সুহাসিনীর স্কুলে যাবার পথে জানলা দিয়ে ডেকে নিজেই আলাপ করেছিল বৌটি।
ওই লোকটা থাকতে থাকতে সুহাস না ফিরলেই বাঁচি, রান্না করতে করতে ভাবল সত্য। ফিরলে তো ওরই চোখের সামনে দিয়ে ফিরবে? অতি বদ প্রকৃতির লোক। দেখলে নিশ্চয় ওই সুহাসের কথায় সাতশ কৈফিয়ত চাইবে।
মানুষ যে কেন এমন অসভ্য হয়!
আস্তে আস্তে অন্য ভাবনায় চলে যায় সত্য, শুধু কি অসভ্যই হয়? হ্যাংলাও হয় না কি? নইলে সদু ওই বদ লোকটাকে এখনো স্বামীজ্ঞান করে বসে থাকে? শুনেছে নবকুমারের কাছে ইতিহাস। নির্যাতনের জ্বালায় চলে গিয়েছিল সদু, তারপর এই নির্যাতক স্বামীর ঘরে সতীন-কাটা পুঁতেছে, সে খবরও জানা। তবে? এত সত্ত্বেও কি চিরদিন মনে মনে ওর চরণের দাসী হয়ে থেকেছে সৌদামিনী? না ওটা একটা নিয়মরক্ষের পাঠ মাত্র?
হয়তো এদিকে মামীর নির্যাতনে সাময়িকভাবে কোনদিন ধৈয্যচ্যুত হয়েই এ কাজটা করে বসেছে।
কিন্তু তাই কি?
এ তো মনে হচ্ছে বেশ পরিকল্পনার ব্যাপার। রাগের মাথায় কিছু করে ফেলা নয়। পাড়ার কোনো ছেলেপুলেকে দিয়ে লেখালে লোক-জানাজানি হবার ভয়েই হয়তো এতদিন পারে নি। এখন নিজের ভাইপোদের দিয়ে
সন্দেহ নেই কথাটা প্রকাশ করতে বারণ করেছে ছেলেদের। সদুর ওপর এজন্যেও রাগ হয় সত্যর। পিসি হয়ে লুকোচুরি করার বিদ্যেটায় হাতেখড়ি দিলে তুমি!
এখন সত্য কি করে ওদের তিরস্কার করবে?
সেটা কি ঠিক হবে?
পিসিও তো গুরুজন। তার কাছে যখন কথা দিয়েছে। “সত্যরক্ষা” যে মানুষের জীবনের সারধর্ম, এ কথা সত্যই শিখিয়েছে ছেলেদের।
কিন্তু যতই যা শেখাও, তুড়ুটা ঠিক তার বাপের ধাচে যাচ্ছে। মেরুদণ্ডহীন অসার। তবে নবকুমারের আবার তার ওপর মুখে তড়পানি আছে, এর সেটা নেই এই যা! মৃদু ভালমানুষ ছেলেটা। কিন্তু ভালমানুষই কি প্রার্থনীয়? ওই ভাল’টা বাদ দিয়ে যেটা হয়, সেটাই যে চায় সত্য।
সরলটা হয়তো একটু অন্যরকম হবে।
কিন্তু সে কোন্ রকম?
সত্যবতীর মনের মধ্যে মানুষের যে ছাঁচ গঠিত আছে, তার ধারে-কাছে পৌঁছবে?
নাঃ, সে আশা নেই সত্যর। লেখাপড়া শিখবে, রোজগারপত্র করবে, পাঁচজনে “ভাল” বলবে এই পর্যন্ত। তার বেশী নয়, বুঝে নিয়েছে সত্য। যদি তার বেশী হত, এতদিনে ধরা পড়ত সে দীপ্তি, সে ঔজ্জ্বল্য।
বরং সুহাসিনীর মধ্যে বস্তু দেখতে পায় সত্য, দেখতে পায় দীপ্তির চমক। যে সুহাসিনীর কৈশোরকাল পর্যন্ত কেটেছে এক কুশ্রী পরিস্থিতির মধ্যে। জীবনের বনেদে যার শুধুই শূন্যতা।
হয়তো সেই জন্যেই।
আলো আর অন্ধকারের পার্থক্যটা ওর কাছে তীব্র হয়ে ধরা পড়েছে। এদের কাছে সে তীব্রতা নেই। এরা তাই ঝাঁপসা-ঝাঁপসা। চোদ্দ-পনেরো বছর বয়স হল, এখনো বোঝা যাচ্ছে না ওরা নিজেদের নিয়ে কিছু ভাবে কিনা, ভাবতে শিখেছে কিনা। কোনটা ভালো কোটা মন্দ সেটা চিন্তা করে কিনা।
আশ্চর্য!
সত্যবতীর মনের মধ্যে যে ছাঁচ, সত্যবতীর গর্ভের উঁচ তার নাগাল পেল না।
ঈশ্বর জানেন এই সুদীর্ঘকাল পরে সত্যবতীর সত্তার মধ্যে আবার কোন্ ছাঁচ গঠিত হচ্ছে। প্রথমটা ভারী একটা বিপন্নতা বোধ করেছিল সত্য, বিপদ বলে মনে হয়েছিল ঘটনাটাকে, ক্রমশ মনটা কোমল হয়ে আসছে। এমন কি মাঝে মাঝে ভাবতেও ইচ্ছে করছে, পালা বদল হলে মন্দ হয় না, একটি মেয়ে হলে বেশ হয়।
আজ হঠাৎ মনে হল সত্যবতীর, যদি তা-ই হয়, কে বলতে পারে সে মেয়ে তার পিতামহীর আকৃতি আর প্রকৃতি নিয়ে অবতীর্ণ হবে কিনা!
হয়তো তাই হবে।
সত্যবতীর একাগ্র ইচ্ছার নিরন্তর তপস্যা কোনো কাজেই লাগবে না। মেয়ে মানুষের এ এক অদ্ভুত নিরুপায়তা। নিজের রক্ত মাংস মন বুদ্ধি আত্মা সব কিছু দিয়ে যাকে গড়ছি, জানি না সে কী হবে!
নিঃশ্বাস ফেলে ভাবল, শুনেছি শাস্তরে আছে নরাণাং মাতুলক্রমঃ! কিন্তু মাতুল না থাকলে? দাদামশাইয়ের আত্মজই তো মাতুল? তবে? দাদামশাইয়ের কথা শাস্ত্রে লেখে নি।
চিন্তায় ছেদ পড়ল।
বাইরে সেই বাজখাই গলা বেজে উঠল, কই গো বাড়ির গিন্নী, অত লেকচার-টেকচার শুনিয়ে হঠাৎ একেবারে ডুব যে! অধম তাহলে এখন বিদায় নিচ্ছে। মাঝে মাঝে আসতে অনুমতি হবে তো?
সত্য বাইরে বেরিয়ে এসে হেঁট হয়ে নমস্কার করে শান্ত গলায় বলে, আসবেন বৈকি।
.
কিন্তু এতে, ওই শান্ত বচনেতে কোন কাজ হল না।
মুকুন্দ বিদায় নিতে নবকুমার রে রে করে পড়ল।
বলি তোমার ব্যাপারটা কী? কী সব যাচ্ছেতাই কথা বলছ মুখুয্যে মশাইকে?
সত্য বিরক্তভাবে বলে, যাচ্ছেতাই আবার কী বলতে যাব?
তা যাচ্ছেতাই ছাড়া আবার কী? উনি কিছু যেচে আসেন নি? দিদি তল্লাস করেছিল তাই
কথা থামিয়ে দিয়ে সত্য বলে ওঠে, সেই ঘেন্নাতেই গলায় দড়ি দিতে ইচ্ছে হচ্ছিল আমার।
তার মানে?
মানে ভেবো খেয়ে দেয়ে নিশ্চিন্দি হয়ে। এখন চান কর গে।
থাম! বলি দোষটা কি করেছে দিদি? স্বামী তো বটে?
তা তো নিশ্চয়।
তবে? নবকুমার সোৎসাহে বলে, মুখুয্যেমশাই যা বললেন, তাতে বুঝলাম ওঁর দুঃখটা। আর যাই হোক লোকটা কপট নয়। বললেন, একসময় দোষ ঘটেছিল ঢের, কুসঙ্গে পড়ে নেশাভাঙ কুকর্ম কিছুই বাকী রাখি নি ভায়া, সতী-সাধ্বীকে লাঞ্ছনাও করেছি। কিন্তু পরে চৈতন্য হয়েছে।
সত্য নিরীহ গলায় বলে, হয়েছে বুঝি!
হয়েছে বৈকি। এখন তো ঐ তামাকটুকু ছাড়া আর কোনো নেশাই নেই। তাই বলছিলেন, কত ইচ্ছে হয়েছে গিয়ে ক্ষমা চাই, মামার পায়ে ধরে চেয়ে আনি কিন্তু লজ্জায় পারি নি। তা তোমার দিদি যেকালে আগু বাড়িয়ে লজ্জাটা ভেঙ্গে দিল, তাতে
