শুনে সত্যবতী হাঁ।
এইমাত্র নবকুমার বাজারে গেল, আর এখন এই ঝামেলা! কে জানে লোকটা কে! কোন বদবুদ্ধি লোক না বাসা ভুল করে–সেই কথাটাই বলে সত্যবতী, ছেলেদের মাধ্যমে মাত্র করে, তুড়ু বল, আপনি বোধ হয় বাসা ভুল করেছেন–
বাসা ভুল!
ভদ্রলোক হেসে উঠলেন, মুকুন্দ মুখুয্যে এত কাঁচা ছেলে নয় যে উচিতমত তল্লাস না করে কারুর অন্দরে ঢুকে পড়বে। দস্তুরমত পাড়ার লোককে শুধিয়ে সঠিক জেনে তবে ঢুকেছি। বলি তুমি বারুইপুরের নীলাম্বর বাঁড়ুয্যের ব্যাটা নবকুমার বাঁড়ুয্যের পরিবার নয়? অস্বীকার কর?
বলে আপন রসিকতায় হেঁ হেঁ করে টেনে টেনে হাসতে থাকেন।
কথার ভাষা এবং ভঙ্গিমা এমনি অমার্জিত যে, রাগে আপাদমস্তক জ্বলে যায় সত্যবতীর। নিঃসন্দেহে যে কোন বদলোক, নামটা পরিচয়টা সংগ্রহ করে বাড়ি ঢুকে ভয় দেখাতে চায়।
চাক। সত্য বামনীকে চেনে না।
দৃঢ় আর বিরক্ত স্বরে বলে ওঠে সত্যবতী, তুডু বল, পাড়া-পড়শীকে শুধিয়ে কারুর নাম পরিচয় জানা এমন কিছু কঠিন কাজ নয়। আমরা ও নামে কাউকে চিনি না, উনি যেতে পারেন।
কিন্তু মুকুন্দ মুখুয্যে এত সহজে অপমানিত হন না। হাস্যকণ্ঠ বজায় রেখেই বলেন, চেনো না তা সত্যি! জানার সুযোগ আর ঘটল কই? তোমার ননদ ঠাকরুণ তো আমাকে ত্যাগ দিয়ে নিশ্চিন্দি আছেন। তা এতদিন পরে বিস্মরণ রাজার স্মরণ হল কেন, সেই কথা শুধোতেই আসা। কিন্তু খোকারা, তোমরা একেবারে চুপটি মেরে মুখটি সেলাই করে বসে আছ যে? সেদিন অত আলাপ পরিচয় হল, চিঠি পৌঁছে দিলে, আর আজ যেন চিনতেই পারছ না! মাকে বুঝি বল নি? তাই উনি ‘সোবে’ করছেন লোকটা গুণ্ডা বদমাশ!
এতক্ষণ তাই-ই ভাবছিল বটে সত্যবতী, কিন্তু ভদ্রলোকের শেষ কথাটায় যেন অকূল সমুদ্রে পড়ে।
এসব কি কথা!
বিন্দুবিসর্গও তো বুঝতে পারছে না সত্যবতী। নিজের ছেলেদের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল। সেখানে স্পষ্ট অপরাধীর ছাপ। কী এ?
লোকটা কি বারুইপুরের কেউ?
তুড়ু খোকা যখন দেশে গিয়েছিল তখন দেখেছে এখন চিনতে পারছে না? কিন্তু চিঠি কিসের? ভগবান জানেন বাবা! একেই তো শ্বশুরবাড়িতে সত্যর নাম জাঁহাবাজ বৌ, আবার এককাঠি বাড়ল বোধ হয় সে বদনাম। ছেলে দুটো যেভাবে শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে আছে, তাতে সন্দেহ নেই ঘটেছে কিছু।
কিন্তু তথাপি মুখে হারে না সত্য। দৃঢ় হলেও একটু নরম সুরে বলে, খোকা বল, বাড়ির পুরুষজন এখন বাড়ি নেই, আপনি একটু ঘুরে আসুন। যা বলবার তাঁকেই বলবেন।
মুকুন্দ মুখুয্যে এবার একটু গম্ভীর হন। বলেন, বলবার আমার কিছুই ছিল না। তবে আপনার ননদ ঠাকরুণ শ্রীমতী সৌদামিনী দেবী হঠাৎ তার ত্যাগ দেওয়া স্বামীকে একখানা পত্তর কেন দিলেন, তারই তল্লাস করতে
ঠাকুরঝি পত্র দিয়েছেন। আপনাকে! মানে আপনি
যাক এতক্ষণে চিনলে? বাবাঃ, কোথায় ভেবেছিলাম শালার বাড়িতে এসে একটু জামাই-আদর পাব, তা নয়–
কিন্তু ঠাকুরঝি চিঠি লিখেছেন! সত্য আরক্ত মুখে বলে, আমার বিশ্বাস হচ্ছে না–অসম্ভব।
মুকুন্দ মুখুয্যে কথাটার অন্য অর্থ ধরেন। বলেন, আহা, নিজে হাতে কি আর লিখেছে? কাউকে ধরে লিখিয়েছে নিশ্চয়। এই তো তোমার এই খোকারাই দিয়ে এল পরশুদিনকে
আমার খোকারা? পরশুদিনকে?
সত্যবতীও বিচলিত হয়।
বিচলিত স্বরে বলে, তুড়ু! খোকা!
তুড়ু-খোকার নত বদন, যে বদনে অপরাধের কালিমা।
সত্য যেন একটু অসহায়তা অনুভব করে, আর এই প্রথম বোধ কবি নবকুমারের অনুপস্থিতিতে কাতরতা বোধ করে। মুকুন্দ মুখুয্যের চোখে সত্যর এই বিচলিত ভাবটা ধরা পড়তে দেরি হয় না। এবং ব্যাপারটা অনুধাবন করতেও দেরি হয় না। ছেলেমানুষদের যা হোক বুঝিয়ে চিঠিটা সৌদামিনী চুপিচুপিই পাঠিয়েছে। আগে এটা বুঝলে মুকুন্দ মুখুয্যে অন্যভাবে নিজেকে উপস্থাপিত করতেন। ছেলে দুটো থতমত খেয়ে যাচ্ছে, যাবেই তো, মা জননীটি যে খাণ্ডারনী তা তো বোঝাই যাচ্ছে। বাবাঃ, যেন পুলিসের ধমক!
কিন্তু মুকুন্দও পুলিসের বাবা।
আটঘাটটি বেঁধে তবে এসেছেন। চিঠিটা সঙ্গে এনেছেন। তবে ভদ্রলোকের ধারণায় একটু ভুল ছিল। ভেবেছিলেন সৌদামিনী নিশ্চয় কলকাতায় ভাইয়ের বাসায় এসেছে, আর ভাইপোদের সেটুকু চেপে যেতে বলেছে। নইলে সাতজন্মে যে কখনো কোন বার্তা দিল না, সে কেন হঠাৎ…, কিন্তু ধারণাটা ভুল তা তো বোঝাই যাচ্ছে। সৌদামিনী এখানে নেই!
সত্যি তবে কেন হঠাৎ?
সে চিন্তা যাক। ফতুয়ার পকেট থেকে সৌদামিনীর সেই গোপনতম দুর্বলতার ইতিহাসটুকু বার করে মেলে ধরেন মুকুন্দ মুখুয্যে দাওয়ার ধারে মেজেয়। আর দেখে এক মুহূর্তেই চিনে ফেলে সত্য– হাতের লেখাটা তারই বড় ছেলের। অর্থাৎ তুড়ুকে দিয়েই লিখিয়েছে সৌদামিনী।
সমস্ত ঘটনাটা স্পষ্ট হয়ে যেতে দেরি হয় না আর। দিনের আলোর মত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শুধু নিজের ছেলেদের এই দুর্বোধ্য আচরণটা অন্ধকারেই থেকে যায়। সত্যবতীকে বিন্দুবিসর্গ না জানিয়ে এত কাণ্ড করবার সাহস কি করে হল ওদের?
পড়ে থাকা চিঠিখানিতে চোখ ফেলা মাত্রই পাঠোদ্ধার হয়ে গেছে, কারণ অক্ষরের ছাঁদ আর তার প্রতিটি টান, প্রতিটি বাঁক তো সত্যবতীর মুখস্থ।
না, প্রেমপত্র নয়, ভাইপোকে দিয়ে লেখানোর আপত্তির কিছুই নেই। সৌদামিনী লিখেছে– পরম পূজনীয় শ্রীচরণকমলেষু–
বহুকালাবধি আপনার কোনো সংবাদাদি জানি না, আপনিও সংবাদ নেন না অধীনা জীবিত
কি মৃত। আমার কথা থাক, আপনার সংবাদ পাইতে ইচ্ছা হয়। আমার ভ্রাতা নবকুমার
কলিকাতায় বাসা করিয়া আছে, তাহার সহিত সাক্ষাৎ হইলে জানিতে পারি। ইহারা নবকুমার
ভাইজীবনের পুত্র সাধনকুমার ও সরলকুমার। পত্রদানের ধৃষ্টতা মার্জনা করিবেন।
অধিক কি লিখিব! ভগবানের নিকট নিয়ত আপনার কুশল প্রার্থনা করি।
শতকোটি প্রণামান্তে
চরণের দাসী
শ্ৰীমতী সৌদামিনী দেবী।
