নেড়ু হো হো হেসে ওঠে, কি মনে হচ্ছে? বেচে খেয়েছি? তা মাঝে মাঝে যা অবস্থা যায়, চুল নখ হাত পা বেচে খাই এমনই মতি হয়। রংটা বেচতে পারলে নিশ্চয় বেচতাম, বেচবার নয়, এই যা! রোদে পুড়ে পুড়েই আর কি—
নেড়ুর ওই কৌতুক কথা কটির মধ্যে থেকেই নেড়ুর অবস্থাটা স্পষ্ট ধরা পড়ে যায়, আর ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই চোখে জল এসে যায় সত্যর।
কিন্তু সে জল চোখেই আটকে রেখে সত্য সেই অতীতকালের মতই ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে, খুব তো ব্যাখ্যান করছিস অবস্থার, বলি হঠাৎ এমন নিরুদ্দেশ হবার শখ হল কেন বল দিকি? এমন হাঁড়ির হাল করে বেড়িয়ে লাভটা কি হচ্ছে তোর?
নেড়ুর বহু অবস্থার ছাপ পড়া কাঠ-কাঠ মুখটায় হঠাৎ একটা বিদ্যুৎব্দীপ্তি খেলে যায়। বিদ্যুৎ উদ্ভাসিত মুখে উত্তর দেয় নেড়ু, লাভ? সে তোদের সংসারের কড়াক্রান্তির হিসেবে অবশ্য পড়বে না সত্য, সেটাকে বলতে পারিস অদৃশ্য বস্তু। তবে হয়েছে বৈকি লাভ। ভগবানের রাজ্যে এই পৃথিবীটা যে কেমন তার কিছুটা আস্বাদ লাভ হয়েছে।
সত্য কি নেড়ুর এই উত্তরে চমকে ওঠে? সত্যর মুখটা কি হঠাৎ ছাইয়ের মত সাদাটে দেখায়? সহসা কি একটা বিরাট লোকসানের খবর দিয়ে গেল কেউ সত্যকে? সত্যর মুখে তাই দিশেহারা উদ্ভ্রান্তির ছায়া।
সত্যর তাই কথা বলতে মুহূর্ত কয়েক দেরি হয়। বুঝি বড় একটা নিঃশ্বাস চাপে সত্য।
পরে বলে, পায়ে হেঁটে পৃথিবীর কতটা দেখবি শুনি?
নেড়ু দু’হাত উল্টে বিশেষ একটা ভঙ্গী করে বলে, নাও ঠ্যালা! পৃথিবীর সব মাটি মাড়িয়ে মাড়িয়ে কি আর পৃথিবীটা দেখবার বায়না করেছি!…. আসল কথা চেনা-জানা সংসারের চৌহদ্দিটার বাইরে পা বাড়াতে পারলেই আর এক জগৎ, বুঝলি? তার মজাই আলাদা। সত্যি বটে তোরা সংসারী লোকেরা বলবি হাঁড়ির হাল, কিন্তু আমি বাবা বলবো তোফায় কাটাচ্ছি। ভোজনং যত্র তত্র, শয়নং হট্ট মন্দিরে, এ কি সোজা মজা? কোনদিন আহার জুটছে, কোনদিন জুটছে না, কোনদিন মাথার উপর আচ্ছাদন আছে, কোনদিন গাছতলা সার!…. কখনো কারো কাছে এক ঘটি জল চাইলে সব ব্যাজার মুখ করে, কখনো কেউ মুখের চেহারাটা দেখেই ক্ষুধার্ত ব্রাহ্মণ বলে অনুরোধ উপরোধ করে ডেকে নিয়ে গিয়ে তোয়াজ করে খাওয়া। কত লীলাখেলা পৃথিবীর! কত ঢঙের মানুষ, কত সঙের বাজার!
সত্য যেন হাঁ করে শুনতে থাকে নেড়ুর এই অভিনব অভিজ্ঞতার গল্প।…আশ্চর্য! আশ্চর্য! সেই তার চিরকূপার পাত্র বোকা নেড়ুটা হঠাৎ যেন সত্যর নাগালের বাইরে চলে গেছে।
সন্তর্পণে একটা নিঃশ্বাস ফেলে সত্য। আস্তে আস্তে বলে, খুব ভাল লাগে, নারে নেড়ু?
নেড়ু তার রুক্ষ চুলগুলো মুঠোয় চেপে ধরে চাপতে চাপতে বলে, ভাল লাগা মন্দ লাগা বুঝি না সত্য, একটা অন্যরকম জীবন, এই আর কি। কুমোরের চাকে গড়া হাঁড়ি-কলসীর মত এক ছাঁচের না হয়ে, নিজের হাতে গড়া যা তোক একটা গড়ন পাওয়া, এই হচ্ছে কথা। তোরা বলবি, বাউণ্ডুলে লক্ষ্মীছাড়া ভবঘুরে! বলবি আহা কী কষ্ট! আমি মনে মনে হাসবো। ভাববো ওই বাউণ্ডুলে লক্ষ্মীছাড়া ভবঘুরে হয়ে দ্যাখো, বুঝবে তার রহস্য রস।
সত্য আর একবার ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে, বলছিস তো খুব! বলি মেয়েমানুষে পারবে তোর মতন ভবঘুরে হতে? ব্যাটাছেলে হয়ে জন্মেছিস, তাই যা খুশি করবার সুখ পেয়েছিস। বাবাও তো বাড়ি ছাড়া হয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন
নেড়ু আঙুল তুলে বলে, ওই তো, ওই কথাই তো বলছি– গিয়েছিলেন তাই একটা মানুষের মত মানুষ হতে পেরেছেন। গায়ে পড়ে থাকলে আমার বাবাটির মতন হতেন।
এই নেড়ু, পিতৃনিন্দে করছিস?
নিন্দে-ফিলে বুঝি নে সত্য, আমার হচ্ছে হক কথা! যাক তুই কেমন আছিস বল?
সত্য ঈষৎ উদাস গলায় বলে, আমার কথা ছেড়ে দে। মেয়েমানুষ হয়ে জন্মেছি
নেড়ু বলে ওঠে, এই সেরেছে, তুইও যে দেখছি আক্ষেপ করতে শিখেছিস! আগে তো এমন ছিলি না! মেয়েমানুষ মানুষ নয়’ একথা বললেই তো রেগে যেতিস
সত্য তেমনি গলায় বলে, সে এখনো যাব। তবে তোকে দেখে যেন আক্ষেপটার সৃষ্টি হচ্ছে ভাই! কোথায় ছিলি তুই, কী বা ছিলি! মিথ্যে বলব না, তোকে মাথামোটা ভেবে একটু কৃপার চক্ষেই দেখতাম, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তোর মাথাটাই সব চেয়ে সরু। তাই তোকে ভক্তি ছেদার চোখে দেখছি।.. যাক বেশী বলব না, অহঙ্কার হবে। তবে এটা ঠিক, ভগবান যদি আমার মেয়েমানুষ না গড়ে বেটাছেলে করে তৈরি করতেন, তোর মতন ঘরই ছাড়তাম। যাক হই নি যখন, ভগবানের ভুলের খেসারত দিই বসে বসে। সে তো হল, কিন্তু তুই কিভাবে আমার বাড়ির খোঁজ পেলি বল দিকি?
হা, সেটাই কথা।
ঘরপালানে ছেলেটা এতদিন পরে হঠাৎ সত্যর বাড়ি এসে হাজির হয় কী করে?
তা হল প্রায় দৈবের আনুকূল্যেই।
উত্তর প্রত্যুত্তরের মধ্য দিয়ে যা বোঝা গেল তা হচ্ছে এই, ঘুরতে ঘুরতে কলকাতায় এসেছে নেড়ু কিছুদিন হল। আর ওই ঘোরার সূত্রেই কালীতলায় এসে বসেছিল আজ সকালে, দৈবক্রমে সত্য গিয়েছিল সেই ঠাকুরতলায় পূজো দিতে।
যায় এমন সত্য।
বারব্রত থাকলেই যায়।
আজ অষ্টমীর উপোস ছিল, গিয়েছিল। নেড়ু দেখতে পায়। কিন্তু পথের মাঝখানে বা মন্দিরের চাতালে তো একটা বৌমানুষকে ডেকে কথা কওয়া যায় না, তাই নেড়ু একটু দূরে দূরে থেকে সত্যর সঙ্গে সঙ্গে এসে বাড়িটা বুঝে নিয়েছিল। সত্যর সঙ্গে পাড়ার একটি গিন্নী ছিলেন। তিনি বিদায় নিতেই নেড়ু এগিয়ে গিয়েছিল এবং মহোৎসাহে কড়ানাড়া দিয়েছিল।
