ভবতোষ আকুলতা করেন, ভবতোষ ব্যাকুল হয়ে ওঠেন, বার বার বলতে থাকেন, এ তুমি কি করলে বৌমা? আমাকে এভাবে সত্যবন্দী করে রাখলে–
সত্য বিচলিত হয় না।
সত্য দৃঢ়স্বরে বলে, আমি ঠিক জায়গাতেই ঠিক কথা বলছি মাস্টার মশাই, এখন আপনি আছেন এই ভরসা।
ভবতোষ আকাশ পাতাল ভাবতে থাকেন কোথায় সেই পাত্র যার হাতে ওই সোনার প্রতিমাটিকে দেওয়া যায়, আর যে ওর সমগ্র ইতিহাস শুনেও নিতে রাজী হয়।
ভেবে পান না।
একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, এখন চট করে মাথায় আসছে না বৌমা, দেখি। কিন্তু একটা প্রশ্ন করি, এই যে তুমি এসেছ নবকুমার জানে?
সত্য মাথা কাত করে। অর্থাৎ হ্যাঁ।
ভবতোষ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলেন, তবে?
তবে আর কি? ওনার অমতেই করতে হবে।
কাজটা কি ভাল হবে বৌমা?
সত্য মুখ তুলে বলে, কিন্তু ওই মেয়েটার আখেরের কথা না ভেবে নিশ্চিন্দি হয়ে বসে থাকাই কি ভাল হবে মাস্টার মশাই? আমার ঘরে সংসারে হয়তো একটু মনোমালিন্য হবে, হয়তো শ্বশুরবাড়ির মানুষেরা আমার মুখ দেখবে না, কিন্তু আমার সেই সামান্য লোকসানটা কি একটা মেয়ের জীবনটা বরবাদ হয়ে যাওয়ার থেকে বেশী লোকসানের হল?
ভবতোষ এক মুহূর্ত নির্নিমেষে তাকিয়ে হঠাৎ ব্যাকুল রুদ্ধ কণ্ঠে বলে ওঠেন, সন্ধ্যে হয়ে আসছে বৌমা, তুমি বাড়ি যাও। তোমায় কথা দিচ্ছি, ওর বিয়ের ভার আমি নিলাম।\
সত্য আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে, সন্ধ্যের চিহ্নমাত্র নেই। মাথাটা একটু নিচু করে বলে, চিরটাকাল আপনার কাছে অন্যায় আবদার করে আর পেয়ে সাহস বেড়ে গেছে মাস্টার মশাই, আমায় মাপ করবেন।
মাপ? তোমায় আর আমি কি মাপ করব বৌমা? নিজেকে যদি মাপ করতে পারতাম! সে যাক, মেয়েটি কোথায় গেল?
মেয়েটি! তাই তো!
তার তো, তদবধি আর কোন সাড়া নেই। সত্য ব্যস্তভাবে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে আর এই প্রথম খেয়াল হয় অনেকক্ষণ ধরে সে এই তৃতীয় মানুষহীন ঘরে একজন পুরুষের সঙ্গে নিশ্চিন্তে কথা বলছে বসে বসে।
সুহাস কি বিরক্ত হল?
পাশের ঘরে চলে যেতে বলেছে বলে অপমানিত হল?
পাশের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল সত্য, কোথায় সুহাস?
একা চলে গেল না তো?
সহসা একটা আতঙ্কের বিদ্যুৎশখা মাথা থেকে পা পর্যন্ত যেন শিউরে উঠল সত্যবতীর। নিশ্চয় তাই!
কই?
প্রশ্ন করলেন ভবতোষ।
সত্য অফুটে বলল, কই দেখছি না তো! একা চলে গেল নাতো?
একা!
একা চলে যাবে!
ভবতোষ সন্দেহের সুরে বললেন, তাই কখনো হয়? ওই কোণের ঘরটায় আছে বোধ হয়
কোণের ঘরে? ওখানে কি আছে?
কিছু না। শুধু কতকগুলো
কথা শেষ হয় না। মুখে একঝলক আলো মেখে সুহাস সেই কোণের ঘরটা থেকে ছুটে আসে, স্বভাব-বহির্ভূত উচ্ছাসে বলে ওঠে, পিসিমা পিসিমা, দেখবে এস কত বই! উঃ, আমার আর এখান থেকে যেতে ইচ্ছে করছে না!
৪২. সময়ের বাড়া কারিগর নেই
সময়ের বাড়া কারিগর নেই।
সময়ের র্যাঁদার নিচেয় পড়ে সব অসমানই সমান হয়ে আসে, সব। এবড়ো-খেবড়োই তেলা হয়ে যায়।
সকল সংসারের মত নিতাইয়ের সংসারেও এই লীলা চলছে বৈকি। প্রথম দিকে এক-একদিন এক-একটা ছুতোয় মনে হত, নিতাই বোধ করি এই দণ্ডে বৌকে দেশে রেখে আসবে। অথবা বৌ ভাবিনী সেই রাত্রেই আড়ায় দড়ি ঝুলিয়ে নিজে ঝুলে পড়বে। কিন্তু কার্যকালে তেমন কিছুই হল না।
ক্রমশই, বোধ করি নিজেদের অজ্ঞাতসারেই, ভাবিনী স্বাধীন সংসারের সংসার-রসে এবং নিতাই আর এক স্কুল রসে মজতে শুরু করল, অতঃপর দুজনেই পরস্পরের কাছে অপরিহার্য হয়ে উঠল।
অতএব খণ্ড প্রলয়ের সেই অবস্থাটি কোন্ ফাঁকে ফিকে হতে হতে বিলীন হয়ে গেল, দেঁতো হাসি বাজার দখল করল।
এখন দেখা যাচ্ছে নিতাইয়ের বৌ রুটি গড়তে শিখেছে, এবং নিতাই বৌকে ভয় করতে শিখেছে।
ভয় থেকেই আসে মনোরঞ্জন-চেষ্টা। ক্রমশই অনুধাবন করছে নিতাই, সত্যবতীর নিন্দাবাদটি হচ্ছে বৌয়ের মনোরঞ্জনের একটি প্রশস্ত পথ, মনোবৈকল্যের একটি প্রকৃষ্ট ওষুধ।
অতএব সেই প্রশস্ত আর প্রকৃষ্ট উপায়টিই বেছে নিয়েছে নিতাই। না নিয়ে করবেই বা কি? পরিবারে পরকলায় জগৎকে দেখতে না শিখলে যে জগৎ দুঃসহ হয়ে ওঠে। অন্তত নিতাইদের মত নিতান্ত গৃহগতপ্রাণ গেরস্থ জীবদের। এদের ও ছাড়া উপায় নেই।
আগুনের মালসা কোলে করে তো আর ঘর করা যায় না। আগুনে জল ছিটোতেই হয়। তদৃতপ্রাণ বশংবদ হয়ে পড়াই সেই শীতল জল।
নারীজাতী যতই অবলা কোমলা হোক, স্বক্ষেত্রে সে বাঘিনী। আর ইচ্ছাপূরণের অভাব ঘটলে ফণাধরা নাগিনী হয়ে উঠতেও পিছপা নয়। শান্তিকামী পুরুষজাতি যতক্ষণ না এটা ধরতে পারে, সংঘর্ষ বাধে, ততক্ষণ মনে করে এটা মেনে নেব না, অবস্থা আয়ত্তে আনা অসম্ভব হয় অথচ একবার বশ্যতা স্বীকার করলেই মিটে গেল গোল। কিসে তুষ্টি ধরতে পারলেই বিশ্বশান্তি।
অতএব এখন ভাবিনী যে কোন কারণেই মেজাজ গরম করুক অথবা বাক্যালাপ বন্ধ করুক, নিতাই এটা ওটা কথার ছলে স্বগতোক্তিক সুরে সত্যবতীর প্রসঙ্গ এনে ফেলে। সে প্রসঙ্গ আর যাই হোক প্রশস্তির পর্যায়ে পড়ে না।
দু-চারবার চেষ্টার পরই কার্যসিদ্ধি হয়, মৌনব্রতধারিণী ঝঙ্কার দিয়ে বলে ওঠে, কেন, এখন আবার এসব কথা কেন? চিরদিনই তো শুনে আসছি তিনি গুণের গুণমণি! তার পাদোদক জল খেতে পারলে তবে যদি আমাদের মত অধমদের উদ্ধার হয়!
নিতাই সোৎসাহে কাজে এগোয়, তা বলতে অবিশ্যি পার, এই মুখেই অনেক গুণগান করেছি বটে। কিন্তু এখন? এখন আর নয়। এখন আর তাকে চিনতে বাকী নেই। কি বলব তোমাকে, ওই ‘বেহ্ম’টার সঙ্গে যা নটঘটি, দেখে দেখে চিত্তির চটে গেল। অবশ্যি– নিতাই মুখ কোঁচকায়, সন্দেহ একটু আধটু বরাবরই ছিল, তবে সে সন্দেহকে আমল দিতাম না। বলি, না না, ছিঃ! বামুনের ঘরের মেয়ে কিন্তু এখন তো দেখছি চোখের চামড়াহীন বেপরোয়া! একলা ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করে তার বাড়ি গিয়ে গিয়ে
