এ কথার মানে নবকুমার বুঝতে পারে নি। চোরের মত মা-বাপের সামনে থেকে পালিয়ে এসেছে।
এলোকেশী উচ্চকণ্ঠে ভগবানকে ডাক দিয়ে আদেশ করেছেন–ভগবান, যে সর্বনাশী আজীবন আমার বুকে কুলকাঠের আংরা জ্বেলে রেখে দগ্ধাল, আর বুড়ো বয়সে এই কোমরের বলটুকু পর্যন্ত কেড়ে নিয়ে মজা দেখতে বসল, তুমি তার বিচার করো। যদি ন্যায়পরায়ণ হও তো সর্বনাশীর যেন তেরাত্তির না পোহায়! তার ভরা ঘরে যেন দোর পড়ে, তার মুখের গেরাস যেন বাসি চুলোর ছাই হয়ে যায়, পরকালে এহকালে যেন তার গতি না হয়!
সত্যবতীর আরো অনেক ভয়াবহ পরিণতির জন্য ন্যায়পরায়ণ ভগবানের কাছে আবেদন জানাতে থাকেন এলোকেশী সুর করে ছন্দে গেঁথে।
না, কথাটাকে মিথ্যা ভাববার হেতু নেই, বাড়াবাড়ি ভাবলেও ভুল ভাবা হবে, সত্যবতীদের আমলে এলোকেশীরা নিতান্তই বিরল ছিল না।
আর আজই কি আছে?
নেই। শুধু হয়তো অভিশাপের বাণীগুলি সভ্য মার্জিত সূক্ষ্ম হয়েছে। তীব্র চিৎকারটা তীক্ষ্ণ মন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
.
সে যাক, সত্যবতীর কানে এসব পৌঁছল না। বিনা নোটিশে হঠাৎ সদূর আবির্ভাব প্রথমটা একটু বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল সে। তার পরই অবশ্য সামলে নিল। হাসিমাখা মুখে বলল, যাক, ভালই হল। সংসারটা একজনের হাতে তুলে দেবার লোক হল। এবার নিশ্চিন্দি হয়ে মরে বাঁচব!
সদু ভুরু কোঁচকাল, কেন, মরার কি হল? রাজ্যিসুদ্ধ মেয়েমানুষ মরছে?
সত্যবতী হাসল, কি জানি, এবার কেবলই মনে হচ্ছে মরে যাব। কালের ঘণ্টা কানে বাজছে যেন।
তা যে ঘণ্টাই কানে বাজুক, মরে অবিশ্যি গেল না সত্যবতী। শুধু দীর্ঘকাল যমে-মানুষে টানাটানি চলল, শুধু সত্যবতীর সংসারে অনেক ওলটপালট কাণ্ড ঘটে গেল, আর সত্যবতীর মনোজগতে অনেক বিপর্যস্ত ধাক্কা মেরে মেরে আরো দৃঢ় করে তুলল সত্যবতীকে।
এরই মাঝখানে সত্যবতীর নবজাত কন্যা কেবলমাত্র কান্নার জগৎ থেকে হাসির জগতের উঁকি দিতে শিখে ফেলল।
সাধন সরল দুই ভাই কাঁচের পুতুরের মত মেয়েটাকে গলার হার করে তুলল, আর নবকুমারের দেখা দিল প্রবল একটি বাৎসল্যরসের ধারা। তবু তার যেন নববধুর লজ্জা!
যদিচ মেয়ে সন্তান কানাকড়ি মাত্র, তথাপি দেখতে ইচ্ছে করে, নাড়াচাড়া করতে ইচ্ছে করে। আর স্নেহের বস্তু বলে মিষ্ট একটা অনুভূতি আসে।
সাধন সরল তার অপরিণত বয়সের ফল। সে বয়সে বাৎসল্যরসের সৃষ্টি হয় নি। বরং সেই নবযৌবনের তীব্র আবেগের সময় ওদের আপদ বালাইয়ের মতই মনে হত।
এখন সেকাল নেই।
এখন সত্যবতী তো হাতছাড়াই। তবু এর সূত্রে যদি আবার একটু সরসতা আসে এই আশা। যমে-মানুষে টানাটানির লড়াইয়ের মানুষই জিতেছে, তাই মেয়েকে পয়মন্তও মনে হচ্ছে নবকুমারের!
মোট কথা সংসার বেশ ভালই চলছে নবকুমারের।
কিন্তু এ বাড়িতে সুহাস বলে যে একটা মেয়ে ছিল? সে কোথায় গেল? তাকে তো আর দেখা যায় না? সে কি তবে মারা গেছে? নাকি তার কুলত্যাগিনী মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে কুলত্যাগই করেছে?
তা নবকুমার তাই বলেছে।
প্রায় কুলত্যাগের ধিক্কারই দিয়েছে তাকে। জীর্ণদেহ সত্যবতীর সামনে তীব্রকণ্ঠে ধিক্কার ঘোষণা করতেও দ্বিধা করে নি। বলেছে, আর যেন ওটা এ বাড়ির ছায়া না মাড়ায়! কুলত্যাগে আর ধর্মত্যাগে তফাতটা কি? না-ই বা বিয়ে হত। হিন্দুর ঘরের মেয়ে, ঠাকুর-দেবতার পূজোপাট করে জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া যেত না। একটা বাপের বয়সী বুড়োর সঙ্গে ছি ছি ছি!… বুঝলে তুড়ুর মা, আমড়া গাছে কখনো ন্যাংড়া ফলে না! এই যে তুমি এতদিন গাছের গোড়ায় জল ঢাললে, এত সার দিলে, ন্যাংড়া কি ফলল? আমড়ার ছানা আমড়াই হল!
সত্যবতী হাত নেড়ে থামবার ইশারা করে পাশ ফিরেছিল।
এখন আর সত্য শয্যাগত নয়, তবু বেশীর ভাগ বিছানাতেই পড়ে থাকে। সদু এসে তার সংসারভার হাতে তুলে নেওয়ায় সত্য যেন অদ্ভুত একটা মুক্তির স্বাদে মগ্ন হয়ে আছে। সদু যেই বলে, থাক থাক বৌ, তুমি আবার কেন উঠে এলে রোগা মানুষ অমনি সত্য গিয়ে ঝুপ করে শুয়ে পড়ে। আগের মত তর্ক করে না, বলে না, এখন তো ভাল আছি। শুয়ে পড়ে
আর বেশীক্ষণ শুয়ে থাকলেই সেইদিনের অভিনীত নাটকটার দৃশ্যগুলোই তার চোখের পর্দায় ছুটোছুটি করে বেড়ায়।
গোড়া থেকে সবটাই জানে সত্য।
সত্যর জ্ঞান-চৈতন্য নেই ভেবে আঁতুড়ঘরের দোরে বসে সদু আর ভাবিনী সশব্দেই আলোচনাটা চালাচ্ছিল। কিন্তু অস্ফুট চৈতন্যের মধ্যেও সত্যর মাথার মধ্যে ওদের কথাগুলো যেন হাতুড়ির ধাক্কায় ধাক্কায় ঢুকে পড়তে লেগেছিল। অথচ ওদের নিষেধ করবার ক্ষমতা হয় না। না পারে হাত নাড়তে, না পারে কথা বলতে।
আর ভাবিনী হাতমুখ নেড়ে হ্যাঁ, ভাবিনীই বক্তা, সদু শ্রোতা। দেশে থাকতে ভাবিনীর সাধ্য ছিল না যে পাড়ার বয়স্কদের সঙ্গে কথা বলে। কিন্তু এখানে আলাদা, এখানে ভাবিনী ‘একজন’। তাই হাতমুখ নেড়ে কথা বলতে বাধে না, আর বলো না বামুন-ঠাকুরঝি, দেখে আমরা থ’ হয়ে গেছি।
ওই একটা বেজাতক বেজন্মা আইবুড়ো থুবড়ি মেয়েকে নিয়ে নাচানাচি, কী নাচানাচি!
জন্মের কথা কী বললে কায়েত বৌ?
শিউরে উঠেছিল সদু।
অথবা শিউরে উঠেছিল সদুর চিরদিনের সংস্কারে পুষ্ট রক্তকণিকা।
সদু যে ওই মেয়েটার হাতে খাচ্ছেদাচ্ছে গো!
সে কথাই বলে ফেলে সদু
কে না খাচ্ছে?
ভাবিনী ঠোঁট উল্টেছিল, নারায়ণের ঘরের ভোগ রাধবার দরকার হলেও বোধ হয় গিন্নী ওই ভাইঝিটিকে এগিয়ে দেবেন
