মুখুয্যে মশাই এখন নবকুমারের সংসারের প্রায় প্রতিদিনের অতিথি। বেশীর ভাগ সন্ধ্যার দিকটিতেই আসেন, সদুর যখন সাংসারিক কাজগুলো হালকা হয়ে আসে। হ্যাঁ, সত্যবতীর সংসারের কাজই স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে সদু, হয়তো বা ভগ্নশরীর সত্যর প্রতি মমতাবশে, হয়তো বা নিজস্ব অভ্যাসবশে, আর নয়তো বা এ সংসারে নিজের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট প্রত্যক্ষ রাখবার বাসনায়। হয়তো মনে করে নবকুমার যেন না ভাবে “আর কেন”। সত্যকে কুটোটি ভাঙতে দিলে নবকুমারের সদুর সম্পর্কে সহজে আস্থা আসবে না।
তা মনের কথা মনই জানে। মোটের উপর সদু কলকাতাতেই রয়ে গেছে এখনো এবং এ সংসারে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সব করছে। তবু সন্ধ্যের দিকে বসে থাকবার সময় পায় সদু। একে তো এখানের এই শহুরে সংসারের কাজ তার কাছে তৃণসম, তা ছাড়া প্রবল এক উৎসাহে। রাত্রের রান্নাটা সে বিকেলেই সেরে ফেলে।
সন্ধ্যার দিকে মুখুয্যে মশাই আসেন।
সদু মনে নবোঢ়ার লজ্জা আর মুখে নবোঢ়ার আভা নিয়ে ভাইপোদের চোখ বাঁচিয়ে তামাকে ফুঁ দিতে দিতে এসে কাছে দাঁড়ায়।
এ ঘরটা সেই কোণের দিকে ছোট্ট ঘরটা, যে ঘরে সুহাস থাকত। সুহাস তার সমস্ত ব্যবহারের জিনিসগুলি ফেলে চলে গেছে। সুহাসের স্মৃতি আঁকড়ে সে ঘর তার মত করে সাজিয়ে রেখে দেবে, এত ভাবপ্রবণতা এ সংসারের নতুন ব্যবস্থাপনায় নেই। সত্য তো ঢোকেই না এ ঘরে।
সদু এ ঘরটায় রাজ্যের আজেবাজে জিনিস এনে ঠেলে রেখেছিল, শুধু সুহাসের শোবার চৌকিটায় একটা সভ্যভব্য শতরঞ্জি বিছানো আছে। আছে তাকিয়া।
মুখুয্যে মশাই প্রায় যেন চুপিচুপিই এসে সেই তাকিয়ায় কনুই ঠেসিয়ে সেই চৌকিটিতে বসেন, সদু তামাক এনে হাতে দেয়।
মুখুয্যে মশাই একটু রহস্যঘন হাসি হেসে কলকে ধরা হাতটাও কাছে টেনে বলেন, এখনও তোমার কনে-বৌয়ের লজ্জা গেল না। বসো না এখানে।
বলা বাহুল্য এখান’টা সেই স্বল্পপরিসর চৌকির সামান্যতম ফালিটুকু। ভারী মুখুয্যে মশাই তো প্রায় বাকী সব জায়গাটাই দখল করে আসছেন। অতএব বসতে গেলে নিতান্ত ঘনিষ্ঠ হওয়া ছাড়া উপায় নেই।
তবে সদু পতিদেবতার এ অনুরোধটুকু রাখে না। নাঃ, এই বেশ বসছি! বলে মাটিতেই বসে চৌকির সামনে।
খুব কি গল্প করে সদু তার এতদিনের ফিরে পাওয়া বরের সঙ্গে?
নাঃ, তা করে না।
কথা কোথায়?
কথার বয়সই বা কোথায়?
অনেকক্ষণ ভুড়ভুড় করে তামাক টানতে থাকেন মুখুয্যে মশাই, তারপর এক সময় হয়তো বললেন, তারপর গরীবখানায় কবে যাচ্ছে বড়বৌ?
সদু এতক্ষণে বসে বসে হাতের নখ খুঁটছিল কি আঁচলের খুঁটটা আঙুলে জড়াচ্ছিল, এ প্রশ্নে সচকিত হয়ে নড়েচড়ে বসে বলে, এখন আর ছেড়ে দিয়ে তেড়ে ধরে কি হবে? জীবনটা তো বয়েই গেল!
মুখুয্যে মশাই নিটোল বপুটি দুলিয়ে বেশ একটু হেসে নিয়ে বলেন, ও কথা শুনছে কে গো বড়গিন্নী? গড়নে পেটনে এখনও তো ছুকরিটি আছ। বরং আমার বাড়ির ওটি একেবারে বুড়ীর বুড়ী তস্য বুড়ী হয়ে গেছে। মাথার সামনে কপালজোড়া টাক, দাঁতগুলো ঝুলে নড়বড় করছে, হাতে পায়ে হাজা, আর গড়ন? সে আর কী বলব তোমায়– বিশ্রী একটা মুখভঙ্গী করে কথাটা শেষ করেন মুখুয্যে মশাই, তাকাতে ঘেন্না করে। আমি তাই এখনো ঘরে রেখেছি, অন্য স্বামী হলে টান মেরে বাপের বাড়িতে ফেলে দিয়ে আসত।
সদু অবশ্য সতীনের সম্পর্কে স্বামীর এই অরুচিকর মন্তব্যে পুলকিত হয় না বরং বেজার ভাব দেখিয়ে বলে, তা তো বলবেই এখন। তার শাঁস-মাস সব খেয়ে ছোবড়াটাকে টান মেরে ফেলে দেবার কথা তোমার মুখেই শোভা পায়। সাধে কি আর বলেছে পুরুষ প্রজাপতির জাত।
মুখুয্যে এ অপবাদে লজ্জিত হন না। বরং ফ্যা ফ্যা করে হেসে বলেন, তা সে দোষ তবে বিধাতার। তিনি যে জাতকে যেমন করে গড়েছেন। কিন্তু যাই বল বড়বৌ, আমিও তো এতগুলো ছেলেপুলের বাপ হয়েছি, তারপর তোমার গিয়ে দু-দুটো মেয়ের বে দিলাম, নাতির অন্নপ্রাশনে ঘটা করলাম, এ সংসারের যাবতীয় করণ-কারণ করে চলেছি, আর ওই শূয়োরের পাল পুষছি। টসকেছি একটু? রূপ-যৌবন রাখতে জানা চাই, বুঝলে বড়বৌ?
বলেই হাতটা বাড়িয়ে সদুর গালে একটি টোকা মেরে বললেন, তা তোমাকে সে কথা শোনানো চলে না। তুমিও জান নচেৎ তুমিও কিছু এযাবৎ মামার সংসারে সোনার খাটে গা রূপোর খাটে পা দিয়ে বসে থাক নি! দাসীবিত্তি করতে করতে জীবন গেছে, তবু কেমন চেকনাইটি!
সদু কি এই স্তাবকতায় ভুলবে?
সদু কি বলে উঠবে, এই বুড়ো বয়সে তুমি আমার মনের দিকে না তাকিয়ে শরীরের চেনাইয়ের দিকে তাকাচ্ছ? লজ্জা করছে না?
কিন্তু কি করেই বা বলবে?
সদুর এই তুচ্ছ শরীরটার দিকেই বা কে কবে তাকিয়েছে। এই লোকটাই তো মারের চোটে ঘরছাড়া করেছে সদুকে। তখন তো সদুর বয়সকাল, কী অগাধ স্বাস্থ্য, আর রূপটাও ফেলনা ছিল না।
আর কত হাসি-খুশি স্বভাব ছিল।
সদু তখন বুঝত না, হয়তো বা এখনো বোঝে না, সে অগাধ স্বাস্থ্য আর বপুটাই অনিষ্টকারী হয়েছিল সদুর। হাসিটাও। সংসারে তখন মেলাই লোক– দ্যাওর, ভাশুর, বড় বড় ভাগ্নে তাদের চোখের সামনে থেকে সেই স্বাস্থ্য আর লুকিয়ে বেড়াবার কথা মাথায় আসত না সদুর। তাই সদুর দুর্দান্ত বরের মাথায় রক্ত টগবগ করে ফুটত।
অতএব রাতদিন যে দেহটাকে হাতের মুঠোয় পিষতে ইচ্ছে করত ডাকাতটার, সেই দেহটাকে সে ফুটবলের মত লাথিয়ে লাথিয়ে ঘরের বার করে দিত।
