অবশ্য প্রকৃতির নিয়মে তার নিজের ভিতরেও একটা প্রবল ভাঙাগড়ার কাজ চলেছে। মায়ের ওই আকস্মিক বীভৎস মৃত্যু, এবং তার পরবর্তীকালে মায়ের জীবন-ইতিহাস জানার ফলে সেই বিরাট ওলট-পালটটা সংঘটিত হয়েছিল।
তার পর এসেছে সুহাসের নবজন্মের পালা।
কোথায় ওদের বাড়ির সেই বিলাসিতায় আবিল অশুচি আবহাওয়া, আর কোথায় সত্যর দৃঢ় চরিত্রের দৃষ্টান্ত! তা ছাড়া স্কুলের জীবন! সে যেন স্বর্গের জগৎ!
সুহাসের প্রকৃতিই শুধু বদলায় নি, আকৃতিও বদলেছে। যেমন বাচাল মেয়েটা মিতভাষিণী হয়ে গেছে, তেমনি হঠাৎ লম্বা হয়ে গিয়ে গোলগাল পুষ্টদেহ মেয়েটা হয়ে উঠেছে বেতের ডগার মত ছিপছিপে লম্বা পাতলা। একটু বুঝি কৃশই।
যে কৃশতাকে দেখে তপস্বিনী উমার তুলনা মনে পড়েছে রামকালীর। সত্য হাসি হাসি মুখে বলে, পর পর দু বছর ফার্স্ট হল।
সত্যি নাকি! বলেন রামকালী।
সুহাস বোধ করি লজ্জা পেল। মৃদু কণ্ঠিত একটু হাসি হেসে বলল, দাদুর নাতিদের ফার্স্ট হওয়ার খবর তোলা থাকল, আর
তোলা নেই।
সেকথা শুনেছেন রামকালী। নবকুমার বলেছে। নাতিদের সঙ্গে দেখা হল না বলে দুঃখ প্রকাশও করেছেন। রামকালী বলেছেন, তা সত্যি, দেখি নি অনেক দিন। জলপানি পেয়েছে শুনে খুশি হলাম।
এসব গত রাত্রের কথা।
সুহাস জানে। সুহাস নিজের লজ্জা ঢাকতে তাড়াতাড়ি ওদের কথা তোলে।
রামকালী মৃদু হেসে বলেন, নাতির ফার্স্ট হওয়া আত্নাদের কথা, কিন্তু নতুন কথা নয় দিদি, নাতনীর ফার্স্ট হওয়াটাই নতুন কথা। আশীর্বাদ করি সুখী হও, সৌভাগ্যবতী হও!
সত্যর দিকে ফিরে বলেন, মন খুলেই আশীর্বাদ করলাম রে!
সত্যর চোখ আবার জলে ভরে আসে।
বাবার কথাবার্তার ধরন বদলে গেছে। চিরদিনের সেই দূরত্ব বজায় রাখা মাপজোপা কথার জায়গায় এখন যেন নিকটের সুর।
সংসার থেকে মুখ ফিরোবার কালে কি সহসা সংসারের প্রতি মমত্ব বোধ করেছেন রামকালী?
নাকি তার এই সৃষ্টিছাড়া সংসার-ছাড়া মেয়েটার কার্যকলাপ তাঁকে বিচলিত করছে?
.
যাত্রাকাল যত নিকটবর্তী হয়, সত্যর গলার শব্দ তত ভার হয়ে আসে। থেকে যাও বলে অনুরোধ করারই বা পথ কোথা? এখানে একমুঠো ভাত খাবার অনুরোধ চলবে না। যেতেই দিতে হবে।
ছোট ছোট কথা, ছোট ছোট নিঃশ্বাস।
কবরেজী কি ছেড়ে দেবে বাবা?
ছেড়ে দেব? না, ছেড়ে দেব কেন সত্য? ওই বিদ্যেটুকু দিয়ে যতটুকু যার উপকার হয়–তবে পেশাটা ছেড়ে দেব।
অর্থাৎ দক্ষিণাটা বাদ।
খুব কষ্ট করে থাকবে না তো বাবা?
বিশ্বনাথের খাসমহলে কষ্ট কিরে পাগলী!
শরীর-অশরীরে এই বেয়াড়া অবাধ্য মেয়েটা একটু খবর পাবে তো বাবা?
সে বাপু এখন বাক্যদত্ত হতে পারছি না।
সে জানি। সে কি আর জানতে বাকী আছে আমার!
নবকুমার পায়ের ধুলো নিয়ে বলে, কবে যাত্রা?
এই সামনের অষ্টমী তিথিতে নৌকা ছাড়বে।
নৌকো! নবকুমার সাহসে ভর করে বলে, কেন, এখন তো রেলগাড়ি চলছে—
চলছে। নৌকোও তো চলে এসেছে! রামকালী হাসেন, সে তো চলৎশক্তি হারায় নি!
ওতে একদিনে পৌঁছে যেতে– সত্য এগিয়ে এসে বলে।
রামকালী মৃদু হাসেন, অত তাড়াতাড়িই বা কী? মুমুর্ষ রোগী দেখতে তো যাচ্ছি না? তীর্থের পথটাই তীর্থ, পথটাকে চোখ বুজে অতিক্রম করে লাভ কি! এ একেবারে মা গঙ্গার কোলে চড়ে বসবো, কোলে কোলে চলে যাব।
বাবা, ঠিকানা?
ঠিকানা? সে কি আমি এখান থেকে ঠিক করে যাচ্ছি রে?
গিয়ে পৌঁছানো খবরে জানাবে তা হলে?
এই দেখ! এ মেয়ের কেবল সত্যবন্দী করিয়ে নেবার ফন্দী!
হবেই তো। যেমন নাম রেখেছ!
একেবারে যাবার সময়, রামকালী সহসা বেনিয়ানের পকেট থেকে দুখানি পাকানো কাগজ বার করে বললেন, এই নাও, এই দুটি জিনিস রাখো।
কী এ? সত্য হাত পাতে না, চমকে তাকায়।
রামকালী বলেন, একখানি তোমার জন্মপত্রিকা। আমার কাছে ছিল এযাবৎ
ও আমি নিয়ে কি করব বাবা?
থাক। থাকা ভাল। আর এইটা–, রামকালী একটু থামেন, দেশের বিষয়-আশয় যা কিছু বংশের ছেলেদেরই থাকল। ত্রিবেণীতে আলাদা কিছু লাখরাজ জমি ছিল, সেটা তোমার নামে
না বাবা না, সত্য কেঁদে ওঠে, ও আমি চাই না। আমি তোমার মেয়েসন্তান, শুধু স্নেহের অধিকারী।
তা এটুকু সেই স্নেহেরই চিহ্ন ধরে নাও।
বাবা গো, চিহ্ন দিয়ে স্নেহ বুঝবো তোমার? না বাবা, দরকার নেই আমার।
সত্য হাতও পাতে না, চোখের আঁচলও নামায় না। এত কান্না বোধ করি সারা জীবনে কাঁদে নি সত্য। মা মরতেও নয়।
রামকালী মুখটা ফিরিয়ে আত্মস্থ করে নেন নিজেকে, তার পর নবকুমারের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, রাখো!
নবকুমার সত্যর এই বাড়াবাড়িতে চাঞ্চল্য বোধ করছিল।
ভাবছিল, ছেলে নেই, মেয়ের তো সবই পাবার কথা। বলে মহারাণী ভিক্টোরিয়া রাজ্যটাই পেলেন। সে সব কিছুই না, মুষ্টিভিক্ষের উপহার, তাও মেয়ে নিচ্ছেন না! অতএব নবকুমারের হাত বাড়াতে দেরি হয় না।
রামকালী পালকিতে ওঠেন।
আপাতত পালকিতেই চড়লেন। কলকাতার বিশিষ্ট কয়েকটি দেবস্থান দেখবেন, তার পর নৌকোয় উঠবেন। রেলটা পছন্দ করেন না রামকালী। বললেন, তেমন তাড়া না থাকলে দরকার কি?
পালকিটা যতদূর দেখা যায় দরজায় দাঁড়িয়ে দেখে সত্য। তার পর বাড়ির মধ্যে ঢুকে এসে বসে পড়ে। অনেকক্ষণ পরে চোখ মুছে নিঃশ্বাস ফেলে বলে, নেহাৎ নিরুপায় যদি না হতাম, ঠিক আমি বাবার সঙ্গে চলে যেতাম!
