তাতেই প্রশ্ন।
নবকুমার অতঃপর তড়বড় করে মুখুয্যে মশাইয়ের সংসারের হাঁড়ির হালের বর্ণনা করে কথা সমাপ্ত করেছিল একটি বিবেচনার কথা বলে।
এমন অবস্থায় দিদিকে না পাঠানো আমাদের পক্ষে গর্হিত হবে না? মনে হবে না বড় যেন স্বার্থপরের মত আটকে রেখেছি দিদিকে
সত্য শান্তভাবে উত্তর দিয়েছিল, আটকে রাখার কথা উঠছেই বা কেন? ওখানে যাবার জন্যেই তো কলকাতায় এসেছেন ঠাকুরঝি।
ওখানে যাবার জন্যে!
নবকুমার হতবাক হয়ে গিয়েছিল। সত্যর অকৃতজ্ঞতাকে ছি ছি করে ধিক্কার দিয়েছিল। ভেবেছিল, আর এই আঁতুড় তোলা, মুখে রক্ত তুলে সংসারের যাবতীয় খাটুনি খাটা এসব কিছু না? দিদি আগে থেকে জানত মুখুয্যে মশাইয়ের সঙ্গে দেখা হবে? তিনি অত খোশামোদ করবেন ওকে?
কিন্তু মনের মধ্যে ঠেলাঠেলি করে ওঠা এইসব কথাগুলো বলে উঠতে পারে নি নবকুমার। বলেছিল, বেশ, তবে তাই বলে দিই গে। জানি তোমার একটু কষ্ট হবে
আমার কষ্ট!
সত্য বলেছিল, আমার যে কিসে কষ্ট হয় আর না হয়, সে বোধ যদি তোমার থাকত! যাক গে, যেতে দাও ওসব কথা, মুখুয্যে মশাইকে বলে দাও একটা ভাল দিন দেখতে।
৪৪. জগন্নাথের রথের চাকা
জগন্নাথের রথের চাকা গড়গড়িয়ে এগিয়ে চলে, কখনো বালির গাদায় বসে যায়। বসে যাওয়া রথের রশিতে টান দিতে এগিয়ে আসে লক্ষ মানুষের হাত। শ্রেণীহীন নির্বিচার।
মানুষের হাতে জগন্নাথের মুক্তি।
রূপকের রূপে দেবতার রূপ।
জগন্নাথের রথ যুগের প্রতীক। যুগের চাকার গতিও কখনো উদ্দাম, কখনো মন্থর। সেই মন্থরতার মুক্তিও মানুষের হাতে। জনগণের জাগরণে যুগের জাগরণ।
তবু বলতেই হবে যুগের দেবতা একটু শহর-ঘেঁষা। শহর দ্রুত ছন্দে আবর্তিত হয়, গ্রাম ছায়াচ্ছন্ন উঠোনে পড়ে ঘুমোয়। “শহুরে হাওয়া” যখন তার কাছে এসে পৌঁছয় তখন শহর থেকে হাওয়াকে ত্যাগ করে আর এক নতুন হাওয়ার পিছনে ছুটছে।
কিন্তু শহর আর মফঃস্বল কি কেবলমাত্র মানচিত্রের বর্গমাইলের ওপর নির্ভরশীল? একই ঘরের মধ্যে বাসা করে না কি শহর আর মফঃস্বল? জাগন্ত আর ঘুমন্ত? মানুষে মানুষের মনের গড়নে কি পার্থক্য নেই?
তা মনের গড়নেরও শহর মফঃস্বল আছে বৈকি। নইলে যুগচক্রের আবর্তনে সত্যবতী কেন এমন অধীর হয়, চঞ্চল হয়, আন্দোলিত হয়, আর নবকুমার কেন সে আবর্তন টেরও পায় না?
সত্যবতী তো ঘরে থাকে।
নবকুমার তো বাইরে ঘোরে।
নবকুমার বাইরে ঘোরে। অর্থাৎ নবকুমার বাজারে যায়, মুদির দোকানে যায়, নিতাইয়ের বাসায় তাস খেলতে যায়, সদুর বাড়িতে তত্ত্বতল্লাস করতে যায়। এই বহির্জগৎ নবকুমারের।
কিন্তু সত্যবতীই বা এমন কি করে?
সত্যবতীও তো কুটনো কোটে, বাটনা বাটে, রান্না করে, বড়ি দেয়, মুড়ি ভাজে, আচার বানায়। শুধু অবসরকালে বই পড়ে সত্যবতী। পড়ে পত্র-পত্রিকা।
এইটুকু জানলা।
খোলা জানলা।
এই জানলাখানি সত্যকে বহির্জগতের বার্তা বয়ে এনে দেয়।
এই জানলাখানি খোলা রাখার সহায় ছোট ছেলে সরল। মায়ের সঙ্গে তার যত গল্প যত কথা। আর বই যোগাড়ের ব্যাপারে উৎসাহ ষোল আনা। নবকুমার এ খবর রাখে না।
নবকুমার এক-একদিন তাসের আড্ডায় শোনা গল্প এনে উত্তেজিত ধিক্কার তোলে, শুনেছ কেলেঙ্কারি? মেয়েমানুষ বিলেত যাচ্ছে! কিনা এম.এ., বি.এ. পাশ করতে! বিদ্যের পাহাড়ের চূড়োয় ওঠা চাই!…. কালে কালে কতই হবে!….. শুনেছ কাণ্ড, পিরিলি বাড়ির কোন্ বৌ নাকি
সত্য বলে ওঠে, থাম, চুপ কর।
নবকুমার বিচলিত স্বরে বলে, বাবাঃ। বুড়ো হয়ে গেলাম, জীবনে কখনো মন খুলে দুটো গল্প করতে পেলাম না!
সত্য বলে, কেন, কর না গল্প! তোমার নাগালের উপযুক্ত গল্প কর! বাজারের দরদামের গল্প আছে, কায়েত-ঠাকুরপোর বৌ কী খাওয়াল তার গল্প আছে, আপিসের বড়বাবুর গল্প আছে….
নবকুমার কুদ্ধগলায় বলে, কেন, দেশের দশের কথা বলা বুঝি আমার বারণ?
বারণ নয়। বারণ কেন হবে? নিজে জেনে বুঝে কথা কও, তার মানে আছে, তুমি যে পরের মুখে ঝাল খাও!
নবকুমার এবার অভিমানে ভারী হয়, আমার জেনেও দরকার নেই, বুঝেও দরকার নেই। তুমি আর তোমার বিদ্বান ছেলেরা কথা কও গে।…. আয় সুবর্ণ, আমরা গল্প করি।
সুবর্ণ? হ্যাঁ, সুবর্ণ!
সোনার পুতুলের মত মেয়েটাকে সুবর্ণলতা নামই তো মানায়। বছর চারেকের হয়ে উঠেছে মেয়েটা, বাপের ভারী সুয়ো হয়ে উঠেছে।
কথা কয় যেন পাখীর মত।
হাঁড়ি-কুড়ি নিয়ে রাধাবাড়া খেলতে শিখেছে ইতিমধ্যে। বলে, এস বাবা, ভাত খাও। বলে, মার মতন রান্না করতে পারি আমি। পারি না বাবা?
নবকুমার সত্যকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে, তা পেরো মা! কিন্তু মার মতন রাগী হয়ো না যেন!
এইভাবেই চলছিল দিন, কিছুটা মন্থর ছন্দে।
সেই মন্থরতার মাঝখানে হঠাৎ একটা আলোড়ন এল একদিন। সে আলোড়ন এল সত্যর ঘর পালানে বন্ধু নেড়ুর মূর্তি ধরে! তা নেড়ু তার বন্ধুই, দাদা আর বলেছে কবে তাকে সত্য? ছ মাসের নাকি বড় নেড়ু সত্যর থেকে। সে কথা মানে না সত্য। এখনও মানে না।
রুদ্ধকণ্ঠে শুধু বলে উঠল, নেড়ু, তুই?
নেড়ু হেসে উঠে বললো, বিশ্বাস হচ্ছে না? নেড়ুর ভূত মনে হচ্ছে? তা সন্দেহ মোচন করতে চিমটি কেটে দ্যাখ।
তা ভূত বললে অন্যায় হয় না– সত্যর রুদ্ধ কণ্ঠে এবার উচ্ছাস আসে, রংটা অন্তত ভূতের মত করে তুলেছিস বাবা। তাঁরে নেড়ু, তোর সেই বেলেপানার মত রংটা কী করলি রে?
