সত্য এক মুহূর্ত নবকুমারের সেই বিপর্যস্ত মূর্তির দিকে তাকিয়ে, একটু মুখ টিপে হেসে বলে, তাই বুঝি? আমার রীতনীত আর ভাল ঠেকছে না তোমার?
হাসি!
সত্য হাসছে!
তার মানে, হয় তার মনে কোনও অপরাধ-বোধ নেই, নয় সে পাকা ঘুঘু। নিতাইয়ের জ্ঞান থাকে না যে সে হাঁ করে সেই চাপা হাসিতে উজ্জ্বল অর্ধাবগুণ্ঠিত মুখের দিকে তাকিয়ে আছে এবং রীতিনীতির দিক দিয়ে সেটাও খুব শোভন নয়।
নবকুমার কিন্তু এখন বিহ্বল নয়। এই এতক্ষণার উদ্বেগ অশান্তি দুশ্চিন্তা সব কিছুর যন্ত্রণা তার রাগের ঝুঁজ হয়ে ফুটে ওঠে। সত্যর হাসিটা তাতে ইন্ধন যোগায়। তাই এবার তেড়ে দাঁড়িয়ে উঠে বলে; না, ঠেকছে না। আমার মনে হচ্ছে তোমার মতিবুদ্ধি মন্দপথে যাচ্ছে।
শুধু নবকুমার থাকলে সত্য দপ করে উঠত কিনা কে জানে, কিন্তু এখন সঙ্গে নিতাই। ওর সামনে রেগে উঠলে মান থাকে না। তাই সত্য তেমনি ভাবেই বলে, তা তোমার যখন মনে হচ্ছে, তখনই অবিশ্যিই তার একটা ন্যায্য কারণ আছে। বিজ্ঞ বিচক্ষণ পুরুষ তুমি। তা হলে এখন এই দুষ্টু পরিবারকে নিয়ে কি করবে বল? অগ্নিপরীক্ষা? না কেটে গঙ্গায় বিসর্জন?
এ কী দুঃসহ স্পর্ধা! নবকুমারের মুখে কথা যোগায় না।
নিতাই এতক্ষণে কথা বলে।
বলে, কিন্তু বৌঠান, আপনি যে আমাদের ধাঁধায় ফেলে মজা দেখছেন, তারও তো একটা বিহিত চাই। এই আজ বিকেল থেকে ও হতভাগার কী গেরো! আর আমিও আজ এই সমগ্ৰ দিনটা না খাওয়া, না দাওয়া, তার ওপর বৌয়ের কাছে মুখ হেঁট_
ওমা! ধাঁধায় যে তুমিই আমাকে ফেলছ ঠাকুরপো! তোমার খাওয়াদাওয়াতেই বা আমি হন্তারক হলাম কি করে? আর বৌয়ের কাছে মুখ হেঁট হবার দায়ীকই বা হলাম কেন? কিছু তো বুঝতে পারছি না! মুখ তো দেখছি কড়ি হয়ে গেছে!
বেচারা নিতাই, উপোস সে একবারে সহ্য করতে পারে না, সেই উপোস আজ সারাদিন, তার উপর এত রকম কথাবার্তা, সর্বোপরি এই স্নেহবাণী, তার চোখের স্নায়ু দুর্বল হয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করে বসে। আর সেই বিশ্বাসঘাতকতার লজ্জাটা ঢাকতে সে তার বৌয়ের কাছে হেট হয়ে যাওয়া মাথাটা আর একবার হেঁট করে।
নাঃ, এই দুটি বুড়ো খোকা হয়েছেন সমান, সত্য এবার ব্যঙ্গের রূপ ছেড়ে সদয় রূপে আসে, এই অবুঝপনার জন্যেই আমাকেও বুড়ো বয়সে ছলচাতুরী ধরে মরতে হচ্ছে … কিন্তু তার আগে ঠাকুরপো, কিছু খাও দিকি, মনে হচ্ছে বৌয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে হরিমটর চালিয়েছ আজ।… সুহাস, আগে তোর ছোট পিসেমশাইকে একটু কিছু খেতে দে তো
না না, আমার কিছু লাগবে না, বলে প্রতিবাদ করে ওঠে নিতাই।
সত্য মৃদু হেসে বলে, লাগবে কি না লাগবে সে কি তুমি বুঝবে?
সুহাস বিনা বাক্যে দুখানি ঝকঝকে কাঁসার রেকাবে দুই পিসের জন্যেই খাবার এনে ধরে দেয়। বাড়িতে মজুত খাবার যা হয়, দুটি নারকেলনাড়ু খানচারেক জিবেগজা আর একবাটি মুড়ি।
হঠাৎ নিতাইয়ের ভারী দুঃখ হয়। তার ঘরেও তো এমন কিছু অপ্রতুল নেই, অথচ এমন পরিপাটিত্ব কোন সময় চোখে পড়ে না। এই যে নবকুমার মাঝে মাঝে যায়, কই নিতাইয়ের বৌ তো কোনদিন এক গেলাস জল এগিয়ে দেয় না? খিদে দুর্দমনীয় হলেও, হাত বাড়িয়ে নিতে ইচ্ছে হচ্ছে না যেন!
নবকুমারও ভারী মুখে বলে, আমার খাবার দরকার নেই।
সত্য গম্ভীরভাবে বলে, তোমাদের দরকারে তো খেতে বলা হচ্ছে না, আমার দরকারেই বলা হচ্ছে। খাও, আমি বসে বসে আমার অপরাধের জবানবন্দী দিচ্ছি।
অগত্যাই দুজনকে হাত বাড়াতে হয়।
সত্য বলে, রোজ কোথায় যাই, সে বিত্তান্ত সুহাস জানে, ছেলেরা জানে, জান না শুধু তুমি। জানাব তোমাকে, তবে তার আগে কথা দিতে হবে, যে কাজ করছি নিষেধ করবে না।
বাঃ! এ যে সাদা কাগজে সই-, নবকুমার বলে, কাজটা ভাল কি মন্দ না জেনে–
সত্য এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে শান্ত স্থির গলায় বলে, তাকাও আমার দিকে। দু বন্ধু আছ, দুজনেই তাকাও, পষ্ট তাকিয়ে বল, আমি একটা মন্দ কাজ করছি, এ সন্দেহ সত্যি আছে তোমাদের মনে? বল তবে আমি তোমাদের কথার উত্তর দেব।
বলা বাহুল্য দু বন্ধুর কেউই চোখ তুলে তাকায় না, বরং দুজোড়া চোখ একেবারে নতমুখী হয়ে যায়।
সত্য একটু অপেক্ষা করে বলে, বুঝলাম। শোন, রোজ দুপুরে আমি পাঠশালে পড়াতে যাই।
নবকুমার একবার চোখ তোলে।
চমকে! শিউরে!
নিতাইও প্রায় তাই। বলে, পড়াতে!
হ্যাঁ, পড়াতে। সর্বমঙ্গলাতলায় রোজ দুপুরে মেয়েমহলের একটা আড্ডা হয়। গিন্নী, মাঝবয়সী। বৌ ঝি আছে দু-একজন। সাধ করে কেউ বা মায়ের ফুল বিল্বপত্তর বেছে রাখেন, কেউ বা মালা গাঁথেন, একজন আছে মুখে মুখে পুরাণ-কাহিনী রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনী বলেন, পাঁচজনে শোনে। আবার গালগল্পও খুব চলে। এটা দেখে মাস্টার মশাইয়ের মাথায় এসে গেল–
আবার মাস্টার মশাই!
নবকুমারের মুখটা বিকৃত হয়ে ওঠে। সত্য সেটা দেখেও দেখল না, বলতে লাগল, মাথায় এসে গেল এই মেয়েমানুষদের নিয়ে একটা পাঠশালা খুললে কেমন হয়, বৃথা গালগল্পে সময় নষ্ট না করে খুলে দিলেন ‘সর্বমঙ্গলা বিদ্যাপীঠ’! আমায় ধরলেন পড়াতে। বললেন, গুরুকে এবার গুরুদক্ষিণা দাও, পড়াও এদের। দেখলাম কাজটা পুণ্যের, বললাম, বেশ।
বললাম বেশ! নবকুমার চঞ্চল হয়ে বলে ওঠে, আমাকে একবার শুধোবারও দরকার নেই?
আহা, সে অপরাধ তো একশোবার স্বীকার করছি, কিন্তু তুমি যদি দুম করে দিব্যি দিয়ে বসতে? সে ঠেলে তো আর করা হত না। তাই মা সর্বমঙ্গলার নাম করে লেগে গেলাম।… বই খাতা শেলেট সব মাস্টার মশাইয়ের খরচ।
