নবকুমার বলে, তা নিরুপায় আর কি? ক’টা দিন নয় সুহাস চালিয়ে দিত, গেলেই পারতে! যে দুদিন না কাশী যান উনি, থেকে আসতে। বললে না তো?
সত্য আর একটা লজ্জা আর ক্ষোভ মেশানো নিঃশ্বাস ফেলে বলে, সংসার চালানোর কথা নয়। অন্য কথা। শরীরের অবস্থাই আমার মনে হচ্ছে ভাল নয়। জানি না বুড়ো বয়সে আবার কপালে কী গেরো আছে—
নবকুমার কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকে সত্যের সেই লজ্জা-বিক্ষুব্ধ বিপন্ন মুখের দিকে, খবরটা হৃদয়ঙ্গম করতে তার কিছুক্ষণ লাগে। তারপর অকস্মাৎ এক অপ্রত্যাশিত পুলকে রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে সে।
ওঃ, ভগবান!
এইবার তাহলে সত্যর পায়ে একটু ছেকল পড়বে। এই ছেকল পড়ার কথাটাই সবচেয়ে আগে মনে পড়ে নবকুমারের। আর তাতেই আহ্লাদ উথলে ওঠে। হঠাৎ সত্যর একটা হাত চেপে ধরে বলে, সত্যি?
আস্তে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে সত্য বলে, আহ্লাদে নাচবার কিছু নেই।
৩৯. ভরা দুপুর
ভরা দুপুর।
নৌকো মাঝগঙ্গায়।
দাঁড়টানার একটানা একটা শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। শুধু খানিক খানিক সময় অন্তর দাড়ি-মাঝিদের এক-একটা দুর্বোধ্য হুঙ্কার স্তব্ধ প্রকৃতিকে যেন চমকে চমকে দিচ্ছে।
নৌকোর আশেপাশে দাঁড়ের ধাক্কায় ভেঙে পড়া জলের বৃত্তরেখা, দূরে ঢেউ-খেলানো জলের রেশম চিকন গায়ে বাতাসের মৃদু কাঁপন।
সেই ঢেউ-খেলানো ঘি রঙ্গ রেশমী ওড়নার গায়ে হীরেকচি রোদের উজ্জ্বল সমারোহ।
রামকালী সেই সমারোহের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসেছিলেন।
ভরদুপুরের অচঞ্চল গঙ্গা, নৌকার গতি, মৃদু-মন্থর, তাই ভিতরে আলোড়ন নেই।
কিন্তু মনের ভিতরে?
যে মন ওই স্তব্ধ দেহদুর্গের মধ্যে চিরদিন সমাহিত থেকেছে?
না, আলোড়ন নয়, শুধু যেন সেই চিরসমাহিত মনটাকে আজ একটু মুক্তি দিয়ে ফেলেছেন রামকালী। ছেড়ে দিয়েছেন ইচ্ছেমত ঘুরে বেড়াবার জন্যে।
এই আটষট্টি বছর ধরে যে দীর্ঘ প্রান্তরটা পার হয়ে এলেন রামকালী, সেই প্রান্তরের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত অবধি পাক খেয়ে বেড়াচ্ছে সেই হঠাৎ ছাড়া পাওয়া মনটা।
এর আগে কোন দিন এমন করে স্মৃতি-রোমন্থন করেন নি রামকালী। আজ করছেন। হয়ত বা অজ্ঞাতসারেই করছেন।
আজ সংসারের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছেন রামকালী, পিঠ ফিরিয়েছেন তার দিকে। কিন্তু বিদায় গ্রহণের প্রাক্কালে কত ব্যবস্থা, কত হিসেবনিকেশ, কত নির্দেশ, কত বন্দোবস্ত।
গ্রামে যে টোলটি স্থাপন করেছেন, যে দুঃস্থ বিদ্যার্থী কজনের প্রতিপালনের ভার গ্রহণ করেছেন, একজন কবিরাজ বসিয়ে যে দাঁতব্য কবিরাজখানাটি প্রতিষ্ঠা করেছেন, গ্রীষ্মের দিনের জন্যে যে জলসত্রটি খুলেছেন, সেগুলি যাতে বন্ধ হয়ে না যায়, তার জন্য উচিতমত নিষ্কর জমি দানপত্র করে দিয়ে আসতে হল। যে কজন দুঃস্থ পণ্ডিত বৃত্তি পেয়ে আসছিলেন, তাঁদের বৃত্তি বজায় রাখার জন্যও জমির ব্যবস্থা করতে হল। তাছাড়া বরাবর গ্রামের কন্যাদায়গ্রস্থ দরিদ্র পিতা, অবীরা অসহায় বিধবা, রুগ্ণ অপটু পুরুষের অথবা মাতৃপিতৃহীন শিশুর একরকম আশ্রয়স্থল ছিলেন রামকালী।
দূর দূর জায়গা থেকেও লোক এসে হাত পেতেছে রামকালীর কাছে।
এসব লোক যাতে একেবারে না বঞ্চিত হয়, একেবারে না বিতাড়িত হয়, তার জন্যও রাসুকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে একখানা বড় তালুকের মাধ্যমে।
অবশ্য রাসু যদি নিয়ম বজায় না রাখে, রাসু যদি সে তালুকের উপস্বত্ব আত্মম্মাৎ করে, করবার কিছু নেই। কারণ এটা একটা অনিয়মিত ব্যাপার।
তবু রাসুকেই ভার দিয়ে আসতে হল। রাসু ছাড়া আর কে মানুষ হল? নেড়ুটায় তো উদ্দেশই পাওয়া গেল না প্রায়। ঠিকানা না জানিয়ে দু’একটা চিঠি দিয়েছিল কবে কবে যেন। তাতেই জানা আছে, মরে নি বেঁচে আছে। রাসুর আর ভাইগুলো তো অমনিষ্যি। সেজকাকার দুই ছেলে কুচুটের রাজা। রাসুর বড় ছেলেটা বাবুর শিরোমণি হয়ে উঠেছে। হচ্ছে সারদার দোষেই কতকটা।
সারদা যেন স্বামীর সঙ্গে রেষারেষি করে ছেলেকে বাবু’ করে তুলতে বদ্ধপরিকর। সব কথায় বলে, ও পারবে না।
ওই একটা মেয়ে। অদ্ভুত উল্টোপাল্টা।
রামকালী নিঃশ্বাস ফেলে ভাবলেন, ওর বিধাতা কি ওকে কতকগুলো উল্টোফাল্টা জিনিস দিয়েই তৈরী করেছিলেন, নাকি জীবনটা ওর উল্টো স্রোতের মুখে পড়ল বলেই?
রামকালী ওর হদিস পান না।
কখনো ওর ভারসহ কর্মনিষ্ঠা, ওর অসাধারণ নৈপুণ্য, ওর অগাধ সহিষ্ণুতা দেখে তাক লেগে যায়, কখনো ওর বিস্ময়কর নির্লিপ্ততা, দৃষ্টিকটু ঔদাসীন্য দেখে স্তব্ধ হতে হয়।
দুর্গোৎসবের সমস্ত ভার সারদা একা মাথায় তুলে নিতে ভয় পায় না, দিয়েও নিশ্চিন্ত হন রামকালী। কিন্তু এবারে হঠাৎ সারদা শান্ত ঘোষণায় জানিয়ে দিল, খুড়োঠাকুর যেন এ ভার আর কারো উপর ন্যস্ত করেন।
কেন?
কেনর কিছু নেই।
বাড়িতে তো আরো লোক আছে।
গ্রামের কজন বয়স্ক ব্রাহ্মণ-কন্যাকে ডেকে রামকালী জানিয়েছিলেন বড় বৌমার শরীর অসুস্থ, অতএব তারা যদি
তা তাঁরা এসেছিলেন, তুলেও দিয়েছিলেন পূজো।
কিন্তু অনেক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট।
পুরোহিত পূজোয় বসে হাতের কাছে উপকরণগুলি ঠিকমত না পেয়ে রেগে আগুন।
তবু রামকালী যেন সারদার উপর রাগ করতে পারেন না। পারেন না অগ্রাহ্য করতে। অনুভব করেন সারদার মধ্যে বস্তু ছিল, কিন্তু ভাগ্যের প্রতিকূলতায় সেটা খণ্ড খণ্ড হয়ে গেছে।
