুমারের প্রাণপুতুল সুবর্ণ।
অতএব সুবর্ণই এখন দুজনের মাঝখানে একটি মনোরম সেতু।
নবকুমার ডাকে, এই শুনছো তোমার মেয়ের বাক্যি?
সত্য ভ্রূভঙ্গী করে বলে, তুমি শোনো!
নবকুমার হাসে, আমার তোমার বাক্যি শুনতে শুনতেই জীবন ওষ্ঠাগত! তাই না?
সত্য হাসে, তোমার জামাইয়ের কপালে আবার বিধাতা কি লেখন লিখেছে দেখো!
নবকুমার রসিকতা করে বলে, তা সে কপালে শ্বশুর ব্যাটার চাইতে কোন্ না এককাঠি সরেস। মেয়েকে আবার মা মস্ত বড় বিদ্যেবতী করে তুলবে!
তা এসব রসিকতাই।
সংঘর্ষ নয়।
সুবৰ্ণ যেন সংসারের তপ্ত বালুকায় একটুকরো স্নিগ্ধ ছায়া! আচ্ছা, এই ছায়াটুকু কি মেয়ে মাত্রেই?
তাই কি মেয়েকে “লক্ষ্মী” বলে? “শ্রী” বলে? অন্তত সুবর্ণর ক্ষেত্রে এগুলো সফল হয়েছে। তাই সত্যর জীবনে যেন কিছুটা স্তিমিত শান্তি এসেছে।
অবিশ্যি ওরই মধ্যে একবার–ছেলেদের কলেজে পড়া নিয়ে একবার সংঘর্ষ উঠেছিল, তবে সেটা টেকে নি। নবকুমার বলেছিল, ছেলেরা এন্ট্রান্স পাস করেছে শুনে সায়েব তো মহাখুশি। বলে, দুই ছেলে একসঙ্গে পাস করেছে? গুড! তাদের, নবকুমারবাবু, আমি থাকতে থাকতে অফিসে ঢুকিয়ে দিয়ে যাই।
সত্য কথার মাঝখানে বলেছিল, পাগল!
পাগল। পাগল মানে? নবকুমার অবাক হয়ে গিয়েছিল। ভেবেছিল খবরটা দেওয়ার পরই সায়েবের মহানুভবতা নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ আলোচনা করতে পারে। তার পর অফিসের সহকর্মীদের নবকুমারের সৌভাগ্যে কতটা ঈর্ষান্বিত হবে, সে প্রসঙ্গে নিয়ে হাসাহাসি করবে।
কিন্তু চিরাচরিত বিরুদ্ধতার নীতিতে সত্য এই সৌভাগ্য-সংবাদের উপরও অগ্রাহ্যের ঝাঁপটা মারে, বলে, পাগল!
নবকুমার বলে, পাগল মানে?
মানে ওরা এখন চাকরি করবে না, পড়বে।
পড়বে! আবার কত পড়বে? আর চাকরির জন্যই তো পড়া! তাই যখন হয়ে যাচ্ছে–
সত্য একবার নবকুমারের দিকে শীতল দৃষ্টিনিক্ষেপ করে বলেছিল, না, চাকরির জন্যে পড়া নয়, মানুষ হওয়ার জন্য পড়া। তাছাড়া সাধন উকিল হবে, সরল ডাক্তার।
সাধন উকিল হবে, সরল ডাক্তার!
নবকুমার তীব্ৰস্তরে বলে, কোথায় দুজনে দু’মুটো টাকা ঘরে আনবে তা নয়, ঘরের কড়ি খরচা করে ওদের এখন বিদ্যেদিগগজ করে তুলতে হবে! লক্ষীছাড়া বুদ্ধি আর কাকে বলে!
তোমায় ওদের পড়ার জন্যে এক পয়সাও খরচা করতে হবে না।
আমায় করতে হবে না? চমৎকার! টাকাটা তা হলে আসবে কোথা থেকে?
সত্যবতী নিশ্চিন্ত স্বরে বলেছিল, ওরা ছেলে পড়িয়ে কলেজের মাইনে যোগাড় করবে।
সত্যবতী এই ঘোষণাটি উচ্চারণ করে কথায় পূর্ণচ্ছেদ টেনে চলে যাচ্ছিল, নবকুমার সব্যঙ্গে বলে ওঠে, ছেলে পড়িয়ে! গলা টিপলে দুধ বেরোয়, কে ওদের মাস্টারির চাকরি দেবে?
সত্য হঠাৎ হেসে ওঠে, ওমা সে কি গো, আপিসে চাকরি দিতে চাইছিল
সেটা ওদের মুখ দেখে নয়। আমার খাতিরে
তা হলে ধরে নাও, আমারও কোথাও কিছু খাতির আছে।
তা আশ্চয্যি নেই, নবকুমার সক্রোধে বলেছিল, তুমি যে তলে তলে কী করে বেড়াও তুমিই জান! সাতটা বেটাছেলের কান কাটতে পার তুমি!
রেগেছিল, তবে পরাভব যে নিশ্চিত সেটাও বুঝে নিয়েছিল। শেষ চেষ্টা আক্ষেপ প্রকাশ।
সাহেবকে যে কোন মুখে মুখ দেখাব তাই ভাবছি!
ভাববার কিছু নেই, সত্য বলেছিল, বলবে ওদের মায়ের ইচ্ছে আরো লেখাপড়া করে।
সে কথা বলা মানেই বোঝানো, আমি পরিবারের কথায় চলি-
তা সে কথা ভাবলেও দোষ নেই, সত্য হেসেই উঠেছিল, ওদের সমাজে পরিবারই সর্বেসর্বা। পরিবারের কথায় ওঠে বসে ওরা।
ও, তুমি ওদের দেশে গিয়ে ওদের সমাজ সংসার দেখে এসেছ যে
সত্য আর একটু হেসেছিল, সবই কি আর চোখে দেখে তবে শিখতে হয়? চোখে না দেখে শেখা যায় না?
অতঃপর ছেলেরা কলেজ ভর্তি হল এবং সুবর্ণ মায়ের কাছে অ আ শিখতে শুরু করল।
সদু বেড়াতে আসে মাঝে মাঝে, দেখে গালে হাত দেয়, এক ফোঁটা মেয়েকে তুমি অক্ষর পরিচয় করাচ্ছ বৌ! পাঁচে পা না দিলে বিদ্যে ছুঁতে আছে!
সত্য মৃদু হেসে বলে, সে ছেলেদের ছুঁতে নেই। মেয়ের আবার নিয়ম! ওকে তো আর তোমরা হাতেখড়ি দিতে দেবে না?
তা তোমার বুড়ো বয়সের আহ্লাদীকে তাই দিতে বরং! তোমার তো সবই গা-জুরি!
বলে সদুও হেসেছে। সদু চিরদিনই হাসে, এখনও তার হাসির কামাই নেই, তবে ধরন বদলেছে।
সদুর দেহে মেদের সঞ্চার হয়েছে, সদুর মুখে পরিতৃপ্তির মসৃণতা! সদ্ গল্প করে, আমার বড় ছেলেটা, আমার সেজ মেয়েটা–, বলে, মেজ মেয়ে বোধ হয় শ্বশুরবাড়ি থেকে আসবে!
সদুর সতীন তা হলে সত্যিই মরেছে?
নাঃ, তা নয়।
সদুর সতীন বেঁচে আছে, বরং ভালই আছে। রোগটা একটু সেরেছে, চেহারা একটু ফিরেছে। রাতদিন বলে, দিদি, তুমি যাই এসেছিলে, তাই তরে গেলাম! বলে, ওই কসাইয়ের হাতে পড়ে সারা জীবনটা শুধু জ্বলেপুড়ে মরেছি দিদি, যত্ন যে কী বস্তু তা তুমি আসার আগে কখনো জানি নি। গরীবের ঘরে মা-বাপ-মরা মেয়ে, তারা পার করেছিল না দূর করেছিল, তুমি বোধ হয় আমার আর জন্মের মা ছিলে।
সদু হেসে বলে, মরণ আর কি! কাকে কি বলতে হয় তা জানিস না? সতীনকে মা?
