কাশীবাস!
সত্য ভেঙে পড়ে বলে, বাবা! এই সংকল্প করেছ তুমি? তাই এই হতভাগা মেয়েটাকে দেখা দিতে এসেছ? আমি যে কিছু জানি না বাবা, তাহলে সব ফেলে ছুটে চলে যেতাম তোমার কাছে!
রামকালীর এই আকস্মিক আবির্ভাবে সত্য যেন তার চির-অভ্যস্ত স্থিরতা হারিয়ে ফেলতে বসেছে।
একে তো অপ্রত্যাশিত আনন্দের আবেগ, তার সঙ্গে অন্তর্নিহিত এক চিন্তা–তাদের এই বাসাবাড়িতে বাবা জলগ্রহণ করবেন কিনা। জলও তো কলের জল। যদি এ জল না খান, না হয় গঙ্গাজলেরই ব্যবস্থা করবে, কিন্তু বাসাবাড়ির দোষ খণ্ডাবার উপায় কি?
গেরস্তবাড়িতে গুরু আসা দেখেছে সত্য, সেভাবে করতে পারে, কিন্তু বাবা কি সেই অতি যত্ন অতি সেবা নেবেন? এই সব চিন্তার সঙ্গে উপচে উঠছে এক অব্যক্ত বিচ্ছেদ-ব্যাকুলতা।
বাবাকে সে নিত্যি দেখছে না সত্যি, কিন্তু জানে বাবা রয়েছেন, সত্যর সেই চির-পরিচিত পরিবেশের মাঝখানে বাবার চিরঅভ্যস্ত জীবনে।
কিন্তু কাশীবাস!
সে যে চিরবিরহের সমতুল্য। এ তো এক প্রকার মৃত্যু। কাশীবাসের সংকল্প মানেই সংসার থেকে মুখ ফিরোনো। সাতপাঁচ চিন্তায় সত্যর কণ্ঠে এই আবেগ, এই আকুলতা!
রামকালী বোঝেন।
তাই রামকালী এই অস্থিরতাকে ঈষৎ প্রশ্রয়ের দৃষ্টিতে দেখেন। আর মেয়ের কথার উত্তরে মৃদু হেসে বলেন, তুমি যাও নি, আমিই তোমার কাছে এলাম। একই কাজ হল।
প্রণামান্তে নিতাই চলে গিয়েছিল, নবকুমার সত্যর কথা বলার সুবিধের জন্যে একটু তফাতে গিয়ে বসেছে। সত্য তাই স-আক্ষেপে বলে, দুই কি আর এক হল বাবা? সে আমি বাপের মেয়ে বাপের কাছে গিয়ে পড়তাম, আগের ছোটটি হয়ে যেতাম। যা প্রাণ চায় বলতাম। আর এ তুমি কুটুমবাড়ি এসেছ, আমি পরের ঘরের বৌ, আমার প্রতি পদে বাধা। কী বা বলব, কী বা কইব!
নবকুমার তফাতে বসলেও এতো তফাতে নয় সে সত্যর বাক্যাবলী তার কর্ণগোচরিত হতে কোনও বাধা হচ্ছে। সে সহসা নৈর্ব্যক্তিক স্বগতোক্তি করে ওঠে, হায় ভগবান! প্রতি পদে বাধা! পা আরো অবাধ হলে কি যে হত।
রামকালী সচকিত হয়ে বললেন, কী বললে বাবাজী?
নবকুমার গম্ভীর গলায় বলে, না, এমন কিছু নয়। তবে নাকি আপনার মেয়ে আক্ষেপ করছেন, প্রতিপদে বাধা, তাই বলছিলাম। আপনাদের নিত্যানন্দপুরে এমন কোন্ মেয়েটা আছে, আর আমাদের বারুইপুরে এমন কোন্ বৌটা আছে, যে আপনার মেয়ের সমতুল্য স্বাধীন, তাই বরং জিজ্ঞেস করুন।
রামকালী অনুভব করেন নালিশের সুর।
তাই মৃদু হাসেন।
বলেন, তা যদি হয় সেটা তো ভালই। আমার মেয়ে যে ঝাঁকের কৈ হবার জন্যে জন্মায় নি, সে আমি তার শৈশবকালেই বুঝেছি।
সত্য তার বাপের উপস্থিতি স্বামীর উপস্থিতি ইত্যাদি মানতে পারে না, ঘোমটাটা আর একটু টেনে বলে, আচ্ছা বাবা, তুমি এই তেতেপুড়ে এসেছ, এ সময় নালিশ ফোরেদ করতে বসাটা খুব ভাল হচ্ছে? থাকবে তো দু’চার দিন, পরে যত খুশি-
ওরে বাবা! দু’চার দিন কি রে? একটা দিনের জন্যে চলে এলাম। কাল যাবো।
একটা দিন! বাবা, মাত্তর একটা দিনের জন্যে এলে তুমি? সত্য কেঁদে ফেলে, তোমার সঙ্গে যে আমার অনেক কথা
হ্যাঁ, বাবার সঙ্গে সত্যর অনেক কথা।
কতদিন ভেবেছে চিঠি লিখে সব বলে বাবাকে, প্রশ্ন করে কোটা ঠিক, কোন্টা ভুল, কিন্তু লিখতে গিয়ে দেখেছে অগাধ কথা। এত কথা কি চিঠিতে লেখা যায়? তা ছাড়া উত্তর-প্রত্যুত্তরের মধ্যে বক্তব্য বোঝনো যায়, শুধু একতরফা পেশ করা যেন কৈফিয়ত দাখিল করা।
বাবা যদি উত্তরে লেখেন, এত কথা আমায় লেখার উদ্দেশ্য কি?
অথচ ব্রাহ্মধর্ম কি, কোন একজন চিরহিতৈষী গুরুজন যদি হঠাৎ ব্রাহ্মধর্ম নিয়ে বসেন, তাঁকে ত্যাগ করাই সমীচীন কিনা, গেরস্তঘরের মেয়ে, অথবা গেরস্তঘরের বৌ এই অপরাধে জগৎ সংসারের সকল প্রকার কাজ থেকে তাদের বঞ্চিত হওয়াই বিধি কিনা, স্বামী যদি হিতাহিতে অন্ধ হন, মেয়েমানুষের সেই অন্ধপথেই চলা নিয়ম কিনা, এমন অনেক প্রশ্ন তো আছেই, সর্বোপরি প্রশ্ন শঙ্করীর মেয়ের প্রশ্ন। শঙ্করীর কথা বলে যখন বাবাকে চিঠি লিখেছিল, তখন রামকালী উত্তর দিয়েছিলেন, যে যত বড় অপরাধেই অপরাধী হোক, সে যদি অনুতপ্ত হয়ে থাকে, তাকে ক্ষমা করাই কর্তব্য। তা ছাড়া তোমার বিবেচনার ওপর আমার আস্থা আছে।
সুহাস সম্পর্কে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, এ একবার বাবাকে জিজ্ঞেস করবার তার বিশেষ ইচ্ছে।
কিন্তু বাবা কিনা একদিন মাত্র থাকবেন?
তার মানেই সত্যর এই বাসাবাড়িতে তিনি খাওয়া-মাখা করবেন না। হয়তো ফলমূল আর গঙ্গাজল খেয়েই একটা বেলা কাটিয়ে দেবেন। সত্যর আর পিতৃসেবার পুণ্য হবে না। এত সব উচ্ছাস মনের মধ্যে আলোড়িত হতেই চোখের জল বাঁধ মানে না।
রামকালী আস্তে তার মাথায় একটু স্পর্শ রেখে বলেন, একটা দিনই কি কম হল রে? কত কথা বলবি, বল না?
আর কথা! আমার তো শুধু উপচে উপচে কান্নাই আসছে বাবা?
আঁচল ভিজে জবজবে হয়ে ওঠে সত্যর।
অনেকক্ষণ পরে প্রশমিত হয় সে কান্না। কথাও হয়। যত কিছু বলার ছিল সব বলে ফেলে সত্য, তার চিরদিনের ধ্রুবতারার কাছে।
রামকালী নবকুমারকে মৃদু ভর্ৎসনা করেন। বলেন, সে কি! মাস্টার মশাই তোমার চিরহিতৈষী, তাঁকে ত্যাগ করবে কি? তার ধর্ম, বিশ্বাস তার কাছে। এই যে আমি, আমি শাক্ত কি বৈষ্ণব, এইটা কি দেখতে যাবে তোমরা? না দেখবে– বাবা? গুরু, শিক্ষক এঁরাও তেমনই পিতৃতুল্য। তা ছাড়া তিনি তো তার ধর্ম বিশ্বাস তোমার ওপর চাপাতে আসছেন না? তোমার কোনো অনিষ্ট আসছে না তা থেকে? তবে?
