সত্য হঠাৎ গাঢ়স্বরে বলে, পাগলামি কেন বলছেন মাস্টার মশাই, এর থেকে ভাল আশ্রয় ও আর কোথায় পাবে? ওর জন্মের বিত্তান্ত শুনেও কে ওকে ছেদ্দা করবে, স্নেহমমতা করবে?
ভবতোষ আরও ব্যাকুল হয়ে বলেন, সে সব তো বুঝলাম, ওই জন্যেই পাত্র যোগাড় করে উঠতেও পারছি না। অথচ তুমি বলেছ সব কথা খুলে বলতে। কিন্তু একটা কথা তুমি বুঝছ না
ভবতোষ থামেন।
সত্য শান্তস্বরে বলে, বলুন?
বলছি– ভবতোষ কেসে বললেন, আমার জন্যে ভাবি না, আমার তিনকুলে কে বা আছে, ওর জন্যেই বলছি-যতই আমি তিনকেলে বুড়ো হই, লোকনিন্দের তো কসুর হবে না তাতে! আমার বাসায় কী পরিচয়ে রাখবো ওকে?
সত্য একটু হেসে বলে, দাসী পরিচয়েই রাখুন।
তুমি বোধ করি আমায় নিয়ে মজা দেখছ বৌমা! ভবতোষের আক্ষেপটা যেন আছড়ে পড়ে।
আঁতুড়ের দরজায় এই দীর্ঘস্থায়ী দৃশ্য।
সদু গালে হাত দিয়ে দালানে বসে, আর নবকুমার খাঁচার বাঘের মত ছটফট করছে। আর ধৈর্য থাকে না। নবকুমার এগিয়ে এসে বলে, মাস্টার মশাই, বাইরে কি আপনার গাড়ি অপেক্ষা করছে? না একখানা ডাকতে পাঠাব?
ভবতোষ বিমূঢ় দৃষ্টি মেলে তার একদা ভক্ত শিষ্যের মুখের দিকে তাকান, এবং সেই মুহূর্তে শুনতে পান সত্যবতীর ক্ষীণ কিন্তু স্পষ্ট স্বর আদেশের সুরে উচ্চারিত হল, থাক, গাড়ির জন্যে কারুর ব্যস্ত থাকতে হবে না মাস্টার মশাইয়ের সঙ্গে আমার এখনো দুটো দরকারী কথা আছে, আর সকলের একটু ওদিকে গেলে ভাল হয়।
আর সকলের ওদিকে গেলে ভাল হয়!
এর চাইতে সত্য কেন একখানা থান ইট মারল না নবকুমারের মাথায়? কিন্তু উপায় নেই। ডাক্তার বলে গেছে রুগীর বুক হালকা, রাগ দুঃখ কোন কিছুতেই যেন বেশী উত্তেজিত না হয়।
কাজে কাজেই মনের রাগ মনে চাপা।
হ্যাঁ, ডাক্তার ডাকতে হয়েছিল, আঁতুড়ঘরে ডাক্তার আসা সদু নবকুমার সকলের জ্ঞানেই এই প্রথম। তা উপায় কি? সদুই জোর করে আনিয়েছিল। বলেছিল, যে কালের যে শাস্ত্রর। তুই আর ইতস্তত করিস নে নবু। কলকেতায় যখন বাসা করে আছিস, কলকেতার মতই হোক। বারুইপুরের সেই গর্তয় গিয়ে পড়লে তো মরেই যেত, এ যদি–
তা সেই ডাক্তারের নির্দেশেই স্নান মাথাঘষা বন্ধ, কাজেই একুশে ষষ্ঠীও মুলতুবী। একুশ দিনের আঁতুড় একত্রিশ দিনে গিয়ে ঠেকেছে।
তা ছাড়া মুশকিলই কি কম?
বাড়ির লোকের সেবা-যত্নটা তো পাচ্ছে না! সেবা বলতে সেই হাঁড়ি দাই মাতঙ্গিনী। সেরে উঠবে কি করে?
অথচ আঁতুড়ের দরজাতেই এই সব কাণ্ড।
চলে যেতে হবে! ও! বলে দুমদুম্ করে চলে যায় নবকুমার।
ভবতোষ অপ্রতিভের একশেষ হয়ে বলেন, আমি যাই বৌমা!
না।
সত্য দৃঢ়স্বরে বলে, কথা তো শেষ হয় নি। আপনি বললেন, আমি আপনাকে নিয়ে মজা দেখছি, এই কি একটা কথা?
কি করব বৌমা, দিশেহারা হয়ে যাচ্ছি বলেই–
কেন হবেন? সত্য স্থির স্বরে বলে, দিশে তো সামনেই রয়েছে। আপনি সেদিন ঠাট্টা করে বলেছিলেন, সুন্দরী নাতনীর জন্যে যদি আপনার মাথায় টোপর দিতে হয় তো দেবেন। সেই ঠাট্টাটাই সত্যি করে তুলুন।
বৌমা!
অস্থির হবেন না মাস্টারমশাই, আমি বলছি এই ভাল হবে।
এই ভাল হবে!
হ্যাঁ। আপনি আর দ্বিধা করবেন না। বিনা পরিচয়ে একটা মেয়েছেলের থাকায় নিন্দে, আপনিই পরিচয় দিয়ে দিন ওকে। পরিচয়ের মত পরিচয়।
তুমি কি আমাকে আমার চিরদিনের অপরাধের শাস্তি দিতে চাও বৌমা?
ভবতোষের কণ্ঠে দৈন্যের সঙ্গে একটা জ্বালা ফুটে ওঠে বুঝি।
কিন্তু সত্যবতীর কণ্ঠে ফুটে ওঠে স্নিগ্ধ স্নেহের করুণা।
ছি ছি, ওকথা বলছেন কেন মাস্টার মশাই! বরং বলুন এ আমার এতকালের শিক্ষা-দীক্ষার গুরুদক্ষিণা। লেখাপড়া জানা বুদ্ধিমতী মেয়েরা আপনার প্রিয়, এ আমার জানা, সুহাস আপনার অপছন্দের হবে না।
ভবতোষ ক্ষুব্ধ হাস্যে বলেন, পছন্দ জিনিসটা শুধু বেটাছেলের একচেটে নয় বৌমা! সে এই জেঠার বয়সী বুড়োটাকে
তাতে কি?
সত্য সকৌতুক হাস্যে বলে, মহাদেবও তো বুড়ো, তবু তো মেয়েরা তাঁকেই বর চেয়ে বত্ত করে। সুহাস যদি সেকথা না জানত তো আপনার কাছেই ছুটে যেত না।
আস্তে আস্তে কণ্ঠস্বর গাঢ় হয়ে আসে সত্যবতীর, সুহাস আপনাকে ভক্তি করে, জেনে বুঝেই সে আপনার আশ্রয় নিতে গেছে। আপনিই শুধু বুঝতে পারছেন না। মেয়েমানুষ মুখ ফুটে আর কত বলবে?
কিন্তু আমি তো ভেবে কূল পাচ্ছি না বৌমা, হঠাৎ এমন কি নতুন ঘটনা ঘটল যে সে অমন করে ছুটে গিয়ে–
বলব, সব বলব। আজ আর পারছি না।
সত্য একটু ক্লান্ত হাসি হাসে।
তবু ভবতোষ কথা বলেন।
কাতরকণ্ঠে বলেন, এই কি তোমার শেষ রায় বৌমা? এই শাস্তিই মাথায় তুলে নিতে হবে আমাকে?
সত্য আবার একটু কৌতুকের হাসি হাসে, এবার কিন্তু আমি রেগে যাব মাস্টার মশাই! আমার জামাই হওয়া বুঝি আপনার শাস্তি?
ভবতোষ একটুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থেকে বলেন, তবু আমি হয়তো কোনদিনই আমাকে ক্ষমা করতে পারব না বৌমা! মনে হবে
ভুল ভেবে মনে কষ্ট করবেন না। এখন কি মনে হচ্ছে জানেন? মনে হচ্ছে– শেষের কথাটা যেন নিজেকেই নিজে বল সত্য, মনে হচ্ছে, সুহাসকে বুঝি এমন মনের মত গড়তে চেষ্টা করেছি আপনার কথা ভেবেই। শুধু সে কথা নিজেই টের পাই নি এতদিন।
৪৩. পরকীয়া ভাব
একেই বুঝি বলে “পরকীয়া ভাব”।
শোনা যায় ভগবানকে ভজবার এ একটা সহজ রাস্তা। মুখুয্যে মশাই এই পথটাই ধরেছেন। অবশ্য ভগবানের ধার ধারেন না মুখুয্যে মশাই, মানুষ নিয়েই কারবার তার। তবে তাজ্জবের কথা এই, যে মানুষটাকে একদিন ঢিল পাটকেলের মত লাথি মেরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন, এখন তার আশেপাশেই ঘুরঘুর করে বেড়াচ্ছেন।
