আছে দরকার।
কিন্তু নিতাই শুনলে কি আস্ত রাখবে আমায়?
আস্ত রাখবে না? সত্য মৃদু একটু ব্যঙ্গ হাসি হেসে বলে, একেবারে ভেঙেই ফেলবে?
তা প্রায় তাই। তা ছাড়া, মানে দরকারটা কি?
বললাম তো আছে দরকার।
নবকুমার মন্রতা ভোলে, ক্রুদ্ধকণ্ঠে বলে ওঠে, ওই বেধর্মী লোকটার সঙ্গে তোমার দরকারটাই বা কি তাই শুনি?
বলে ফেলেই অবশ্য ভয়ে কাঠ হয়ে যায়। কে জানে বাবা, এ কথাতেও সত্য অজ্ঞান হয়ে যাবে কিনা? কিন্তু না, অজ্ঞান হয়ে যায় না সত্য, শুধু মিনিটখানেক পাথরের চোখ নিয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে থেকে বলে, একটা পরামর্শ করব।
পরামর্শ! বাপ-পিতেমোর নাম গেল হিদে জোলার নাতি! জাতে-জ্ঞাতে পরামর্শর মানুষ মিলল না, পরামর্শ করতে যাবে ওই ধর্মখোয়ানো ইয়ের সঙ্গে?
সত্য বোধ করি রাগবে না বলেই দৃঢ়সংকল্প, তাই স্থিরভাবে বলে, জাতে-জ্ঞাতে মানুষ আর পাচ্ছি কোথা? পাখী-পক্ষীর সঙ্গে তো আর পরামর্শ হয় না? যাক গে, তুমি যখন নিয়ে যেতে পারবে না, আমি নিজেই যে করে হোক
নিজেই যে করে থোক!
নবকুমার আরো ক্রুদ্ধ গলায় বলে, এই এক একবগ্গা গোঁ। যা ধরব তা করবই। বেশ এতই যদি দরকার, তাকেই তবে ডেকে আনব গলবস্ত্র হয়ে গিয়ে!
না।
না?
না-ই তো। একদিন নিজের মুখে তুমি তাকে এ বাড়িতে আসতে বারণ করেছ–
করেছি, এবার গলবস্ত্র হয়ে সে অপরাধ ক্ষয় করব।
ক্ষয় হয় না এমন অপরাধও তো জগতে আছে গো? যাক, তক্ক আমি করতে চাই না, তবে এ বাড়িতে আর পা ফেলতে বলব না তাকে, নিজেই গিয়ে যা পারব
এই তোমার জন্য একদিন দেশত্যাগী হতে হবে আমায়!
নবকুমার মুখের চেহারায় বিরক্তির চরম নমুনা দেখায়। কিন্তু সত্য নির্বিকার, বলে, দেশত্যাগী হবে বললেই কি হওয়া যায়? যায় না। যাক গে, তুমি আর এ নিয়ে মাথা খারাপ করো না। আমিই ব্যবস্থা করে নেব। তবে জানানোটা হয়ে থাকল।
মাথা খারাপ করতে বারণ করলেই কি আর নিজের দায়িত্ব ত্যাগ করতে পারে নবকুমার? মাথা সে খারাপ করছেই। শেষ অবধি ভেবে হদিস না পেয়ে হাল ছেড়ে দেয় সে, আর ইত্যবসরে সত্য স্বাধীন অভিযান চালায়। নিজেও রওনা হয় ভবতোষের বাড়ি।
পথের সঙ্গী?
আর কেউ নয়, সুহাস।
হ্যাঁ, সুহাসের সঙ্গেই গিয়েছিল সত্য। সুহাস ঠিকানাটা শুনে বলেছিল, ওমা, এ তো আমাদের ইস্কুলের কাছেই–
ঠিক আছে, তবে তোতে আমাতেই যাব।
বলেছিল সত্য, আর বোধ করি মনের নিভৃত কোণে এটুকু গুপ্ত বাসনা ছিল, ভবতোষকে একবার কনে’টা দেখিয়ে দিতে। ঘটকালি যখন করবেন, তখন অন্তত মেয়ে কেমন তা যাতে বলতে পারেন!
.
এবার আর মাধ্যম নয়, সরাসরি নিজেই কথা।
ভবতোষ যেন হা হয়ে গেলেন।
সত্য একটা অনাথা মেয়ে পুষেছে এ তিনি জানতেন, কিন্তু সে মেয়ে যে এমন মেয়ে আর এত বড় মেয়ে তা তার ধারণার বাইরে ছিল। বিহ্বল দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চোখ নামিয়ে নিয়ে বললেন, এ মেয়ের আবার পাত্তরের ভাবনা, বৌমা?
সে আপনি স্নেহ করে বলছেন। দিন তবে নাতনীর একটা ব্যবস্থা করে। আপনার সমাজে শুনেছি অনেক উদারমন ছেলে আছে যারা বিধবা বিয়ে করতে রাজী–
বিধবা!
ভবতোষ থতমত খান, বিধবা! এ মেয়ে যে লক্ষ্মী-প্রতিমা বৌমা, বিধবার মতন তো কোন লক্ষণ
সত্য সহসা বলে ওঠে, তুই একবার পাশের ঘরে যা তো সুহাস, আমার একটু কাজ আছে।
সত্যর এই দুঃসাহসিক স্পর্ধায় সুহাসও স্তম্ভিত হয়ে যায়। একেই তো এভাবে একটা পুরুষের বাসায় একা দুটো মেয়েছেলে আসাই ভয়ঙ্কর ঘটনা, তার ওপর কিনা সুহাস তুই পাশের ঘরে যা!
প্রায় হতভম্ব হয়েই চলে যায় সুহাস।
ভবতোষ হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন এই কূলকিনারাহীন দুঃসাহসের দিকে। আর সত্য নিষ্কম্প মৃদুস্বরে বলে, এসেছি যখন তখন আপনার কাছে ওর সব ইতিহাসই বলব।
হ্যাঁ, সুহাসের সব ইতিহাসই বলেছিল সেদিন সত্য ভবতোষ মাস্টারের কাছে। সুহাসের জন্মের আগের বৃত্তান্ত থেকে শুরু করে পরিচয়ও বাদ দেয় নি। শঙ্করীর কুলত্যাগের পর রামকালীর স্পষ্ট স্বীকারোক্তির কথাটাও এসে পড়েছিল।
সব শুনে ভবতোষ গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, এখন বুঝতে পারছি বৌমা, কোথা থেকে এ ধাতু পেয়েছ! অমন বাপ তাই–, কিন্তু কথা হচ্ছে বৌমা, এই আমাদের নতুন সমাজকে তুমি যে রকম উদার ভাবছ, ঠিক সে রকম নয়। এর মধ্যেও দলাদলি আছে রেষারেষি আছে, তা ছাড়াও যে মেয়ের বংশপরিচয় নেই, সে মেয়েকে বিবাহ করার মত মনোবলসম্পন্ন যুবক পাওয়া শক্ত।
সত্য দৃঢ়স্বরে বলে, শক্ত সহজ বুঝি না, চিরদিন জানি আমার কথা আপনি ফেলতে পারেন না, তাই জোর করতেই এসেছি। ওই মেয়েটার ব্যবস্থা আপনাকে করতেই হবে।
ভবতোষ বিচলিত স্বরে বলেন, আমি তোমার কথা ফেলতে পারব না, এ কথা তুমি জানলে কি করে বৌমা?
সত্য মুখ তুলে পরিষ্কার এবং শান্ত গলায় বলে, এক কথা জানতে খুব বেশী কিছু লাগে না মাস্টার মশাই, আমি তো মাটি পাথর নই। কিন্তু সে কথা থাক, আপনি শুধু আমায় ভরসা দিন
ভবতোষ একটু হাস্যের সঙ্গে বলেন, চেষ্টা অবিশ্যি করব বৌমা, কিন্তু জোর করে তো বলতে পারছি না। যদি নিজেকে দিয়ে হত, তা হলে নয় আজন্মের ব্রত ঘুচিয়ে একবার তোমার সুন্দরী মেয়ের জন্যে বরসাজ সেজে নিতাম।
সত্যও হেসে ফেলে। তারপর সকৌতুকে বলে, তেমন ভাগ্য ওর থাকলে তো? আমি কিন্তু বলে যাচ্ছি সব ভার আপনার ওপর রইল!
