তা বেশ তো, সুখের কথা। দিদিকে আনিয়ে নিয়ে আবার নতুন করে গাঁটছড়া বেঁধে পাঠিয়ে দাও। দুই সতীনে সুখে সংসার করুন– বলে একটু তীক্ষ্ণ হেসে সরে যাচ্ছিল সত্য, কিন্তু মুহূর্তে ঘটে গেল এক বিপর্যয়।
নবকুমার বোধ করি কিছু না ভেবেচিন্তেই ক্ষণপূর্বে শোনা একটি কথা যথাযথ উচ্চারণ করে বসল, তা সে সতীন-জ্বালা আর বেশী দিন নয়। শুনলাম নাকি এ পক্ষের সূতিকা ধরেছে। তবে? সে কাঁটা আর কদিন?
মুহূর্তে যেন একটা বোমা ফেটে গেল। সত্যবতী উন্মাদের মত নিজের কপালে একটা থাবড়া মেরে চিৎকার করে উঠল, চুপ করবে তুমি? দয়া করে একটু চুপ করবে? যদি তা না পারো তো যে করে পারো, আমায় জন্মের শোধ কালা করে দাও!
একার সংসারে এতদিন ধরে অরুচি আর অক্ষিদেয় না খেয়ে খেয়ে ভিতরে ভিতরে দুর্বল হয়ে যাওয়া শরীরটা এই উত্তেজনার বার বইতে পারল না। হুড়মুড়িয়ে পড়ে গেল।
ছেলে দুটো হাউমাউ করে জল আর পাখা আনতে ছুটল, নবকুমার ঘর থেকে একটা বালিশ এনে সত্যর লুটিয়ে পড়া মাথার তলায় গুঁজে দিতে বসল, আর এই সময় সুহাসিনী ও-বাড়ি থেকে এসে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
আজ ভারী উৎফুল্ল হয়ে আসছিল সুহাস, কারণ তাঁর শিক্ষা-গুরু বৌটি বলেছেন, তুমি যদি ভাই রাজী থাক তো আমার মাস্টারী কর। বড়লোকের বাড়িতে কেবল খেয়ে শুয়ে জীবনে যেন ঘেন্না ধরে গেছে। তোমায় দেখে মনে হয়, যদি তোমার মতন বই-টই পড়তে পারতাম, তা হলেও বা দিনটা কাটত। তা ইস্কুলে যাওয়া তো আর জীবনে হবে না, তবু তোমার কাছে যদি
মাস মাস আটটা করে টাকা দিতে চেয়েছে সে। সুহাস অবশ্য টাকার কথায় আপত্তি করেছিল, বলেছিল, টাকা কেন ভাই! তুমি আমায় একটা বিদ্যে শেখাচ্ছ, আমি না হয় তার বদলে তোমাকে একটা
কিন্তু সে হাতে ধরে কাকুতি-মিনতি করেছে। বলেছে, আমায় শখের জন্যে টাকা খরচ করতে তো আমার বর সর্বদা রাজী! একদিন থিয়েটারে নিয়ে যেতে পচিশ-তিরিশ টাকা খরচ করে, এও তো আমার একটা শখ! গুরুকে দক্ষিণে না দিলে বিদ্যে হয় না।
সুহাস রাজী হয়ে এসেছে।
উফুল্ল হৃদয়ে সত্যর কাছে বলতে আসছিল, দেখ পিসীমা, বড়লোক মাত্রেই খারাপ হয় না। তাদের মধ্যেও মহৎ আছে–, কিন্তু এসেই এই দৃশ্য।
তাড়াতাড়ি সবাইকে সরিয়ে দিয়ে সেবার ভারটা হাতে তুলে নিল সে। আর সেই প্রথম খবরটা জানল। আত্মগত ভাবেই বলে ফেলল নবকুমার, শরীরটায় পদার্থ নেই দেখছি। বাচ্চা-কাচ্চা হবার আগে মেয়েছেলে মা-ঠাকুমার কাছে যায়, তা সে গুড়ে তো বালি! বারুইপুরেই পাঠিয়ে দিতে হবে দেখছি!
কিছুটা সময় দিশেহারা হয়ে তাকাল সুহাস। তার পর নিজের ওপর ধিক্কারে অবাক হয়ে গেল। ছি ছি, এত বড় বুড়ো মাগী সে, এমনই অবোধ! এক ঘরে একসঙ্গে, কিছু টের পায় নি? তুড়ু খোকার চাইতে তা হলে কোন তফাৎ নেই তার? পিসীমার যে শরীরে এমন অবস্থা হয়েছে, প্রথমে তো তারই বোঝা উচিত ছিল। যত্ন-আত্তিও করা উচিত ছিল।
বুঝতে পারে নি।
সত্যর ছেলে দুটো এত বড় হয়ে গিয়েছে যে, এ ধরনের চিন্তা মাথাতেই আসে নি। তা শুধু লজ্জাই নয়, আজ সত্যর ওই চৈতন্যহীন পাংশু মুখের দিকে তাকিয়ে অজানা একটা ভয়েও বুকটা কেঁপে উঠল সুহাসের।
সুহাসের ভাঙা ভাগ্যে যদি তার এই আশ্রয়ের ভেলা ডুবে যায়? যদি সত্যর কিছু ঘটে?
অনেকদিন পরে ছেলেপুলে হলে তো বিপদ হতে পারে শুনেছে, বুকটা কেঁপে নিথর হয়ে এল সুহাসের। আর বোধ করি এই প্রথম উপলব্ধি করল সত্যকে কতটা ভালবাসে সে। শুধু আশ্রয়ের ভেলা বলেই নয়, মানুষ’টা বলেও প্রাণের আসনে বসিয়ে রেখেছে সুহাস সত্যকে প্রতি মুহূর্তের সংস্পর্শে।
মা-ঠাকুমা নেই বলে যত্ন পাবে না সত্য? সুহাসের কি বয়েস হয় নি সেবা করবার?
৪১. অনুতাপ-দগ্ধ সুহাসের দৃঢ় সংকল্প
অনুতাপ-দগ্ধ সুহাসের দৃঢ় সংকল্প অবশ্য কাজে লাগল না। কারণ মাত্র একটা বেলার বেশী বিছানায় শুয়ে থাকল না সত্যবতী। সুহাসের অনুনয়-বিনয় এবং নবকুমারের ব্যস্ত ভৎর্সনাকে উপেক্ষা করে উঠে পড়ল সে। বলল, ঠিক হয়ে গেছি বাবা। তোমরা আর তিলকে তাল করো না।
কিন্তু এই আকস্মিক দুর্বলতার ঘটনায় গভীর একটা চিন্তা দেখা দিল সত্যবতীর মধ্যে। সে চিন্তা স্বামী-পুত্রের জন্য নয়, ওই অনাথা মেয়েটার জন্যেই। নিশ্চিন্ত হয়ে বসে আছে সত্য, কিন্তু যদি সত্যর একটা কিছু ঘটে, ওর কি হবে? অবিশ্যি মরে এক্ষুনি যাবে সত্য তা নয়, তবু বলা কি যায়! বুড়ো বয়সে আবার যখন কেঁচে-গন্ডুষের পালা পড়ল তখন ভয় আছে বৈকি। ছেলেদের জন্যে ভাবনা নেই, ওরা প্রায় মানুষ হয়ে এল, নবকুমারের মা-বাপ আছে এখনও, হয়ে যাবে কোন ব্যবস্থা, ওই মেয়েটারই অজল অস্থল অবস্থা। ওই রূপের ডালি মেয়েকে এলোকেশী নিশ্চয়ই সুচক্ষে দেখবেন না। তা ছাড়া শুধু দেখার প্রশ্নই তো নয়। এতদিন নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকার জন্য নিজেকে ধিক্কার দিল সত্য এবং পরদিন নবকুমারের কাছে একটা অসমসাহসিক আবেদন করে বসল।
সত্য মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নবকুমারেরও মাথা ঘুরে গিয়েছিল এবং এই কদিন নিতান্তই বেচারার মত কিসে সত্যর সন্তোষ-বিধান হতে পারে তার চেষ্টা করছিল, কিন্তু সত্যর এই আবেদনে তার নতুন করে আবার মাথা ঘুরে গেল। অবাক হয়ে বলল, মাস্টার মশাইয়ের বাড়ি যাবে তুমি! কেন? হঠাৎ এমন কি দরকার পড়ল?
