মনে পড়ে গেল সত্যর সেই কথাটা এই উচিত অনুচিতের’ প্রসঙ্গে। মুখেও আসছিল, সামলে নিল, মৃদু হেসে বলল, তুই তো দেখছি অনেক শিখে ফেলেছিস! হ্যাঁ, বলেছিস ঠিক, উচিত নয়। কিন্তু দেখ, সব নিয়ম সব ক্ষেত্রে খাটে না। কত স্বামী হরিনামে অসন্তুষ্ট হয়, হরিনাম শুনলে জ্বলে ওঠে, তা বলে তার স্ত্রী করবে না হরিনাম? তবে আবার তার কানের কাছে খোল পিটিয়ে নাম সংকীর্তন করাও ভাল নয়। আসল কথা, যে কাজটা করতে যাচ্ছ, আগে দেখবে সে কাজ ভাল কি মন্দ, সেই বিবেচনাটুকু রাখতে হবে, তার পর যতটা পারা যায় কাউকে না চটিয়ে সে কাজকে সামলে নিয়ে উদ্ধার করা। যারা পছন্দ করে না তাদেরকে অগ্রাহ্য করাও হল না, কাজটাও হল।
সুহাসকে কি একেবারে বড়র দলে ফেলেছে সত্য? তাই তার কাছে এত কৈফিয়ত? অথবা সুহাসকে উপলক্ষ্য করে সত্য নিজের মনকেই কৈফিয়ত দিচ্ছে? স্বামীর সঙ্গে লুকোচুরি করতে, ভিতরে ভিতরে যে সূক্ষ্ম বিবেকের পীড়ন অনুভব করে সে, এ কৈফিয়ত তার জন্যে?
সুহাস অবশ্য নিজেকে বড়ই ভাবে, পুরো একটা মানুষই ভাবে, তাই সত্যর কৈফিয়ত শুনেও আবার মতামত ব্যক্ত করতে সাহসী হয়। আর সত্যর কাছে আর যাই হোক সাহসী হতে বাধা নেই। তাই আস্তে বলে, আমার তো মনে হয় হরিনামটা ভাল কাজ, সেটা বুঝিয়ে দিয়ে
সত্য হেসে ওঠে।
বলে, কম বয়সে আমিও তোর মত করেই ভাবতাম সুহাস, সব কিছু নিয়ে লড়াই করতাম, তব্ধ করে অপরকে বুঝিয়ে ছাড়বার চেষ্টা করতাম, কিন্তু এখন বয়সে বুদ্ধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এইটা বুঝেছি অবিরত লড়াইয়ে কেবল শক্তিক্ষয়। কাজের জন্যে যে শক্তি থাকা দরকার, সে শক্তির অনেকটা যদি তর্কেই খরচ করে ফেলি, তবে কাজটায় যে ঝিমিয়ে যাব। তাই যাতে সাপও মরে লাঠি ভাঙে, সেই পথই ধরি। তবে ওই যা বললাম, ক্ষেত্রবিশেষে। আর সেই বিশেষ’টা চেনবার চোখ চাই, বুঝলি? মেয়েমানুষ কি মানুষ নয় বলে অনেক তর্ক করেছি, কিন্তু দেখছি ক্রমশ সে তত্ত্ব সমুদ্রে বালির বাঁধ। এই আমাদের পোড়া দেশে মেয়েমানুষ হওয়ার অনেক জ্বালা, বুঝলি? একটা সৎ কাজ করতে যাও, তাও পায়ে পায়ে বাধা। মাস্টার মশাই বলেন, অনুদানের চেয়েও বড় পুণ্য বিদ্যাদানে। মানুষে আর জন্তু-জানোয়ারে যে তফাৎ সে তো এই বিদ্যে থেকেই। নইলে প্রাণী মাত্তরেই তো খায়, ঘুমোয়, ছানা পাড়ে। মানুষ থেকে কীটপতঙ্গ পর্যন্ত। তাই সে বিদ্যে বস্তুটা যার মধ্যে এতটুকুই আছে, তার উচিত আর একজনকে সে বিদ্যের ভাগ দেওয়া। এ জিনিস তো দানে কমে না, বরং বাড়ে। কিন্তু এসব কথা কজন বুঝতে চায় ব! চায় না।…. আগে ভাবতাম, যা ঠিক, তা সবাইকে বুঝিয়ে ছাড়ব। বুঝিয়ে সোজা করব, এখন বুঝতে শিখেছি সে চেষ্টা হচ্ছে হাত দিয়ে হাতী মাপা, আকাশের তারা গোনা। তার চেয়ে নিজের বিবেচনায় যা ঠিক বলে বুঝব, করে যাব একমনে। একদিন না একদিন বুঝবে লোকে ঠিক কি ভুল। যারা বিরক্ত হয়েছে, অপছন্দ করেছে, তারাই মেনে নেবে।
অনেকগুলো কথা একসঙ্গে বলে সত্য একটু চুপ করে জিরিয়ে নেয়। সুহাস সেই অবসরে চট করে উঠে গিয়ে এক ঘটি মিশ্রীর পানা এনে সত্যর মুখের সামনে ধরে।
সত্যর ভেতরটা বোধ করি এমনি একটা শীতল পানীয় চাইছিল। কোন্ কালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। বিনাবাক্যে ঢকঢক করে মিশ্রীর জলটা খেয়ে নিয়ে মৃদু হেসে বলে, মনের কথা টেনে নিয়ে তেষ্টার জল দিতে শিখেছিস, আর তোর শেখবার কিছু বাকী নেই সুহাস। জগৎ-সংসারে শুধু এইটুকু শিক্ষার সম্বল থাকলেই যথেষ্ট।
সুহাস লজ্জায় মাথা হেঁট করে।
সত্য তাকিয়ে দেখে।
রূপে গুণে যেন আলো করা মেয়েটা! কিন্তু, কিন্তু গুণ কি ছিল এমন?
সত্যর মনে পড়ে প্রথম দিনকার কথা। কী উদ্ধত অস্ত্র, ভেতর-চাপা, মুখ-গোঁজা গোছের স্বভাব ছিল সুহাসের। প্রতিনিয়ত তাকে নিয়ে অসুবিধেয় পড়তে হয়েছে সত্যকে। নেহাৎ যে সত্য নিজেকে সামলে থেকেছে, সে শুধু মেয়েটা সদ্য-মাতৃহারা বলে আর তার ওপর মায়ের মৃত্যুটা বড় মর্মান্তিক বড় আকস্মিক বলে।
ক্রমশ সুহাসের প্রকৃতিতে এসেছে নম্রতা, সভ্যতা, কোমলতা। দত্তবাড়ির দরুন বহুবিধ বদভ্যাস, যা সত্যকে পীড়িত করত, বিরক্ত করত, সেগুলো অন্তর্হিত হল আস্তে আস্তে, একটা মেয়ের মত মেয়ে হয়ে উঠল সুহাস।
তবে স্বভাবটা একটু গম্ভীর, চাপা।
হৃদয়-বৃত্তির বহিঃপ্রকাশটা কম। আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ, খুশী-অখুশী বোঝা যায় না ফট করে, বোঝা যায় না শ্রদ্ধা কৃতজ্ঞতা স্নেহ। তাই আজ হৃদয়বৃত্তির এই প্রকাশটুকুতে বড় বেশী পরিতৃপ্ত হয় সত্য।
সুহাসের ওই লজ্জানত মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, তা আমার এত দেরি কেন, তা তো জিজ্ঞেস করলি না কই?
সুহাস মৃদু হেসে বলে, জিজ্ঞেস করতে যাব কেন? বলবার হলে তুমি নিজেই বলবে।
বলবার হলে? শোন কথা! সত্য বলে, বলবার নয়, এমন কাজ তোর পিসি করে বেড়ায় বুঝি?
বাঃ, তাই বলেছি নাকি? বলেছি
তা সুহাসের আর কথার শেষটা বলা হল না, উঠোনের দরজা ঠেলে দুই মূর্তিমান ঢুকলেন। নবকুমার আর নিতাই।
দুজনের মুখ থেকেই একটা করে সম্বোধন বেরোল।
বড়বৌ।
বৌঠান?
সত্য মাথার কাপড়টা একটু টেনে উঠে দাঁড়ায়।
নবকুমার বসে পড়ে।
বসে পড়ে বলে, কী ব্যাপার তোমার বড়বৌ? ভরদুপুরে রোজ তুমি যাও কোথায়? আজই বা এতক্ষণ ছিলে কোথায়? তোমার এসব রীতনীত তত ভালো ঠেকছে না আমার?
