তা তোমার বন্ধু কি কানা না বোবা? ভাবিনী চিপটেন কাটে।
নিতাই মুচকে হেসে বলে, স্ত্রৈণ পুৰুষ শুধু কানা বোবা কেন, বোবা কালা কানা হাবা বুদ্ধু ভেড়া সব। ক্রমশই যে অবস্থা আমার ঘটছে আর কি!
ভাবিনীর কালো কালো ডাবর ডাবর মুখে আহ্লাদ রসের হাসি উছলে ওঠে। সেও মুখটিপে বলে, আহা লো মরি মরি! তবু যদি না রাতদিন এই বাঁদী থরহরি কম্প হয়ে থাকত। বেড়াপুরুষ কেমনধারা একবার দেখতে সাধ যায়।
সেদিন নিতাই এই কথার পিঠে বলে ওঠে, সাধ যায় তো চল না দেখবে। ও বাড়ি তো যেতেই চাও না।
পরের বাড়ি গিয়ে দেখে আর কি হবে?
ভাবিনী “গুলি” চোখে কটাক্ষ হানে।
নিতাই বলে, তা সকল বস্তুই কি আর ঘরেই মেলে গো? তবু দৃষ্টি সার্থক করবে তো চল। শুনলাম দেশ থেকে সদুদি এসেছে বৌয়ের আঁতুড় তুলতে। দেখা হবে
সদুদি এসেছে? ভাবিনী গালে হাত দিয়ে বলে, আঁতুড় কলকাতাতেই উঠবে? গিন্নী দেশে যাবেন না? এ সময়েও শাউড়ীর ধার ধারবেন না?
তাই তো শুনছি। বলেছেন নাকি, কেন, কলকাতায় কি আর জন্মমৃত্যু হচ্ছে না?
তা ভাল!
নিতাইয়ের বৌয়ের মুখে অন্ধকার নামে। সত্যবতীর খবরটা শুনে অবধি একটা আশা ছিল কিছুদিনের মতন অন্তত ওই চক্ষুশূলটা চোখছাড়া হবে। আর সেই অবসরে ভাবিনী সত্যবতীর স্বামী পুরকে নেমন্তন্ন-আমন্তন্নর ছলে খাইয়ে মাখিয়ে বশ করে ফেলে বরকে তাক লাগিয়ে দেবে।
তা না এই বার্তা!
বাসায় বসে আঁতুড় তোলাবেন!
ক্রুদ্ধকণ্ঠে বলে ওঠে ভাবিনী, তা ভেড়া বর তাতেই রাজী তো? মা-বাপের মুখে চুনকালি দিয়ে বৌ আপনি স্বাধীন হয়ে বেটা-বেটি বিয়োবে–
নিতাই চোখ মটকে বলে, তা হোক। ও তো বাঁচল। পরিবারকে চোখছাড়া করতে হল না।
.
কথাটা নিতাই অনুমানে বলল মাত্র। প্রকৃত ঘটনা কিন্তু তা নয়। সত্যবতীর এ প্রস্তাবে নবকুমার শিউরেই উঠেছিল এবং “অসম্ভব” বলে উড়িয়েই দিয়েছিল।
আঁতুড় পর্বের মত একটা ভয়ঙ্কর পর্ব যে দেশের বাড়িতে গিয়ে না পড়ল মিটতে পারে, এ তার ধারণার বাইরে।
কিন্তু শেষ অবধি বরাবর যা হয় তাই হল। সত্যবতীর তীক্ষ্ণ যুক্তির বাণে নবকুমারের দ্বিধা লজ্জা ভয় সব টুকরো টুকরো হয়ে গেল।
ভয়টা কিসের?
কলকাতায় জন্ম মৃত্যু হচ্ছে না? ভূমিষ্ঠ শিশুর নাড়ি কাটা বাকী থাকছে?
লজ্জা?
লজ্জার অর্থ? বুড়ো বয়সে যদি আবার কেঁচেগন্ডুষে লজ্জা না হয় তো বাসায় আঁতুড় তোলাতেই লজ্জা?
অতএব?
দ্বিধার প্রশ্নটা অবান্তর।
নবকুমার অবশ্য এই বুড়ো বয়সে কথাটায় রেগে উঠেছিল। বলেছিল, বুড়ো বয়স বুড়ো বয়স করছ কেবলই কেন বল তো? আমার ছোট মাসীর পৌত্তুরে উপনয়ন হয়ে যাবার পর আবার একটা মেয়ে হয়েছিল-
সত্য জ্বলন্ত দৃষ্টিতে শুধু তাকিয়েছিল একবার, তারপর সংক্ষেপে বলেছিল, ওসব কথা থাক, এখানেই ব্যবস্থা করতে হবে সেই কথাটাই জানিয়ে রাখলাম।
বলা বাহুল্য মাত্র এইটুকুতেই কাজ হয় নি।
নবকুমার বিস্তর হাত-পা আছড়েছিল, বিস্তর আক্ষেপ জানিয়ে বলেছিল, আমি ওসবের কি জানি? এখানে কাউকে চিনি আমি? ব্যবস্থা করতে হবে বললেই হল?
তার পর সত্যর একটি তীব্র মন্তব্যে সহসা চুপ করে গিয়েছিল। আর অতঃপর একদিন বুদ্ধি করে চুপি চুপি গিয়েছিল সদুর বরের কাছে। শুনেছিল তার গণ্ডা তিন-চার ছেলেমেয়ে। সেগুলো নাকি কলকাতাতেই জন্মেছে, অতএব লোকটা অভিজ্ঞ।
তা অভিজ্ঞ লোকটা দরাজ ভরসা দিয়ে আশ্বস্ত করল নবকুমারকে এবং সেই সঙ্গে সদুকে আনিয়ে নেবার পরামর্শটা দিল।
দিন তিনেক ছুটি নিয়ে বারুইপুরে গিয়ে সদুকে এনে ফেলল নবকুমার।
কিন্তু যত সহজে বলা হল, কাজটা কি তত সহজে হয়েছিল?
পাগল? তাই কি সম্ভব?
এলোকেশী একাধারে রাধুনী পরিচর্যাকারিণী এবং নিঃসঙ্গ সংসারের সঙ্গিনী সদুকে কি এক কথায় ছাড়তে রাজী হয়েছিলেন?
হারামজাদী শতেকখোয়ারী হাড়বজ্জাত বৌটার নামে একশো গালাগালের ছড়া কেটে, বেয়াক্কেলে বেহায়া বৌয়ের দাসানুদাস ছেলেকে কি শুধু-হাতে বিদায় করতে উদ্যত হন নি?
হয়েছিলেন।
কিন্তু ভেস্তে দিল স্বয়ং সদু।
সে বলে বসল, আমি যাব।
তুই যাবি? এলোকেশী গর্জে উঠেছিলেন, আক্কেলখাকী, চোখের মাথাখাকী, নেমকহারাম লক্ষ্মীছাড়ি! তুই আমাদের একা ফেলে সেই হাড়বাতির পাদোক খেতে যাবি?
কিন্তু সদু অনমনীয়।
সদুর যে এত গো আছে, এ কথা কে কবে জানত?
এ যেন আর এক সদু।
সামান্য দু-চারখানা কাপড়ের সম্বল নিয়ে সদু সদরে দাঁড়িয়ে প্রস্তুত।
আজন্ম অগঙ্গার দেশে মুখ থুবড়ে প্রাণ গেল সদুর, কালী-গঙ্গার দেশে যেতে পাবার এই সুযোগ ছাড়বে না।
তোমাদের কন্না? সে তো চিরকাল করে এল! সদুর কি ছুটি নেই? সদু যদি মরে? তোমরা কি না খেয়ে থাকবে?
কে সদুকে এই বিদ্রোহের শক্তি দিল ঈশ্বর জানেন।
“থ” হয়ে গেলেন এলোকেশী, হকচকিয়ে গেল নবকুমার।
নীলাম্বর বাঁড়ুয্যের ক্রুদ্ধ গলায় বললেন, যাচ্ছ যাও, কিন্তু আর কখনো এ ভিটেয় মাথা গলাতে এস না বলে রাখছি।
সদু প্রণাম করে নম্র গলায় বলল, আচ্ছা।
দিশেহারা নবকুমার বলল, ভয়ে আমার নাড়ি ছেড়ে আসছে সদুদি, থাক তোমায় যেতে হবে না। বৌয়ের যদি পরমায়ু থাকে বাচবে, আর যদি কপালে মৃত্যু থাকে
সৌদামিনী মৃদু হেসে বলল, তোর বৌকে বাঁচাতে যাচ্ছি ভেবেছিস? মোটেও না। নিজের কপালটা ফের আর একবার যাচাই করতে ইচ্ছে হয়েছে, তাই যাচ্ছি।
