এরা হেসে ওঠে।
এ আসরে নবকুমারও এক-একদিন যোগ দিত। এই ভবঘুরে শালাটির প্রতি তারও বেশ একটু প্রীতির সঞ্চার হয়েছিল। চুপি চুপি সত্যকে বলতো, কায়দা করে আটকে ফেলে একটা কনেটনে যোগাড় করে বিয়ে দিয়ে ফেল না? তখন দেখবে, বাছাধন কেমন বাউণ্ডুলে হয়ে বেড়ায়!
সত্য বলতো, থাক গে, বেড়াক না। একটা মানুষ না হয় জগৎ-ছাড়া হল। সবাইকে বিয়ে করে ঘর-সংসার করতেই হবে, এমন তো কিছু লেখাপড়া নেই?
আহা, সন্নিসী হত তো সে এক কথা। এ যে না গেরুয়া; না সংসারী!
তা হোক।
নবকুমার বলতো, তবে আর কি বলবো! আসরে গিয়ে বলতো, তারপর শালাবাবু, কোন কোন্ তীর্থ করেছ বল?
নেড়ু বলতো, তীর্থ-টির্থ কিছু করি নি বাবা, তীর্থধর্ম নিয়ে মাথাও ঘামাই নি। তবে ভ্রমণ করতে গেলেই তীর্থ। পৃথিবীর যেখানে যত শোভা-সৌন্দর্যের জায়গা, সেখানেই তো মানুষ দিব্যি এক-একখানা তীর্থ বানিয়ে রেখেছে।
সত্য প্রশ্ন করেছিল, শেষ তুই কোথা থেকে ঘুরে এলি?
কাশী। কাশী আগেও গিয়েছিলাম অবিশ্যি। প্রথম তো কাশীতেই যাই।
কাশী? সম্প্রতি কাশী গিয়েছিলি তুই? সত্য রুদ্ধকণ্ঠে বলে, বাবার সঙ্গে দেখা করেছিলি?
বাবা মানে মেজকাকা? নেড়ু আশ্চর্য হয়ে বলে, কাশী গেছেন বুঝি?
গেছেন কি রে নেড়ু! বরাবরের জন্য গেছেন। বাবা কাশীবাসী হয়েছেন।
আঁ! সে কি!
তবে আর বলছি কি!
নেড়ু এই একটিমাত্র প্রসঙ্গে গম্ভীর হয়! আস্তে নিঃশ্বাস ফেলে বলে, জানি না তো! জানলে খুঁজে নিয়ে দেখা করবার চেষ্টা করতাম। নিত্যানন্দপুরে মেজকাকা নেই, এ যেন ভাবাই যায় না, না রে সত্য?
সত্য কথার জবাব দেয় না।
সত্য চোখ তোলে না। সুবর্ণকে কোলে চেপে বসে থাকে।
আবার কোনো এক সময় পুণ্যির প্রসঙ্গ ওঠে।
এক বেলার জন্যে শ্রীরামপুরে পুণ্যির বাড়িও গিয়েছিল নেড়ু। তা এক বেলার বেশী থাকতে পারে নি। পুণ্যি নাকি এমন গিন্নী হয়ে গেছে যে দেখে প্রাণ হাঁপিয়ে উঠেছিল নেড়ুর। যতটুকু সময় ছিল নেড়ু, ততটুকুই কেবল তাকে উপদেশ দিয়েছে আর ধিক্কার দিয়েছে পুণ্যি।
জগৎটা কতই বদলে যাচ্ছে! সত্য নিঃশ্বাস ফেলে বলে, ছোটবেলার কথা তোর মনে পড়ে নেড়ু?
পড়ে। পড়বে না কেন? তবে কি জানিস সত্য, একে তো তুই মা-বাপের এক সন্তান, তায় আবার মেজকাকা মেজখুড়ীর মত বাপ-মা! তোর স্মৃতিতে আমার স্মৃতিতে তফাৎ আছে। চোদ্দটা ছেলেমেয়ের একটা আমি।
তা হলেই বা। তুই তো কোলের ছেলে।
দূর! দূর! মানুষ না হাঁস-মুরগী!
এ ধরনের কথায় সত্য লজ্জিত হয়ে অন্য প্রসঙ্গ এনে ফেলতো। হয়তো পুণ্যির কথাই ফের তুলতো। সেই রকম রোগা আছে পুণ্যি, না মোটা হয়েছে? এখনো তেমনি চুলের রাশি আছে কিনা?
চুল?
নেড়ু হেসে উঠেছে, এই এত বড় একখানি টাক! তার ওপর এততখানি সিঁদুর লেপা। অবিকল সেজঠাকুমা। আমি বললাম, মা শেতলা, গড় করি! আর নয়!
সত্য হেসে ফেলে বলে, সেই তো বোকা-হাবা ছিলি তুই নেড়ু এত কথা শিখলি কি করে?
নেড়ু বলে, হাওয়ায় বাতাসে! যত মানুষ দেখবি, তত বুদ্ধি বাড়বে! খুব স্ফূর্তিতে ছিল নেড়ু।
আর সত্যি বলতে, দিন দশ-বারোতেই যেন চেহারা ফিরে যাচ্ছিল। রং ফিরছিল, গড়ন ফিরছিল। হয়তো মাস দেড় দুই থাকলে দশাসই হয়ে উঠতে রোগা লম্বা নেড়ু। কিন্তু থাকলো না। হঠাৎ বলে উঠলো, আর নয় রে সত্য, তোর এখানে শেকড় গজিয়ে যাচ্ছে, এবার পলায়ন দিই!
সত্য চমকে উঠেছিল।
সত্য বসে পড়েছিল।
চলে যাবি?
এই দ্যাখো, চলে যাবো না তো কি বোনাই-বাড়িতে মৌরসীপাট্টা নিয়ে বাস করতে এসেছি?, না, আর একদিনও না।
সত্যর কাকুতি-মিনতি, সত্যর ছেলেদের দরদস্তুর আর নবকুমারের অনুরোধ উপরোধ, সব ঠেলে ক্যামবিশের ব্যাগটা গুছিয়ে নিয়ে পা বাড়ালো নেড়ু। শুধু যাত্রাকালে বললো, দে বাবা তোর ওই নারকেলনাড় দিয়ে দে পুঁটলিখানেক। পচবার মাল নয়। চলবে বেশ কিছুদিন। যখনি খাবো, তোদের মনে পড়বে।
তা শুধুই নারকেলনাড়ু নয়, চোখের জল মুছতে মুছতে একবেলার মধ্যেই অনেক কিছু বানিয়ে ফেলেছিল সত্য।…
তিলের নাড়, ক্ষীরের ছাঁচ, মুগের বরফি, কুচো গজা, মুড়কির মোয়া।
জবরদস্তি করে সব পুরে দিয়েছিল তার ব্যাগে। আগে মাথার দিব্যি দিয়ে লুকিয়ে দশ টাকা হাতে গুঁজে দিয়েছিল তার।
ভবঘুরে নেড়ুরও কি চোখ দুটো ভিজে এসেছিল?
এসেছিল কিনা চোখই জানে। তবে গলাটা যে ভিজে উঠেছিল তার, সেটা সত্য টের পেয়েছিল। টাকা কটা সেই রংচটা কোটের পকেটে রাখতে রাখতে ভিজে গলায় বলেছিল, তুই তাই নিলাম সত্য। আর কারো সাধ্য ছিল না যে আমাকে
সুবর্ণকে কোলে তুলে নিয়ে অনেক লোফালুফি করে নামিয়ে দিয়ে বিদায় নিল নেড়ু। সত্যর বর্তমানের নিস্তরঙ্গ জীবনে নেড়ু যেন বড় একটা তরঙ্গ তুলে দিয়ে গেল। অনেকদিন পর্যন্ত নেড়ুর প্রসঙ্গ ধ্বনিত হতে থাকলো এ বাড়িতে।
অনেকদিন পর্যন্ত সত্য যেন আনমনা হয়ে রইল। সমবয়সী, বরং বা একটু বড়, এই ভাইটির ওপর সত্যর যে কেন বাৎসল্য-স্নেহের মত এমন একটা স্নেহ জেগে উঠেছিল কে জানে? অথচ তার মাঝখানেই যেন শ্রদ্ধা, সমীহ আর ভক্তি বিমিশ্রিত একটা অপূর্ব ভাব।
নেড়ু বেচারা!
নেড়ু অবোধ!
তবু নেড়ু যেন অনেকটা উঁচুতে, সত্যর নাগালের বাইরে।
ভবঘুরেনেড়ুর জীবনদর্শন নেড়ুকে সত্যর চোখে এক মহান নাটকের মহিমান্বিত নায়করূপে প্রতিষ্ঠিত করে রেখে গেছে।
৪৫. কাটে দিন, কাটে রাত্রি
কাটে দিন, কাটে রাত্রি।
