হাঁস-মুরগীর পালের সংসার হলেও, ভদ্রলোক নিজের তোয়াজটি ভালই বাগিয়ে নেন সন্দেহ নেই। সদুদির সতীনকে মনে মনে একপ্রকার ব্যাঙ্গাত্মক তারিফ করে সত্য।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
মুকুন্দ হুঁকো টানছেন, সত্য উৎকণ্ঠিত দৃষ্টিতে সদরের দরজার দিকে তাকিয়ে আছে, আর বেচারা সরল মনে মনে কাঠ হয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে উদ্যত বজ্রের নীচে প্রতীক্ষারতের মত। এই লোকটা চলে যাওয়ার পর যে তাদের বিচার হবে সে বিষয়ে সন্দেহ নাস্তি।
প্রতীক্ষার মুহূর্ত দীর্ঘ। সত্যর মনে হয় নবকুমার যেন কতকাল বাজারে গেছে। আর তুড়ুটাও কম দেরি করছে না। ময়রার দোকান তো এই কাছেই।
নীরবতা ভঙ্গ করলেন মুকুন্দ।
বলেন, তা তোমার ননদ ঠাকরুণই বোধ হয় মামা-মামীর সেবা করছে?
কণ্ঠে যেন একটু চাপা অসন্তোষ। সত্য আস্তে বলে, উনিই তো কাছে আছেন বরাবর।
তা থাকতেই হবে, বেটা বেটার-বৌ যখন উড়তে শিখেছে। কিন্তু স্বামীর সংসারের প্রতিও তো একটা কর্তব্য আছে? এই তো আমার ঘরে, সংসারটা একটা মানুষ বিহনে ফুটোনৌকার তুল্য। দ্বিতীয় পক্ষটি তো আমার হঘড়ি আঁতুড়ুঘরে ঢুকতে ওস্তাদ, বাচ্ছা-কাচ্ছাগুলোর হাড়ির হাল। এখন বড় গিন্নী এসে থাকলে সবদিকই রক্ষা হয়, আর তারও
বোধ করি নিতান্তই অসহ্য বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল বলে সত্য এতগুলো কথা বলবার অবকাশ দিয়েছিল লোকটাকে, কিন্তু স্তব্ধতার ঘোর কাটল। আর লোকটা যে সদ্য আগন্তুক এবং হিসেবমত গুরুজন, সে কথা বিস্মৃত হয়ে মৃদু হলেও তীব্রস্বরে বলে উঠল, আপনার অবিশ্যি সবদিক রক্ষে হয়, বিনি মাইনের রাঁধুনী-চাকরানী-ঘরুনী সব পেয়ে যান, কিন্তু তার কী উপকারটা হবে শুনি?
মুকুন্দ মুখুয্যে ক্ষণকালের জন্য থতমত খেয়ে যান, কারণ এ হেন তীব্রতার মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে এ কল্পনা নিশ্চয় ছিল না তার, তবে আত্মস্থ হতেও দেরি লাগে না। সেই আত্মস্থ ভঙ্গীতে মৃদু হাস্যের প্রলেপ লাগিয়ে বলেন, শালাবাবুর আমার পরিবার-ভাগ্যিটি তো দেখছি বেশ ভালই। একে রূপসী তায় বিদুষী, নাটক নভেল পড়ার অভ্যেস আছে বোধ হয়! তা জিজ্ঞেসই যদি করলে তো বলি, উপকারের কিছু না হোক পরকালের কাজটাও তো হবে? মামার ঘরে দাস্যবিত্তি করার চাইতে স্বামীর ঘরে দাস্যবিত্তি কিছু আর অপমান্যির নয়?
সত্য উঠে দাঁড়ায়, ধীর স্বরে চেষ্টা করে বলে, মেয়েমানুষের কোনটা মান্যের আর কোনটা অমান্যের সে জ্ঞান থাকলে আর এ কথা বলতে পারতেন না। তবে ঠাকুরঝি যে আপনাকে ত্যাগ দেয় নি, আপনিই ত্যাগ দিয়েছেন তাকে, জানা আছে আমার সে কথা। এখন সংসারে ঝিয়ের দরকার হয়েছে বলে তার পরকালের চিন্তা নিয়ে মাথা ঘামাতে এসেছেন–
যতই ধীরভাবে বলতে চেষ্টা করুক, তবু উত্তেজনায় মুখটা লাল হয়ে ওঠে সত্যর। আর এ উত্তেজনা শুধু ওই চোখের চামড়াহীন বর্বরটার নিলর্জতাতেই নয়, সদুর নির্লজ্জতাতেও। এই হতচ্ছাড়া লোকটাকে এসব কথা বলার সুযোগটাও তো সদুই দিয়েছে।
মুকুন্দ মুখুয্যে এর উত্তরে কী বলতেন অথবা সত্য কিভাবে কথা শেষ করত কে জানে, বাধা পড়লে পিতা-পুত্রের আগমনে। সাধন এসেছে রসগোল্লা নিয়ে, সঙ্গে সঙ্গে নবকুমারও। পথে বাবার সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ায় সমাচারটা জানিয়ে দিয়ে অবহিত করিয়ে এনেছে সাধন। বাবার দেখা পেয়ে যেন আপাতত বেঁচেছে বেচারা, সরাসরি মার মুখোমুখি দাঁড়াতে অন্তত কিছুটা বিলম্ব হবে।
নবকুমার অবশ্য গুরুজন এবং দুর্লভ কুটুম্বর সম্মান জানে। শশব্যস্তে হাতের জিনিস নামিয়ে হেট হয়ে পায়ের ধুলো নিয়ে সস্মিত বচনে বলে, কী ভাগ্য আমার, পায়ের ধুলো পড়ল এতদিন পরে! কতক্ষণ এসেছেন?
সত্য ততক্ষণে রসগোল্লার ভাঁড় নিয়ে ঘরে ঢুকে গেছে। মুকুন্দ অন্তরালবর্তিনীর কর্ণগোচর হতে পারে এমন উদাত্ত স্বরে উত্তর দেন, তা এসেছি অনেকক্ষণ! এতক্ষণ হাঁ হয়ে বসে তোমার বিদুষী পরিবারের লেকচার শুনছিলাম। কলকেতারই মেয়ে বুঝি? মেমের কাছে লেখাপড়া শেখা?
লজ্জায় মাথাটা হেঁট হয়ে যায় নবকুমারের, মুখটা টকটকে হয়ে ওঠে। আর সত্যর প্রতি অপরিসীম ক্রোধে যেন হতবাক হয়ে যায়।
আস্পদ্দার কী একটা সীমা নেই? কথা বলতে জানে বলে যাকে যা ইচ্ছে বলবে? অতবড় বুড়ো ননদাই, তাও আবার চিরদিনের অদেখা, তার সঙ্গে তো কথা কইবারই কথা নয়, ঘোমটা দিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়বার কথা, তা নয়, এমন কথা শুনিয়েছেন বসে বসে যে এই উপহাসের জুতোটি খেতে হল নবকুমারকে।
ছি ছি!
কিন্তু এখন হচ্ছে মনের রাগ মনে চাপা, কিল খেয়ে কিল চুরি। জুতোটাকে বোনাইয়ের রসিকতা বলে ধরে নিয়ে হেঁ হেঁ করে হাসা।
সেই হাসিই হাসতে থাকে নবকুমার এবং সত্য নিঃশব্দে রসগোল্লার রেকাবি আর জলের গ্লাসটা নামিয়ে বাজারের ধামাটা তুলে নিয়ে ঘরে চলে গেলে বোনাই নিজেই যখন রেকাবিটি হাতে উঠিয়ে ব্যঙ্গ হাস্যে বলেন, জুতো মেরে গরুদান? তা মন্দ নয়। যাক, বামুন মুচি-বাড়িতেও লুচি খেতে ছোটে- তখনও নবকুমার সেই হেঁ হেঁ হাসি হাসতে থাকে। বরং মাত্রাটা আরো বাড়িয়ে দেয়।
অতঃপর সত্য আর বেরোয় না।
ছেলে দুটো গুটি গুটি ঘরে ঢুকে বই নিয়ে পড়তে বসে।
নবকুমারের সঙ্গেই অনেকক্ষণ কথা চালান মুকুন্দ।
সুহাসিনী বাড়িতে নেই, রবিবার সকালে সে পাশেরই এক বড়লোকের বৌয়ের কাছে লেস বোনা শিখতে যায়। বৌটির ছেলেমেয়ে নেই, বাড়িতে প্রচুর চাকরদাসী, স্বামীটি রবিবার হলেই সক্কাল থেকে তাসের আড্ডায় চলে যায়, অতএব রবিবার সকালে তো বটেই, এমনিতেও বৌটির অফুরন্ত অবকাশ।
