সে বোধহয় ননদের ভয়ে।
ইঃ, ভারী আমায় ভয়! মায়ার চেয়ে ভয় বড় হল?
পরে অনেক সময় ভেবেছেন রামকালী, সত্যি মার জন্যে তো একটুও মন কেমন করত না। তাঁর। বরং কবিরাজ-গৃহিণী যখন অসুখে পড়তেন আর শেষে যখন মারা পড়লেন, লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদে কেঁদে শিরঃপীড়া জন্মে গিয়েছিল।
কেন এমন হয়েছিল?
রামকালী নিষ্ঠুর?
তার মা-বাপই স্নেহহীন?
বাপের সম্পর্কে এক কথায় রায় দিয়ে দিলেও মায়ের সম্পর্কে সে রায় দিতে একটু বাধতে। হয়তো বিবেকেই বাধতো।
কিন্তু জীবনের এই শেষপ্রান্তে এসে যখন জীবনটাকে ওই ফেলে আসা গঙ্গার স্রোতের মতই সম্পূর্ণ আর স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন, তখন রামকালী নিঃশ্বাস ফেলে ভাবলেন, ভালবাসা জীবনে সেই একবারই লাভ করেছিলেন।
সেই এক প্রৌঢ়া দম্পত্তির কাছে।
সারা জীবনের অনেক পেয়েছেন রামকালী, শ্রদ্ধা সমীহ ভয় ভক্তি, ভালবাসা পান নি। সবাই তাকে দূরে রেখেছে, দূরে থেকে প্রণাম জানিয়েছেন।
রামকালীর নিজেরই দোষ।
দূরত্বের গণ্ডি নিজেই রচনা করেছেন তিনি। ইচ্ছে করে নয়, স্বভাবে।
কোনদিন কি ভাবতে পেরেছেন তিনি, গ্রামের কোনো কাজকর্মে তিনি ব্রাহ্মণভোজনের সারিতে পাত পেতে বসেছেন? ভাবতে পেরেছেন তিনি কোথাও দান নিচ্ছেন? ….কারো চণ্ডীমণ্ডপে বসে গালগল্প করছেন? তাস-পাশা খেলছেন?
ভাবলে হাসি পাবে কি, ভাবতেই পারেন নি।
অথচ গ্রামের অনেক কুলীন সন্তানই এমনি সাধারণের ভূমিকায় জীবন কাটাচ্ছেন।
কৌলীন্যটার সত্যকার বাস তবে কোথায়?
কিন্তু আজ সংসারকে পরিত্যাগ করে যাবার সময় হঠাৎ মনে হচ্ছে রামকালীর, সারা জীবন বিজয়ীর ভূমিকা নিয়ে কাটালাম, কিন্তু সত্যি কি বিজয়ী হতে পেরেছি?
তা হলে কেন মনে হচ্ছে, ভয়ানক একটা লোকসানকে টেনে এনেছেন তিনি সারাজীবন ধরে?
লোকসানটা কী? পরাভবটা কোথায়?
লোকসানের কথা ভাবতে অপ্রাসঙ্গিক একটা কথা মনে এল রামকালীর। কিংবা অপ্রাসঙ্গিক নয়।
সত্য বড় আক্ষেপ করে বলেছিল, এই খেদ রয়ে গেল বাবা, তোমায় একদিন বেঁধে খাওয়াতে পারলুম না!
আচ্ছা কতটুকু ক্ষতি হত রামকালীর, যদি সত্যর এই খেদটুকু না রাখতেন? নিয়মের সেই সামান্যতম হানির লোকসানটাই কী মস্ত একটা লোকসান হত?
রামকালী তাঁর জীবনে যে বস্তুকে পরম মূল্য দিয়ে এসেছেন, সত্যিই কি সেটাই মূল্যের শেষ কথা?
যদি তাই হয়, তবে কেন বার বার ভুবনেশ্বরী অদ্ভুত এক বিজয়িনীর হাসি হেসে চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়?
কেন বলে, জীবনে তো অনেক পেলে, পাওয়ার গৌরবে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে দেখ নি, কিন্তু আসল ঘরটাই যে ফাঁকা পড়ে রইল তোমার, সে হিসেব কছে কোন দিন? কর্তব্যই করলে চিরকাল, ভালবাসতে পারলে কাউকে?
মনের মধ্যে ডুব দিয়েছেন রামকালী।
ভালবাসা? কার জন্যে সঞ্চিত থেকেছে?
সত্যর মুখ ছাড়া আর কোনও মুখ-চোখ ভেসে উঠছে না।
আর সব যেন জীবে’র প্রতি করুণা।
সত্য আছে হৃদয়ের নিভৃতে অনেকখানি জায়গা দখল করে। কিন্তু সেটুকু কি সত্যকে কোনদিন জানতে দিয়েছেন রামকালী? জানানো দুর্বলতা ভেবে অনবরত বালি চাপা দিয়ে আসেন নি কি?
হঠাৎ দুর্গা দুর্গা করে উঠলেন রামকালী। ছেড়ে দেওয়া মনকে যেন বেঁধে ফেললেন। বললেন, ওহে, মুঙ্গের পৌঁছবে কখন নাগাদ?
মাঝি বলল, আজ্ঞে কর্তা, এই তো এসে পড়লাম বলে—
আচ্ছা ভাল। কষ্টহারিণীর ঘাটে নৌকো বাধবে।
৪০. সরল পিসির কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি
সাধন সরল পিসির কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে নি, তবু সবই প্রকাশ হয়ে পড়ল। প্রকাশ হয়ে পড়ল সদুর দীনতা, আর তার ভাইপোদের মিথ্যা কথা।
কাঁচা পাকা চুল, বেঁটে খাটো শক্ত সমর্থ চেহারার যে ভদ্রলোকটির বাসা খুঁজে খুঁজে সেদিন পিসির দেওয়া চিঠিখানা পেশ করে এসেছিল ওরা, সেই ভদ্রলোক তার পরের রবিবারের সকালে এদের এখানে এসে হাজির হলেন।
এ হেন সম্ভাবনার কথা স্বপ্নেও মনে আসে নি ওদের। অবশ্য সেদিন এস্ত শঙ্কিত পলায়নপর ছেলে দুটোকে প্রায় জোর করে দাঁড় করিয়ে তাদের নাম কি, দেশ কোথায়, কলকাতায় বাসা কোন রাস্তায়, ইত্যাদি পক্ষানুপুঙ্খ জেনে নিয়েছিলেন ভদ্রলোক, তথাপি সেটাকে নিছক কৌতূহল ছাড়া কিছু ভাবে নি ওরা দুই ভাই।
সন্দেহমাত্র করে নি, দু-দিন না যেতেই কৈ গো খোকারা বলে এসে হানা দেবেন।
এ যেন বিনা মেঘে বজ্রাঘাত।
ভয়ে প্রাণ উড়ে গেল ওদের।
সভয়ে পরস্পর মুখ-চাওয়াচাওয়ি করল দু ভাই, তারপর সরল নিঃশব্দে দুটো হাত উল্টে এমন একটা বেপরোয়া ভঙ্গী করল, যার অর্থ দাঁড়ায়–তা আমাদের কি দোষ? আমরা তো ওনাকে আসতে বলি নি, পিসি বারণ করে দিয়েছিল তাই না
কিন্তু
এটাও বিনা শব্দে শুধু চোখের ইশারায় উচ্চারিত হল, কিন্তু আমরা সেদিন মিছে কথা বলেছি। মা যখন বলল, ইস্কুল থেকে ফিরতে দেরি কেন, তখন বলেছি ইস্কুলে বল খেলা ছিল।
কিন্তু এত সব ভাববিনিময় মুহূর্তেই ঘটল, কারণ ইত্যবসরেই ভদ্রলোক বাড়ির চৌকাঠ ডিঙিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়িয়ে বাজখাঁই গলায় পুনঃপ্রশ্ন করেছেন, খোকারা বাড়ি নেই নাকি? এবং সত্যবতী মাথার কাপড় টেনে রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এসে স্পষ্ট গলায় উচ্চারণ করেছে, তুড়ু, দেখ তো কে? জিজ্ঞেস কর কাকে চান?
তুড়ুকে আর কষ্ট করে জিজ্ঞেস করতে হল না, যার কানে যাবার স্বচ্ছন্দেই গেল। আর তিনি সহাস্যে এগিয়ে এসে উত্তর দিলেন, ননদাই গো ননদাই, আপনি হচ্ছেন শ্যালাজ ঠাকুরুন?
