পাঠোদ্ধার করে যেন স্তব্ধ হয়ে যায় সত্য। এই সৌদামিনী দেবী কোন সৌদামিনী? সেই তাদের সদুদি? সেই সদুদি নিয়ত ভগবানের কাছে সেই লোকটার কুশল প্রার্থনা করে? এই বেঁটে-খাটো খাটমুগুরে গড়নের আধবুড়ো লোকটার?
এও কি সম্ভব?
সৌদামিনী বিধবা নয় এইটুকু মাত্র জানা যেত ভাত খেতে বসার সময়। হেঁসেলের ভাতটা নিয়ে বসত সে মামীর সঙ্গে, ভাই-বৌয়ের সঙ্গে, মাছের ভাগটা নিয়ে। এই যা।
তা ছাড়া আর কখনো কোনদিন কোন সময় টের পাওয়া যেত না সদুর স্বামী আছে। আশ্চর্য! আশ্চর্য! মানুষ কী অদ্ভুত জীব গো! শুধু মনে থাকাই নয়, স্বামীর সংবাদের জন্য উতলা হয় সে! এতই হয় যে মান-মর্যাদা জলাঞ্জলি দিয়ে চরণ্যের দাসী সাক্ষরিত চিঠি পাঠায়।
এ কী দীনতা!
এ কী দুর্বলতা!
বয়সকালে চিরদিন স্থির থেকে এখন এই ভাঁটা-পড়া বয়সে এমনই অস্থির হল যে মান-অপমান জ্ঞান হারাল?
সৌদামিনীর এই পদস্খলন যেন সত্যবতীর মাথাটা লুটিয়ে দিল।
পদস্খলন!
হ্যাঁ, পদস্খলনই মনে হল সত্যবতীর। আর অকস্মাৎ তার বড় একটা যা না হয় তাই হল, দুই চোখ জলে ভরে উঠল।
তবু কষ্টে নিজেকে সামলে মাথার কাপড়টা আর একটু বাড়িয়ে সত্য বড় ননদাইয়ের পায়ের ধুলো নিয়ে শান্তস্বরে বলে, মনে কিছু করবেন না, চেনা-জানা তো নেই কখনো। দাওয়ায় উঠে বসুন। তিনি বাজারে গেছেন, এসে পড়বেন এখনই।
গুরুজনদের সামনে “উনি” বলাটা অশোভন, তাই “তিনি” বলে সত্যবতী।
অবশ্য তাতে বুঝতে অসুবিধে হয় না, সংসার করে ঝানু হয়ে যাওয়া মুকুন্দ মুখুয্যের। এতক্ষণে তিনি শালাবৌয়ের আচরণে প্রীত হন এবং প্রণতাকে থাক থাক্ করে সৌজন্য দেখিয়ে গর্বিত ভঙ্গীতে উঠে গিয়ে দাওয়ায় পাতা জলচৌকিতে আঁকিয়ে বসেন।
সত্যবতীর চোখের ইশারায় ছেলেরাও তাদের নবলব্ধ পিসেমশাইকে প্রণাম করে এবং চোখের ইশারাতেই তামাক সেজে আনতে যায় সরল। যদিও নবকুমার তামাক খায় না, তবুও তামাকের পাটটা বাড়িতে রেখেছে সত্যবতী অতিথি-অভ্যাগতদের জন্য।
আপ্যায়ন করতে হবে বৈকি!
পিতৃঋণ মাতৃঋণ দেবঋণ গুরুঋণ! তা অলক্ষ্য জগতের, আর তার শোধের কথা তো কথার কথা। আসলে কুটুম্ব-ঋণের তুল্য ঋণ নেই, আর তার শোধটা নিতান্তই প্রত্যক্ষ বাস্তব। দুর্লজ্জ নীতিকে লঙ্ন করবে সত্য, লোকটা কুটুম্ব নামের অযোগ্য বলে?
তা পারে না?
এখন আর পারে না।
এ সেদিনের সেই কিশোরী সত্যবতী নয়, একদা যে শ্বশুরকে অপবিত্র জ্ঞান করে তার পূজোর গোছ করে দিতে অস্বীকৃত হয়েছিল। এ সত্যবতীর অনেক বাস্তববুদ্ধি হয়েছে। এখনকার সত্য জানে কতকগুলো ব্যাপারকে মনের সঙ্গে রফা করতে না পারলেও, বাইরে খানিকটা রফা করে নিতে হয়। নইলে অসামাজিকতা অভদ্রতা ইত্যাদির দায়ে পড়তে হয়। সংসার যখন করতে বসেছে, সামাজিকতার দায় পোহাতে হবে বৈকি।
তাই একটা নিঃশ্বাস ফেলে রান্নাঘরে ঢুকে উনুনে চাপানো হাঁড়িটা নামিয়ে রাখে। তারপর বড়ছেলেকে হাতের ইশারায় ঘরে ডেকে তার হাতে রসগোল্লা আনবার পয়সা দিয়ে ঘরের দরজার কাছে এসে বসে। সেখান থেকে সরাসরি না হলেও ননদাইকে অবলোকন করা যায়।
নবকুমার যতক্ষণ না ফিরছে, ততক্ষণ এই বন্ধন-যন্ত্রণা সইতেই হবে তাকে।
হুঁকোয় একটি সুখটান দিয়ে মুকুন্দ মুখুয্যে রাশভারী গলায় প্রশ্ন করেন, কতদিন হল বাসা করে থাকা হয়েছে?
সত্য মৃদুস্বরে বলে, অনেক দিন। সাত-আট বছর।
বল কি? তখন তো তুমি প্রায় কাঁচা যুবতী গো! তা বুড়ো-বুড়ী যে মত দিল? নাকি মরেছে তারা?
সত্যর ইচ্ছে হয় মুখের সামনে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে বসে থাকে গুম হয়ে। কিন্তু করে। সংক্ষেপে বলে, আছেন। মত না দিলে চলবে কেন? ছেলেদের লেখাপড়া।
হুঁ, তা বটে। একালে তো আর পাঠশালে পড়া বিদ্যেয় চলবে না। তা মাত্তর ওই দুইটি নাকি? কুচোকাঁচা দেখছি নে তো!
২৬৪
এ কথার আর উত্তর কি দেবে সত্য, চুপ করেই থাকে। আর হয় নি এটা বলতেও বুঝি কোথায় কাঁটার মত একটু বাধে। অদৃশ্য সেই কাটাটা বুঝি আস্তে আস্তে অবয়ব নিচ্ছে এক নিভৃত অন্ধকারে।
মুকুন্দ কিন্তু নাছোড়, ফের বলেন, বাপের সঙ্গে বেরিয়েছে বুঝি?
এ প্রশ্নের উত্তরটা সরলই দিয়ে ফেলে, আমরা শুধু দুই ভাই।
মুকুন্দ যে এর মধ্যে নিরে কী “ভাল” আবিষ্কার করেন কে জানে, সস্মিত মুখে বলেন, তা ভাল! আপদের শান্তি! এ দিব্যি ঝাড়া-হাত-পা-হয়ে যাওয়া। এখন তীর্থ কর ধর্ম কর, দস্যিবিত্তি করে সংসার কর, কোনো বালাই নেই। বাবাঃ, আমার ঘরের এণ্ডিগেণ্ডিগুলো দেখলে আমার মাথা কেমন করে! মানুষের ছাঁ তো নয়, যেন হাঁস-মুরগীর পাল?
এবার বোধ করি সত্য বিরক্ত হতেও ভুলে যায়, চমৎকৃত হয়েই তাকিয়ে থাকে। বেটাছেলেতে যে এমন ধরনের কথা কইতে পারে এ তার জানা ছিল না। তার বাপের বাড়ির দেশে অনেককে দেখেছ সে, মেয়েলী বেটাছেলেও দেখেছে, দেখেছে নীলাম্বরকে, নবকুমারকে, সত্যর আদর্শ অনুযায়ী ‘পুরুষ বেটাছেলের’ রূপ কোথাও দেখে নি সত্য, কিন্তু এ কী!
গ্রামের গাইয়ামির মধ্যেও এক ধরনের শোভন-সভ্যতা আছে, এই শহুরে গেঁয়োটাও এক কথায় বিশ্রী কুৎসিত!
অথচ দেখলে বোঝা যায় লোকটা এককালে ‘সুপুরুষ’ বলেই গণ্য হত। একটু বেঁটে, তবে রংটি হর্তেলের মত, মুখাকৃতি দিব্য, কাঁচা-পাকা হলেও চুলে কেয়ারি আছে, আর সর্ব অবয়বে তোয়াজের চিহ্নটি পরিস্ফুট।
