সত্য সেইমাত্র পড়শী গিন্নীকে বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে দরজায় খিল লাগিয়ে পিছন ফিরেছে, তখনো দাওয়ায় ওঠে নি। ভাবল সেই মহিলাই বোধ করি কিছু বলতে ভুলেছেন বা সত্যর সঙ্গে তার কোন বস্তু চলে এসেছে। নিশ্চিন্ত চিত্তেই তাই ফের খিলটা খুলেছিল সত্য, আর খুলেই থতমত খেয়ে দু পা পিছিয়ে গিয়েছিল।…
কিন্তু পিছিয়ে গিয়েই কি তাড়াতাড়ি দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছিল সত্য? তাই দেওয়াই তো উচিত ছিল। তা বলতেই হবে, উচিত কাজ সত্য করে নি। সে যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়ে সামনের মূর্তিটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে থেকেছিল।
রুক্ষ ধূসর মাথাভর্তি চুল, তামাটে কালচে রং, শীর্ণ পেশীবহুল মুখ, আর রোগা পাকসিটে চেহারা! দৈর্ঘ্যের তুলনায় প্রস্থটা নিতান্তই কম। আর ওই দৈর্ঘ্যের জন্যই পরনের ধুতিটা খাটো মনে হচ্ছে। গায়ের রং-জ্বলা গলাবন্ধ কোটটাও যেন মানুষটার নীচের দিকের অনেকখানি অংশকে বঞ্চিত করে সহসা থেমে পড়েছে।
হাতে একটা ক্যাম্বিসের পোর্টম্যান্টো, সেটাকে দোলাতে দোলাতে মৃদু মৃদু হাসছে লোকটা। হঠাৎ কেউ সত্যকে এই অবস্থায় দেখলে কী বলবে বা বলতে পারে, সে কথা স্মরণাত্র না করে হাঁ করে দাঁড়িয়েই থাকে সত্য। অতঃপর লোকটা হেসে উঠে বলে, কী রে সত্য, চিনতে পারলি নে তা হলে?
অথচ চিনে ফেলেছে তখন সত্য, ঠিক সেই মুহূর্তেই চিনে ফেলেছে। আর সেই আকস্মিকতার মুহূর্তে রুদ্ধকণ্ঠে উচ্চারণ করেছে, নেড়ু তুই!
উঠে এসে দাওয়ায় গুছিয়ে বসে নেড়ু বলে, যা ভাগ্যি যে চিনতে পারলি, চোর হ্যাঁচোড় বলে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলি নে, এই ঢের!
সত্য তিরস্কারের সুরে বলে, তা দিলেও তুই আমায় দোষ দিতে পারতিস না নেড়ু। চেহারাখানা যা বাগিয়েছিস, চোর ছাচোড়ের অধম! তোকে দেখে আহাদ করবো, না কাঁদবো তা বুঝছি না। বলে দিচ্ছি এখন থেকেই, সহজে তোর এখান থেকে যাওয়া হবে না, থাকবি আমার কাছে।
নেড়ু হেসে ফেলে বলে, তোর হাতের রান্না খেয়ে খেয়ে মোটা হবো?
হবিই তো! মিথ্যে নাকি? সত্য সতেজে বলে, কিছুকাল খেয়ে ঘুমিয়ে স্বাস্থ্য শরীর ভাল ক। এই তালে চললে বেশীদিন আর পৃথিবী দেখে বেড়াতে হবে না।
তা সত্যর কথাটা একেবারে অবহেলা করতে পারে নি নেড়ু। ছিল কয়েকটা দিন। ভারী খুশি খুশি মনেই ছিল। দুবেলা খেতে বসে রান্নার প্রশংসায় পঞ্চুমুখ হত আর বলতো, নাঃ, যতদূর বুঝছি বোনাই-বাড়ি থেকে আমাকে আর নড়তে দিবি না তুই সত্য! তোর এই সুক্ত, মোচার ঘন্ট, আঁচড়ের ডালনা, মাছের ঝোলের বন্ধনেই বেঁধে রেখে দিবি…। বলতো, জামাইবাবুর আমার এখনও শরীরটা যে কী কারণে অমন নাড় গোপালটির মত রয়ে গেছে, তা বুঝতে পারছি। ছেলেদের ডেকে বলতো, বুঝলে হে বাপধনেরা, তোমরা যে জননী রত্নটি পেয়েছ, লাখে একটি এমন মেলে না!
সত্য মুগ্ধ বিগলিত চিত্তে ওর কথা শুনতো, চোটপাট উত্তর দিতেও ভুলে যেত মাঝে মাঝে।
বাড়ি ছেড়ে পথে পথে ঘুরে নেড়ুর কথার ধরনটা কী অদ্ভুত ভাবে বদলে গেছে! এ ভাষা এ সুর নিত্যানন্দপুরের নয়। বারুইপুরেই কি এমন সহজ কৌতুকের সুরের হালকা চালের কথা শুনেছে সত্য? অথবা কলকাতায়?
নাঃ, শোনে নি।
সত্যর দেখা মানুষরা সব যেন চোখের সামনে ভিড় করে আসে। কেউ চঞ্চল, কেউ গম্ভীর, কেউ ব্যস্ত, কেউ মন্থর। কেউ ভয়ঙ্কর, কেউবা হাস্যকর। এমন হাসিতে উজ্জ্বল, কৌতুকে সহজ, অথচ ভারহীন নির্লিপ্ত কই কোথায়?
নেড়ুর কথা শুনবে বলেই সত্য তাড়াতাড়ি হাতের কাজ সেরে নিত, সত্যর ছেলেরা আগে আগে পড়া সেরে নিত…. হ্যাঁ, সত্যর ছেলেরাও সত্যর মতই মুগ্ধ বিমোহিত। নানা দেশ-বিদেশের গল্প ফাঁদতে নেড়ু, নানা অভিজ্ঞতার। রসিয়ে রসিয়ে গল্প করতো তার।….
ট্যাঁকে নেই পয়সা, পেটে নেই ভাত। অথচ মুখে হারছি না, বুঝলি? ধর্মশালার সেই লোকটাকে জোর গলায় বলছি–আমি রাধছি না খাচ্ছি না তাতে তোমার কি হে বাপু? তোমার এই ধর্মশালায় এমন কোন লেখাপড়া আছে যে রাঁধতেই হবে, খেতেই হবে? লোকটা একেবারে গরুড়ের অবতার, বুঝলি? হাত জোড় করে বলল, আজ্ঞে লেখাপড়া কিছু নেই, তবে আপনি ব্রাহ্মণসন্তান, চোখের সামনে না খেয়ে পড়ে থাকবেন, দেখি কি করে? দেখছি তো আপনি রাধছেন খাচ্ছেন না। বেরিয়ে গিয়ে পুরী-কচুরীও কিনে আনছেন না–
বললাম, আমার ব্রত আছে।
তবু ব্যাটা নাছোড়বান্দা। বলে, কী ব্রত?
আরো গম্ভীর হয়ে বলি, সে তুমি বুঝবে না।
তা এমন কি ব্ৰত যে দুধ গঙ্গাজল এসব খেতে মানা?
আমি রাগ দেখিয়ে বলি, অত কৈফিয়ৎ তোমায় দিতে যাব কেন হে? ঠিক আছে, চলে যাচ্ছি অন্য ধর্মশালায়। অথচ বুঝলি কিনা, মনে মনে ভাবছি, অত কথা না শুধিয়ে এনেই দে না বাবা ছড়াখানেক মর্তমান, গোটাকতক মিষ্টি পুরুষ্ট আম, সেরটাক মালাই, আর গণ্ডা আষ্টেক মণ্ডা–।
কথার মাঝখানেই হেসে লুটোপুটি খেত সাধন সরল। সরল হয়তো বা যোগও দিত–গণ্ডা বারো চমচম, এক চাঙারি গরম জিলিপি…
তা মন্দ বলিস নি নেড়ু বলতো, তখন মনে হচ্ছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড শেষ করি। অথচ হ্যাংলা বামুন হতে রাজী নই। তাই বলবো কি, সত্যিই সেদিন এসে হাজির করলো লোকটা বড় লোটার এক লোটা ক্ষীরের মত ঘন গরম দুধ, আর ইয়া বড় বড় গোটাচারেক কদলী। বলে এ খেলে তোমার ব্রত নষ্ট হবে না। আমি বুঝলি কিনা, তাকে যেন কতই কৃপা করছি, এইভাবে মেরে দিলাম সেগুলো। মারছি আর ভাবছি, আরো চারটি কিছু আনলি না কেন বাবা?
