সদুর যে রূপ আছে স্বাস্থ্য আছে, সে কথা সদু কারো মুখে কোনদিন শোনে নি।
তারপর গঙ্গায় কত জল বয়ে গেল, কত দিন রাত্রি মাস বছর পার হয়ে গেল, সদুর যৌবন নামক বস্তুটা কোন খবর না দিয়েই বিদায় নিল, তবু মাজা মাজা গড়নের দেহটা সদুর তেমন ভাঙে নি। এখন এক লালসাতুর লুব্ধ প্রৌঢ়ের দৃষ্টি পড়েছে সেদিকে।
এ দৃষ্টি স্বামীর দৃষ্টি নয়, পরপুরুষের দৃষ্টি। পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা, পরস্ত্রীর মতই দেখছে আজ মুখুয্যে তার যৌবনে বিতাড়িতা স্ত্রীকে।
তবু বিহ্বল হচ্ছে সৌদামিনী।
জীবনে একবারও বিহ্বলতার স্বাদ উপভোগ করতেই হতো।
কিন্তু নিজের বাড়িতে নিয়ে যেতে না পারলে জুৎ কোথায় সদুর বরের? সন্ধ্যাবেলা নবীন নায়কের ভঙ্গী নিয়ে এসে বসে গল্পগুজব কিছুদিন বেশ ভাল লাগছিল, এখন আর শুধু তাতে মন উঠছে না। তা ছাড়া ছোটবৌটার সত্যিই বুঝি মরণদশা ঘনিয়ে এসেছে।
সময় অসময়ে বড় মেয়েটা শ্বশুরবাড়ি থেকে এসে ভাত-জল করত, কিন্তু সেও এখন আসন্নপ্রসবা। মেজটা তো এই বয়সেই মা-ষষ্ঠীর বরপুত্রী। তাদের এনে লাভ নেই।
তাই সদুর কাছে অনুনয়-বিনয় চলে। স
দু কিন্তু সহজে হ্যাঁ করে না।
বলে, কেন, এই তো বেশ। আসছ, বসছ, চোখের দেখা দেখছি—
মুখুয্যে চোখ টিপে বলে, শুধু চোখের দেখাতে কি পেট ভরে গো?
আর পেট ভরায় কাজ নেই।
তুমি তো বললে কাজ নেই। আমি যে এদিকে বছরভর উপোসী! তা ছাড়া মাইরী বলছি বিশ্বাস কর, মাসের মধ্যে পাঁচদিন সত্যি পেটের উপোসে কাটে। লক্ষ্মীছাড়া মেয়েমানুষটা একবার যদি পারছি না বলে শুলো তো কার সাধ্যি ওঠায়। বাজার থেকে মুড়ি চিড়ে এনে ওর রাবণের পুরীর পেট ভরাতে হয়।
সদু ভুরু কুঁচকে বলে, আর নিজে?
নিজে? নিজের ওই বামুনের হোটেল আছে একটা পাড়ায়, সেই গতি। নগদ চার গণ্ডা পয়সা ফেলে–
সদুর মনটা কি দুলে ওঠে?
মনে হয় কি, চিরজীবনই তো ভাতের হাঁড়ি নাড়লাম, কিন্তু সার্থকের ভাত রাঁধলাম কই? ভাত বেড়ে স্বামী-পুত্রের পাতের সামনে ধরে দিতে পেলাম কবে?
স্বামী-পুত্রের কোলে ভাতের থালা এগিয়ে দিতে না পারলে আর
পুত্র? ও বাড়িতে যারা আছে তারা কি সদুর পুত্র?
তা একরকম পুত্ৰই বৈকি। স্বামীরই সন্তান তো। ব্রতকথায় আছে- জ্ঞাতির ভাত হোক, সতীনের পুত হোক।
মরলে সতীনের ছেলেও মুখে আগুন দেয়, গলায় “কাচা” নেয়। হ্যাঁ, এইসব চিন্তা সদুর মাথার মধ্যে পাক দেয়, তবু সদু সহজে মুখে হারে না। বলে, আমি এখন নবুর সংসার ভাসিয়ে দিয়ে কোন্ মুখে
আহা-হা, ওর সংসার আবার ভাসাবে কী দুঃখে? ওর কাণ্ডারী খুব ওস্তাদ। এ নেহাৎ তুমি আছ তাই ঘোড়া দেখে খোঁড়া হয়ে বসে আছে। তুমি চলে গেলে ঠিক সবই পারবে।
তা সদু সে কথা বোঝে।
বোঝে বৌয়ের এই চুপচাপ বসে থাকা যতটা শরীরের দুর্বলতার জন্য, তার থেকে বেশী মনের অবসন্নতা। সেই হতচ্ছাড়া ছুঁড়িটা যেন প্রাণের পুতুল ছিল ওর। সেটা গেছে। তা ছাড়া নবু কড়া দিব্যি দেওয়ায় সেখানে যেতে আসতেও পারছে না। যত শক্ত মেয়েমানুষই হোক, স্বামীর “মরা মুখ দেখার” দিব্যিটা তো আর ফেলতে পারে না?
অমন যে একট সোনার পুতুল মেয়ে হয়েছে, তাও যেন সাজাতে গোছাতে গা নেই। সদু চলে গেলে ঘাড়ে পড়লে আবার সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু সদু?
বড় লজ্জা! বড় লজ্জা!
নিজের কোটে বসে তামাক সেজে দেওয়া, পায়ে হাত বুলিয়ে দেওয়া এক, আর কেন্দ্রচ্যুত হয়ে সেই অজানা রাজ্যে গিয়ে পড়া আর এক। কেমন সেই সতীন, কেমন সেই ছেলেপুলে কে জানে!
তারা যদি সদুকে সহ্য করতে না পারে? আবার যদি স্বামীর ঘরে গিয়ে লাঞ্ছনা অপমান জোটে?
সেদিন কথার পিঠে এ সন্দেহ প্রকাশ করে সৌদামিনী, কিন্তু মুখুয্যের এক ফুয়ে উড়ে যায় সে দুশ্চিন্তা।
তিনি প্রবলস্বরে আশ্বাস দেন, ছেলেমেয়ে? তারাই তো রোজ আমায় খেয়ে ফেলছে, বাবা বড়মাকে আনন, বড়মাকে আনো বলে। আর তোমার সতীন? হুঁ, রাতদিন তো নিজের মরণ ডাকছে। বলে, আনো একবার তোমার প্রথম পক্ষকে, তার পায়ের ধুলোটা নিয়ে আর এই হতভাগাগুলোকে তার হাতে তুলে দিয়ে মরে বাঁচি।
কেন কে জানে, সদুর চোখে হঠাৎ জল আসে। সে জল মুছে সদু রুদ্ধস্বরে বলে, তোমরা পুরুষজাত বড় নিষ্ঠুর! এতদিন ঘর করছ, প্রাণে একটু মায়া নেই?
কি মুশকিল! মায়া কি করছি না? না করি নি? এ যাবৎ কে তার এগারোটা আঁতুড় তুলল, কে তার তাওত করল? ওকে ঘরে আনার সময় থেকেই তো যে যার ভেন্ন। মা ছোটছেলের সংসারে থেকেছে, তার পর মরেছে। আমি চিরদুঃখী। নইলে বিয়ে করা পরিবার তুমি, তবু তোমার ওপর জোর খাটাতে পারি না, ভিখিরির মতন দয়া ভিক্ষে করি!
থাক থাক, আর আমার পাপ বাড়াতে হবে না। সদু বলে, সতীন না হয় মরে বাঁচতে চায়, কিন্তু ছেলেপেলে সৎমাকে চায় কেন?
কেন আর? বুঝছ না মুখুয্যে কণ্ঠস্বর করুণ করেন, একটু মাতৃস্নেহের আশায়। সময়ে দুটো ভাতজলের আশায়।
তিল তিল জলে পাথর ক্ষয় হয়। আর এ তো আপনা থেকেই গলে থাকা বেলেমাটি। অবশেষে একদিন সদু মাথাটা নীচু করে ধরাগলায় বলে, বেশ, বল নবুকে। আমি নিজমুখে বলতে পারব না।
তা নবুরও বলতে বেধেছিল সত্যর কাছে। কোনরকমে থতমত খেয়ে বলে ফেলেছিল, মুখুয্যে মশাই তো আমায় খেয়ে ফেলছেন!
সত্য চোখ তুলে তাকিয়েছিল শুধু।
