ভাগ্যের প্রতিকূলতায়?
এইখানেই কোথায় যেন একটা খোচ। অনেকবার ভেবেছেন রামকালী, ভাগ্য ছাড়া আর কি? মানুষ তো নিমিত্ত মাত্র, কিন্তু সে বিশ্বাসে অটুট থাকতে পারেন নি।
যাক, তবু সকলের যথাসাধ্য সুব্যবস্থা করে এসেছেন রামকালী, এখন যার যা নিয়তি। তথাপি অনেকগুলো মুখ যেন হতাশ দৃষ্টি মেলে তাকাচ্ছে রামকালীর দিকে। যেন বলছে…ফেলে চলে গেলে আমাদের?… সত্যি!… কই যাবে এ কথা তো বল নি কোনদিন? আমরা যে বড় নিশ্চিন্ত ছিলাম।
এই মুখগুলোর মধ্যে সারদার মুখটা বড় স্পষ্ট, সারদার চোখটা বড় তীব্র। হতাশা নয়, যেন সে দৃষ্টিতে অভিযোগ।
কিন্তু অনেক বছর আগে আর একবার যখন সংসার ত্যাগ করেছিলেন রামকালী?
তখন কি একবারও পিছনপানে তাকিয়েছিলেন? নাঃ, কী হালকা বন্ধনহীন মন নিয়ে সেই যাওয়া!
বৈরাগ্যের কারণটা নিতান্তই স্থল ছিল সত্যি, বাপের খড়ম থেকে সে বৈরাগ্যের উদ্ভব। রাগ দুঃখ অভিমান ক্ষোভ সব মিলিয়ে তীব্র একটা অনুভূতি যেন ঠেলে ঘরের বার করে দিয়েছিল সেই কিশোর বালককে, যাকে এখন যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন রামকালী।
ছেলেটা একখানা নৌকোর পাটাতনের মধ্যে ঢুকে বসে রইল সারটা দিন, কেউ তেমন লক্ষ্য করল না, একসময় ছেড়ে দিল নৌকো। ছেলেটা রইল ঘাপটি মেরে।
তারপর অনেকক্ষণের পর ধরা পড়ল।
তখন নৌকো অনেক এগিয়েছে।
রামকালী দেখছেন, মাঝি-মাল্লারা জেরা করছে ছেলেটাকে। ছেলেটা স্বচ্ছন্দে উত্তর দিচ্ছে–তার কেউ কোথাও নেই, গরীব ব্রাহ্মণসন্তান, ভাড়া-টাকা দিতে পারবে না, নৌকো যেখানে যাবে, সেখানে পর্যন্ত যদি তাকে দয়া করে নিয়ে যায় তারা।
অবস্থা বুঝেই মমতাবশতই হোক অথবা দেবকান্তি রূপ দেখেই হোক ছেলেটাকে তারা সমাদর করে নিয়ে গিয়েছিল মুকসুদাবাদ অবধি।
সেখানে মিলে গেল গোবিন্দ গুপ্তের আশ্রয়।
সে যেন ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ আশীর্বাদের মত।
সেই নিতান্তই কিশোর ছেলেটার মনে হয়েছিল পৃথিবীটা এত বড়! ভগবান এত দয়ালু। অথবা ইনিই ভগবান? পুরাণ উপপুরাণের গল্পের মত ছদ্মবেশ ধরে রামকালীকে কৃপা করতে এসেছেন।
গঙ্গার ঘাটেই বসেছিল ছেলেটা।
কবিরাজ স্নানে এসেছিলেন।
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, চিনছি না তো তোমাকে? কাদের ছেলে বাবা?
এখন ভেবে হাসি পাচ্ছে, রামকালী স্বচ্ছন্দে বলেছিলেন, তোমার সে খোঁজে দরকার কি?
দরকার কিছু আছে বৈকি! গোবিন্দ গুপ্ত একটু হেসে বলেছিলেন, কাদের ছেলে, কেন একা ঘুরে বেড়াচ্ছ, রীত-চরিত্তিরই বা কেমন এসব না জানলে চলবে কেন?
চলবে না?
না। ভিনগাঁয়ের ছেলেকে বিশ্বাস কি?
পরে জেনেছিলেন রামকালী, ওটা একটা চালাকি। রাগিয়ে দিয়ে পরিচয় আদায়ের চেষ্টা। কিন্তু সেদিন সেই ছেলেটার কথা বোঝবার ক্ষমতা ছিল না। সে তার ক্রুদ্ধ গলায় বলে উঠেছিল, বিশ্বাস করতে কে পায়ে ধরছে তোমায়? আমার ইচ্ছে আমি বসে আছি। ঘাট কি তোমার কেনা?
সেই সৌম্যদর্শন প্রৌঢ় ছেলেটার কথায় বেশ কৌতুক অনুভব করেছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। এবং ইচ্ছে করেই খানিকক্ষণ ধরে বাদবিতণ্ডা চালিয়েছিলেন মজা উপভোগ করতে।
তারপর কেমন করেই যেন সন্ধি হয়ে গেল। আর কেমন করেই যেন ছেলেটা আশ্রয় পেয়ে গেল তার কাছে।
কিন্তু শুধুই কি আশ্রয়?
নিঃসন্তান দম্পত্তির হৃদয় উজাড় করা ভালবাসার অধিকারী হয় নি সেই মুখর ছেলেটা?
আস্তে আস্তে সেই মুখরতা চপলতা সব অন্তর্হিত হয়ে স্থির শান্ত মেধাবী একটি ছাত্রে পরিণত হল সে। আর শুধু স্নেহেরই নয়, তাঁদের যথাসর্বম্বের উত্তরাধিকারী হয়ে উঠল।
আশ্চর্য! তবু এক দিনের জন্য নিজে হাতে রেঁধে খাওয়ান নি কবিরাজগৃহিণী। অন্য এক ব্রাহ্মণবাড়িতে খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
সমস্ত দৃশ্যগুলো যেন হঠাৎ চোখের উপর জ্বলজ্বলিয়ে উঠছে।
রামকালী আবদার করেছেন, জেদ করেছেন, আমি তো তোমাদের জাতেরই হয়ে গেছি বলে যুক্তি খাড়া করেছেন, কবিরাজ-গৃহিণী হাসিভরা মুখ আর চোখভরা জল নিয়ে বলেছেন, পাগলা ছেলে, তাই কখনো হয়?
তোমাদের তো পৈতে আছে বলেছিলেন রামকালী।
গোবিন্দ গুপ্ত হেসেছিলেন, আছে, তা সত্যি। তবে কি জানিস? সবেরই তো জাত থাকে? কেউটে গোখরো আর ঢোড়া বোড়া যেমন এক নয়, তেমনি তোর পৈতে আর আমার পৈতে এক নয়। তোকে তো আমার দত্তক নিতে ইচ্ছে করে, কিন্তু নিই না। কখন কি অপরাধ ঘটে কে জানে!
সেহের সঙ্গে শ্রদ্ধার এক আশ্চর্য সংমিশ্রণ!
রামকালী প্রথমে বলেছিলেন, আমার কেউ কোথাও নেই।
তারপর ধীরে ধীরে সবই প্রকাশ পেয়ে গিয়েছিল।
গোবিন্দ গুপ্ত বলতেন, দেখ, তোর মা-বাপকে খবর না দেওয়া আমার পক্ষে মহাপাপ হচ্ছে, তুই নিষেধ করিস না, আমি কোন প্রকারে খবর দিই।
রামকালী বলতেন, কেন? আমি বুঝি তোমার চক্ষুশূল হচ্ছি এবার? বেশ, পুণ্যির ভরা করে খবর দাও তুমি, দেখবে আবার পাখী ফুড়ুৎ!
কবিরাজ-গৃহিণী ষাট ষাট করে শিউরে উঠতেন। বলতেন, তুমিই বা পাপ-পাপ করে ব্যস্ত হচ্ছে কেন বাপু? ওর মা-বাপ, বুঝবে। ছেলের প্রাণ যদি মা বলে না কাঁদে, বুঝতে হবে মায়ের প্রাণে কোথাও ঘাটতি আছে।
মায়ের প্রাণে কি ঘাটতি থাকে বড়বৌ?
কবিরাজ বলতেন সহাস্যে।
রামকালী চড়ে উঠতেন। বলতেন, আচ্ছে। খুব আছে। আমাকে মা দু-চক্ষে দেখতে পারে না। নইলে পিসি যখন শাসন করে, তখন ইচ্ছে করে আমার নামে আরো লাগায়?
