সত্যর ওই পাঠশালায় পড়ানো শুনে রামকালী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আস্তে একটি নিঃশ্বাস ফেললেন। তারপর বললেন, সত্য, তোর মাকে তোর মনে পড়ে?
মাকে মনে পড়ে না? কী বলছ বাবা? আবার সত্যর চোখ উপচে ওঠে।
না, তাই বলছি। তোর মা থাকলে, একথা শুনে ভয় পেত, বুঝলি? নির্ঘাত ভয় পেত। আবার আড়ালে বলতো, আমি জানি ও আমার ক্ষণজন্মা মেয়ে।
উত্তর পেয়ে যায় সত্য। তার কাজ ভুল কি ঠিক জেনে যায়।
শুধু সুহাসকে নিয়ে কিছুক্ষণ আলোচনা চলে। কিছুটা বাদ-প্রতিবাদও বুঝি। তখনও সত্য সুহাসকে সামনে আনে নি রামকালীর।
রামকালী বলতে চাইছিলেন, বিয়ের চেষ্টার প্রয়োজন কি? বেশ তো, লেখাপড়া শিখছে ভাল কথা। নিজের জীবিকা নিজে অর্জন করতে পারে, সেটা মঙ্গল। কলকাতায় তো আজকাল এ রকম হচ্ছে। বিদূষী মেয়েরা গৃহশিক্ষয়িত্রী হয়ে অথবা মেয়েঙ্কুলে পড়িয়ে উপার্জন করছে!
কিন্তু বাবা-, সত্য বলে মা-টা তো চিরদুঃখিনী হয়ে দুঃখে-দুঃখেই মরল। মেয়েটাও কোনদিন ঘর-সংসারের মুখ দেখবে না?
মা-বাপের প্রায়শ্চিত্ত তো সন্তানকেই করতে হয় সত্য।
আর যদি ইচ্ছে করে কেউ ওকে বিয়ে করতে চায়?
রামকালী মাথা নেড়ে বলেন, কে চাইবে? একে তো জন্মের গোড়াতেই অত বড় গলদ, তার ওপর মেয়ের যথেষ্ট বয়েস হয়ে গেছে, বিধবা কি কুমারী তারও নিশ্চয়তা নেই।
সত্য তখন নিজের গোপন ইচ্ছে ব্যক্ত করে। মেয়েটাকে যদি ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করিয়ে ব্রাহ্মসমাজের কোনও সমাজ-সংস্কারক পরহিতৈষী যুবকের হাতে তুলে দেওয়া যায়! সুহাসের যোগ্য বয়সের অবিবাহিত ছেলে ও সমাজে পাওয়া যায়।
রামকালী যেন এ প্রস্তাব সমর্থন করেন না। তুচ্ছ একটা মেয়ের বিয়ে বিয়ে করে এত কাণ্ডর দরকার কি, এই যেন তার মত। তাই সহসা গম্ভীর হয়ে গিয়ে বললেন, যদি জিজ্ঞেসই করছ তো তা হলে বলি, একটা খুঁতওলা বয়সের ধারা বাড়িয়ে চলে লাভ কি?
লাভ ওই মেয়েটার সংসার। মেয়ে বলেই কি তুচ্ছ বাবা? একটা মানুষের জীবন তো?
মানুষের জীবন শুধু ভোগেই সার্থক নয় সত্য, ত্যাগেও সার্থকতা আছে। ও তো জানে ও বিধবা, বালবিধবার যেমন ভাবে জীবন কাটে–
কী ভাবে আর তাদের কাটে বাবা! সত্য হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে বলে, চিরদুঃখেই কাটে। পিসঠাকুমার মতন আর ক’জন হয়? তাও তিনিও মনের দাহয় শুচিবাই করে বিশ্বসুদ্ধ লোককে অতিষ্ট করেছেন–
রামকালী সহসা স্তব্ধ হয়ে যান। যেন মোক্ষদাকে চোখের ওপর দেখতে পান। পূর্বের সেই সুবৰ্ণবর্ণা তীব্র দীপ্তময়ীকেও দেখেন, আর তার পিছনে কায়ার পিছনে ছায়ার মত, সূর্যের পিছনে রাহুর মত, বর্তমানের রোগজীর্ণ মোক্ষদার প্রেতাত্মাকেও দেখতে পান। যে মোক্ষদা এখন ভীমরতি হয়ে যা-তা করে বেড়াচ্ছেন। লুকিয়ে-চুরিয়ে খাবার জন্যে নাকি সর্বদা ছোঁক ছোঁক করে বেড়ান তিনি, দেখ, তোর, না দেখ মোর নীতিতে মুঠো করে মাছভাজা নিয়ে মুখে পুরে বসে থাকেন।
আর সারদা রাতদিন গালমন্দ করে টেনে টেনে নিয়ে গিয়ে পুকুরে চুবিয়ে আনে। একথা তবু জানে না সত্য। সত্য সেই শুচিবাইটাই জানে। রামকালী একটু চুপ করে থেকে বলেন, দেখ, তেমন পরোপকারী ভাল ছেলে যদি পাও।
তোমার আশীর্বাদ না পেলে, এত বড় কাজ করতে ভয় পাচ্ছি বাবা। তুমি মন খুলে সায় দিয়ে যাও–
রামকালী একটু হেসে বলেন, মন কি ঘরের জানলা-দরজা সত্য, যে গায়ের জোরে খোলাবি? তবে–আশীর্বাদ আমি করছি। তোর কাজে ভগবান সহায়।
.
সত্যর আশঙ্কাই ঠিক।
রামকালী সামান্য কিছু ফলমূল গ্রহণ করেন এবং জানান পরদিনও তাঁর পূর্ণিমার ব্রত।
এই বুঝেই তা হলে তুমি এসেছ বাবা? সত্য কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে, আমি তোমার এমন অধম মেয়ে যে জীবনে একদিন বেঁধে ভাত দিতে পারলাম না।
রামকালী সহসা একটি গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, জীবনের কথা কি এখুনি বলে শেষ করে ফেলা যায় সত্য? জীবনের পরিণতি গুহার অন্ধকারে।
তারপর বলেন, এত কথা হল, কই সে মেয়েটাকে তো দেখলাম না?
কি জানি বাবা, কি লজ্জা ঢুকেছে তার মনে, চৌকিতে পড়ে কাঁদছে।
কাঁদছে! রামকালী একটু চকিত হন।
আর কিছু বলেন না।
কিন্তু পরদিন সকালে যখন স্নান-আহ্নিক সেরে বসেছেন, তখন সুহাস মাথা নীচু করে এসে আস্তে আস্তে প্রণাম করে রামকালীকে।
পুব জানলা দিয়ে সকালের আলো এসে মেয়েটার মুখে পড়ে যেন তাকে একটা স্নিগ্ধ কৌমার্যের দ্যুতিতে স্নান করিয়ে দিয়েছে। আর স্র অথচ দৃঢ় মুখের রেখায় একটি প্রত্যয়ের আভা। পাতলা ঋজু দীর্ঘ দেহের গড়নেও সেই প্রত্যয়ের দৃঢ়তা।
রামকালী বুঝি এমনটি আশা করেন নি।
রামকালী যেন বিচলিত হন। হঠাৎ বহুদিন পূর্বের একটি কথা মনে পড়ে যায় তাঁর। মনে পড়ে যায়, পুকুরঘাটের ধারে বসে থাকা একটা বিধবা মূর্তি। কেমন সেই মূর্তি, রামকালী কি দেখেছিলেন?
মাথায় হাত ঠেকিয়ে আশীর্বাদ করেন রামকালী।
তার পর গম্ভীর শান্ত গলায় বলেন, সত্য, এ যে তপস্বিনী উমা!
সত্য হাসি হাসি মুখে সুহাসের মুখের দিকে তাকায়। এ প্রশংসা যে তারই। সুহাস যে তার হাতে গড়া প্রতিমা।
কচি নয়, শিশু নয়, পনেরো বছরের ধাড়ী মেয়েটাকে কাছে এনেছিল সত্য, তারা বহুবিধ অশিক্ষা কুশিক্ষা আর চরিত্রগত বহু দোষের সমষ্টি সমেত।
এই ক’বছরে মাত্র ভেঙেচুরে গড়েছে সেই মেয়েকে।
