ভাইঝি!
সদু বলেছিল, রোস দিকি, আমায় আগে বুঝতে দাও সবটা। এই তো শুনছিলাম বিধবা, আবার তুমি বলছ আইবুড়ো, একবার জন্মের খোটা শোনালে, আবার বলছ ভাইঝি, সব কেমন গোলমেলে ঠেকছে যে!
অচৈতন্য সত্যবতীর কানে বিষের তীর বিধতে থাকে, ভাইঝি আমি বলছি না গো, উনিই ওই পরিচয় রটিয়ে রেখেছেন। যে ভাজ বারো বছরে বিধবা, তার বাইশ বছর বয়সের গর্ভের এই রত্ন! বোঝ! মা কুলে কলঙ্ক ঘটিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল, মামাশ্বশুর- মানে গিয়ে তোমাদের বৌয়ের বাবা, নাকি ঢাকে কাঠি দিয়ে দশজন মান্যিগণ্যি লোককে ডেকে সেই বার্তা বড় গলা করে শোনালেন। আবার ইনি এতকাল পরে সেই আঁস্তাকুণের জঞ্জালকে মাথায় করে এনে ঘরের মধ্যে দেৰীপিতিষ্ঠে করেছেন। কী বলব ভাই, তোমাদের বামুনের ঘরের রীতিনীতি দেখে আমরা হা। বলছিলে বিধবা? বিধবা নয় গো, থুবড়ি, আইবুড়িই। কে ওই জাতজন্মহীন ধ্বজাকে বে করবে যে বে হবে? মা মাগী লোকলজ্জায় আর মেয়ের কাছে ঘেন্না ঢাকতে বলে বেড়াত, পাঁচ বছরে বে, পাঁচ বছরেই বিধবা! ইনিও সেই কথাই চালিয়ে আসছেন। আবার শুনি নাকি বেহ্মবাড়িতে বে দেবে বলে বর খুঁজছে।
সদু কিছুক্ষণ গালে হাত দিয়ে বলে, তা দিতেই পারে। মেয়েদের ইস্কুলে পড়াচ্ছে যখন। বৌয়ের শরীরে অনেক গুণ ছিল, ওই বুকের পাটাতেই সব হরে গেল। অতিরিক্ত তেজ, অতিরিক্ত আস্পদ্দা! নইলে কোন মেয়েমানুষের এ সাহস হয়, নদ্দমার পাক তুলে নিয়ে এসে পুজি করে? শুনে আমি হাঁ হয়ে যাচ্ছি কায়েত বৌ! রেখেছিস রেখেছিস, তার হাতে ভাত জল খাচ্ছিস কোন্ আক্কেলে? নবাটাও তো।
ওনার কথা আর তুলো না ঠাকুরঝি। উনি একেবারে কামরূপ কামিখ্যের ভেড়া। নচেৎ আর এতখানিটা হয়? উনি সুদ্ধু হা সুহাস যো সুহাস! এদিকে তো মুনির মন টলে এমন রূপ! ওই কি ভাল থাকবে নাকি! দেখো কোন্ দিন কি করে বসে। মিথ্যে বলব না ভাই, ওই ভয়ে তোমাদের ভাইকে আমি সাধ্যপক্ষে এ বাড়িতে একা আসতে দিই নে। পুরুষ হচ্ছে মাছির জাত, ফুল থেকে উঠে পাঁচড়ায় গিয়ে বসে। ওই ছুড়ি
সহ্যের সীমা অতিক্রম করলে বুঝি বোবারও বোল ফোটে। তাই “অজ্ঞান অচৈতন্য” সত্যবতীর মুখ থেকে সহসা ক্রুদ্ধ গর্জন বেরিয়ে আসে। যেন মুখ চেপে ধরা কোন ক্রুদ্ধ জন্তুর আর্তনাদ!
এরা চমকে ওঠে।
কি হল বলে আঁতুড়ঘরের ঝিকে ডাক-পাড়াপাড়ি করতে থাকে এবং তার ঘণ্টা কয়েক পরেই সারাবাড়িতে অন্য একটা সোরগোল ওঠে।
প্রশ্ন আর বিস্ময়!
নেই?
কোথায় গেল?
শেষ কখন কে দেখেছে?
কে দেখেছে ঠিক কেউ মনে করতে পারে না। দেখেছিল তো সর্বক্ষণ সবাই, হঠাৎ জলজ্যান্ত একটা মানুষ হাওয়া হয়ে যাবে?
অথচ তাই গেল।
সুহাসকে পাওয়া গেল না।
.
সত্য চোখ বুজলেই যেন সেই কথাগুলো শুনতে পায়। সদু আর ভাবিনীর সেই নিতান্ত সহজ অসতর্ক উক্তি।
তার পর পট পরিবর্তন হয়।
আর এক দৃশ্য চোখে ভাসে।
যা নিয়ে পরে বহু শ্লেষাত্মক কথা শুনতে হয়েছে সত্যকে। কিন্তু নাটকের সেই অঙ্কের উপর তো সত্যর কোনও হাত ছিল না। সেটা শুধু সত্যর চোখের সামনে ঘটেছিল।
আঁতুড়ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন ভবতোষ মাস্টার।
দরজার একটা পাল্লা ধরে ভাঙ্গা গলায় আর্তনাদ করে উঠেছিলেন, বৌমা!
সত্য চমকে তাকিয়েছিল।
অবাক হয়ে চারিদিকে তাকিয়েছিল। এখানে উনি কেন! এ কি অঘটন? এমন উদভ্রান্ত ভাবই বা কেন ওঁর? কী বলছেন এসব?
বুঝতে সময় লেগেছিল।
লাগবারই কথা।
কে ভাবতে পেরেছিল এ বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিতে আর জায়গা পেল না সুহাস, নিতে গেল ভবতোষ মাস্টারের বাড়ি! জীবনে যার বাড়িতে একবার মাত্র গিয়েছে, আর জীবনে যার সঙ্গে একবারও কথা বলে নি!
কিন্তু এবার গিয়ে কথা বলেছে।
অনেকগুলো কথা।
ভবতোষ তেমনি রুদ্ধকণ্ঠে আস্তে আস্তে উচ্চারণ করেন, বলে কিনা–আপনার বাড়িতে একটা ঝিয়েরও তো দরকার হয়। সেই ভাবেই থাকব আমি। সব কাজ করব। আপনি তো উদারধর্মী, আপনার তো আমার হাতে খেতে ঘেন্না করবে না! শোন দিকি কথা–তোমার ওই দেবকন্যার মত মেয়ে, তার হাতে খেতে ঘেন্না করবে!
সেদিন সত্যর বাক্যস্ফূর্তির শক্তি ছিল। সেদিন সত্য আস্তে আস্তে বলেছিল, আপনি তো একথা বলছেন, লোকের যে ঘেন্না করে!
ঘেন্না করে?
করে বৈকি! সত্যবতী বালিশ থেকে ঘাড়টা একটু তুলে ক্ষুব্ধ হেসে বলে, করবে না কেন? আপনি তো ওর সবই জানেন মাস্টার মশাই, বিশ্বসুদ্ধ লোকই ওকে ঘেন্না করবে।
করতে পারে, ভবতোষ আবেগৰুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠেছিলেন, আমি তা হলে তোমার এই বিশ্বসংসারে কেউ নই বৌমা!
সত্য এক লহমা অপলকে ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, জানি। আর সে মুখপুড়ীও এক নিমেষে সে কথা জেনে ফেলেছিল। তাই আগুনের ঝাঁপটা থেকে বাঁচতে ছুটে গিয়েছে আপনার কাছেই শরণ নিতে।
কিন্তু এক্ষেত্রে আমি কী করব? ভবতোষ ব্যাকুল বিব্ৰত বিভ্রান্ত, আমার বাসায় মেয়েছেলে বলতে কেউ নেই।
নাই বা থাকল– সত্য মৃদু হেসেছিল, ও সব চালিয়ে নিতে পারবে।
চালিয়ে নিতে পারবে?
ভবতোষ হতাশ স্বরে বলেন, তুমিও কি তোমার ভাইঝির মত পাগল হয়ে গেলে বৌমা? তাকেও তো কিছুতেই বোঝ মানাতে পারলাম না। গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখে শত সাধ্যসাধনা করলাম, সেই এক কথা, আপনার সব কাজ করে দেব, তার বদলে এক কোণায় একটু থাকতে দিন আর আপনার বইগুলো পড়তে দিন। আর কিছু চাই না আমি। শোন পাগলামি!
