তোমার এত বিদ্যে যে মাস্টারি করতে এগোও
নবকুমারের এই ব্যঙ্গোক্তিতে সত্য মৃদু হেসে বলে, মাস্টারি করা তো সত্য বামনীর জন্মগত পেশা গো, আজ তো মাস্টারি করে এলাম। স্বভাবের দোষেই এগিয়ে পড়লাম। আর বিদ্যের? সে ওই পড়াতে পড়াতেই এগোবে। যতটুকু পারি ততটুকুই করে যাব।
নিতাই আস্তে আস্তে বলে, বয়সওলা মেয়েরা পড়ায় মন দিচ্ছে?
খুব খুব! দু-একজন বাদে শিখেও ফেলেছে চটপট! দেখলে বুঝতে, নিজেরা রামায়ণ মহাভারত পুরাণকাহিনী পড়বার জন্যে কী আগ্রহ! দেখে মনে হয় জীবন সার্থক হচ্ছে আমার।
নবকুমারের মুখ তথাপি হালকা হয় না। বলে, মাস্টার মশাই যে ধর্মের মাথায় ঝাড়ু মেরে বেম্ম হয়েছে, সেকথা নিশ্চয় জানে না ওরা?
জানবে না কেন? তবে তোমার মতন সবাই অত গোঁড়া নয়। মাস্টার মশাইয়ের হাতে ভাত তো খেতে যাচ্ছে না কেউ। আর ধর্মের মাথায় ঝাড়ু মারাই বা বলছ কেন? ব্রাহ্মধর্মও হিন্দুধর্ম। কান দিয়ে শোন না তো কিছু? এই যে আজ অত বড় ব্রাহ্মসমাজের চাই কেশব সেনের বাড়ি পরমহংস এসেছিলেন–
কী কী! কোথায় কে এসেছিলেন?
নবকুমার কাছা খুলে দাঁড়িয়ে ওঠে।
পরমহংসদেব, বলি তার নামটাও কি শোন নি কখনো?
শুনব না কেন? বেজার মুখে বলে নবকুমার, দক্ষিণেশ্বরে দেখেও তো এসেছি সেবার আপিসের বন্ধুদের সঙ্গে। তা তিনি।
হ্যাঁ, তিনি। কেশব সেনের বাড়িতে এসেছিলেন। সেই দেখতেই তো আজ আমার এত দেরি, আর তোমাদের কাছে সব ফাস!
নবকুমার স্তম্ভিত দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে, তোমাকে আর কিছু বলবার নেই আমার বড়বৌ, তুমি আমার নাগালের উর্ধ্বে চলে যাচ্ছ। কিন্তু কেশববাবুর বাড়ি গেলে কি করে?
কি করে আবার? একা নাকি? আরও কত মেয়েমানুষ গেল। দল করে শেয়ারের ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করে যেখানে দল, সেখানেই বল। কত চমৎকার গান হল, প্রাণ যেন জুড়িয়ে গেল।
বুক কাপল না?
বুক কাঁপবে কেন? সত্য অবাক দৃষ্টিতে বলে, এই যে মেয়েমানুষেরা তীর্থে যায়, যোগে গঙ্গাস্থান করতে যায়, দেবস্থানে মেলা দেখতে যায়, সাধুসন্নিসী দর্শনে যায়, কই বুক কাঁপার কথা ওঠে না! এসব জায়গায় মাঝে মাঝে যেও গো, তা হলে দিষ্টিটা খুলবে।
আমরা যাব? হুঁ! নবকুমার বলে, আমরা ক্ষুদ্র প্রাণী, আমাদের অত সাহস কোথা?
সত্য উঠে পড়ে বলে, নিজেকে চব্বিশ ঘণ্টা ক্ষুদ্র প্রাণী’ ভাবলেই মনটা ক্ষুদ্দুর হয়ে যায়। ক্ষুদ্দুরই বা ভাবতে যাব কেন? সব মানুষের মধ্যেই ভগবান আছেন, এটা মানো তো? সেই ভগবানের জোরেই জোর। সেই ক্ষেত্রে সবাই বড়।
নিতাই সন্তর্পণে একটা নিঃশ্বাস ফেলে।
তার বৌকে সে বৌঠানোর কাছে আসতে বলে। সাতজন্ম পার করে এসেও নিতাইয়ের বৌয়ের সাধ্য হবে এসব চিন্তা করতে?… নবকুমার ঠিকই বলেছে, সত্য যেন তাদের নাগালের উর্ধ্বে চলে যাচ্ছে।
নবকুমার তাই টেনে নামাতে চেষ্টা করে, তা সে যাই হোক, বেম্মবাড়ি থেকে এসে কাপড় চোপড় ছেড়েছ? মাথায় একটু গঙ্গাজল স্পর্শ করেছ?
সত্য মৃদু হেসে বলে, সেটা করেছি বাড়ির জন্য নয় গাড়ির জন্যে। গাড়ির কাপড়ে কোনকালেই থাকি না। ভেবেচিন্তে বুঝি এই মাথায় আনলে এতক্ষণে?… যাক, ছেলেরা কবে আসবে? ওরা নেই, বাড়ি ফাঁকা ফাঁকা ঠেকছে–
নবকুমার বেজার মুখে বলে, তোমার আবার ফাঁকা ঠেকা! তোমার মনপ্রাণ তো সব তত্ত্বজ্ঞানে ঠাসা। সেখানে আবার স্বামী-পুত্তুরের জায়গা কোথা? বেশ বুঝছি তোমার বাপের মতই কাষ্ঠ-কঠিন হয়ে যাবে তুমি।
সত্য শান্ত গলায় বলে, বাবার মতন? বাবার চরণের নখের এক কণা হতে পারলেও ধন্য মনে করব নিজেকে।…কিন্তু আজ আবার এ কথা কেন? নিজে মুখেই তো বলেছিলে, বাবা মানুষ নয়, দেবতা।
সেকথা এখনও বলছি। কিন্তু দেবতাকে দূরে থেকে পুস্পাঞ্জলি দেওয়াই ভাল, নিয়ে ঘর করায় কোন সুবিধে নেই।
সত্য হেসে ফেলে বলে, দেখ ঠাকুরপো, তোমার বন্ধুর কত উন্নতি হয়েছে! কত বাক্যি শিখেছেন!
আর নিতাই এতক্ষণে কিঞ্চিৎ ধাতস্থ হয়ে বলে, না শিখলে তো শাস্তরই মিথ্যে বৌঠান! সগুণ বলে কথা–
কথার মাঝখানে হঠাৎ সুহাস পাশের ঘর থেকে এসে বলে, কে যেন আসছেন মনে হচ্ছে।
পাশের ওই ঘরের দুটো জানলাই রাস্তামুখো, সুহাস খুব সম্ভব সেখানেই দাঁড়িয়েছিল।
এরা সন্ত্রস্ত হয়ে বলে, কে? কে আসছেন?
চিনি না। বুড়ো মতন, কিন্তু খুব লম্বা,ফর্সা–সোজা—
লম্বা ফর্সা! সোজা–
সত্যর বুকটা ছাঁৎ করে ওঠে। আর পরক্ষণেই সেই ছাঁৎ-করা বুকটা হিম করে দিয়ে উঠোনের ওধার থেকে একটি মৃদু গম্ভীর ভারী গলায় প্রশ্ন ধ্বনিত হয়, বাড়িতে কে আছেন?
বাবা!
সত্য বিদ্যুৎগতিতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। তারও আগে নিতাই বেরিয়ে পড়ে, পিছনে নবকুমার। আর ততক্ষণে সেই মৃদু গম্ভীর ভারী গলায় আর একটি প্রশ্ন উচ্চারিত হয়, এইটাই কি নবকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি?
বাবা! বাবা গো! তুমি!
সত্য প্রণামের মাথাটা না তুলেই বলতে থাকে, আমার যে সত্যি বলে বিশ্বাস হচ্ছে না
তবে স্বপ্নই ভাব। বলে মৃদু হেসে রামকালী দাওয়ায় ওঠেন।
নবকুমার নিতাই দুজনেই প্রণাম করে। আর মনে মনে ভাবে, অনেক দিন বাঁচবেন ইনি। ঠিক যে মুহূর্তে ওঁর কথা হচ্ছিল, সেই মুহূর্তেই এমন আকস্মিক এসে পড়া—
.
আবেগের উচ্ছ্বাস প্রশমিত হতে এবং কুশল বিনিময় হতে কিছুক্ষণ যায়। তারপর আসার কারণ ব্যক্ত করেন রামকালী। তিনি কাশীবাসের সংকল্প করেছেন, তাই শেষ একবার সত্যকে দেখতে এসেছেন।
