তুমি একটু দাঁড়াও বাছা, গাড়োয়ানকে আগে বিদেয় করি, বলে সত্য ভিতরে ঢুকে আসে। সুহাস তখন এ-জানালা ও-জানালা করে ছটফটিয়ে বেড়াচ্ছে, নবকুমার নিতাইয়ের বাড়ি থেকে ফেরে নি।
সত্যকে দেখেই সুহাস প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে, পিসীমা! সে স্বরে অভিযোগ।
সত্য ব্যস্তকণ্ঠে বলে, হবে, জবাবদিহি হবে, এখন গঙ্গাজলে হাত ধুয়ে আমার ওই হাতবাক্স থেকে চার আনা পয়সা বার করে দে দিকি, গাড়ির কাপড়ে আর বাক্সটা ছোঁব না।
আঁচলের গিট খুলে চাবিটা ফেলে দেয় সত্য সুহাসের সামনে।
সুহাস স্বল্পভাষিণী, নেহাৎ অস্থির হয়েই চেঁচিয়ে উঠেছিল। আর কথা বলে না, নিঃশব্দে আদেশ পালন করে। শুধু অলক্ষ্যে বার বার দেখে নেয় সত্যকে। রহস্যময়ী সত্যকে।
গাড়ির ভাড়া দিয়ে গাড়োয়ানকে বিয়ে করে সত্য সেই মেয়েমানুষটিকে বলে, নাও বসো, হাতেমুখে একটু জল দাও, একটু মিষ্টিমুখ কর, তবে যেও।
মেয়েমানুষটি হৃষ্টচিত্তে বলে, আবার মিষ্টি কেন মা? তোমার ঘরদোর দেখলাম, চিনে গেলাম, এই ঢের। তোমার মিষ্টি কথাই মিষ্টি মা, শুনলে শরীর শীতল হয়।
তা হোক, তুমি আমার জন্যে এতটি করলে, একটু মিষ্টিজল না খাইয়ে ছাড়ব না। বলে সত্য ফট করে গায়ের সিল্কের চাঁদরটা রেখে কলের ঘরে ঢুকে কাপড়টা সেমিজটা কেচে ফেলে ভিজে কাপড়েই ভাঁড়ার থেকে দুটো নারকেল নাড়ু বার করে এক ঘটি জল দিয়ে খেতে দেয়।
মেয়েমানুষটি বিদায় নিলে সত্য শুকনো কাপড় পরে ঘরে এসে বসে সুহাসকে উদ্দেশ্য করে বলে, তার পর? আমার নামে হুলিয়া বেরিয়ে গেছে বোধ হয়?
সুহাস অন্যদিকে ঘাড় ফিরিয়ে বলে, হুলিয়া আবার কি? পিসেমশাই অস্থির হয়ে বেরিয়ে গেলেন, এই পর্যন্ত।
এই একদিনেই তোর পিসের কাছে আমার সব কীর্তি ফাঁস হয়ে গেল দেখছি– সত্য বলে, পাঠশালার খবরটা এযাবৎ চেপেচুপে ছিলাম
সুহাস বোধ করি আজকের সুযোগে তার মনের সন্দেহটা প্রকাশ করে বসে। মুখ তুলে ঝপ করে বলে ফেলে, তা চাপাচাপিই কি ভাল? এদিকে তো তোমরা নিজেরাই বল স্বামী মেয়েমানুষের দেবতা।
সত্যর মুখে আসছিল বলে, তোর যে দেখি স্বামী না হতেই স্বামীভক্তি! কিন্তু সামলে নেয়। কে জানে মেয়েটার কপালে স্বামী আছে কিনা। নিরুপায় বুদ্ধিহীন মা তো কুমারী মেয়েকে বিধবা পরিচয় দিয়ে তার ভবিষ্যতের পায়ে কুড়ল মেরে রেখে গেছে। এই রূপে ডালি মেয়ে, সভ্য, নম্র, লেখাপড়ায় কত চাড়, এ মেয়েকে যে স্বামী পেত, সে তো ধন্য হত!
কিন্তু হয়তো দুঃখিনীর ভাগ্য দুঃখেই যাবে। তবু মনে স্থির করে রেখেছে সত্য, শেষ অবধি লড়বে মেয়েটার জন্যে। তাই না ব্রহ্মজ্ঞানীদের সম্পর্কে ঔৎসুক্য সত্যর, তাদের সঙ্গে চেনাজানার বাসনা।
ব্রহ্মজ্ঞানীরা নাকি খুব উদার।
বালবিধবা মেয়ের বিয়েতে নিন্দেও নেই তাদের। সত্য প্রথমে ভেবেছিল সত্য ঘটনা প্রকাশ করে দেবে সুহাসের কাছে।
কুমারী পরিচয়েই স্কুলে ভর্তি করে দেবে তাকে, কিন্তু সাতপাঁচ ভেবে সে ইচ্ছে স্থগিত রাখতে হয়েছে। প্রথম তো এত বড় আইবুড়ো মেয়ের কৈফিয়ত অনেক, জাত যাওয়ার প্রশ্নও আছে। তা সে হয়তো সত্য তার ন্যায়ভাষণের জোরে একরকম করে মানিয়ে নিত, গরীবের মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিতে পারে না সমাজ, জাতটা নিয়ে নিতে পারে? এ তর্ক তুলত। কিন্তু বাধা অন্যদিকেও।
এত বড় নিষ্ঠুর সত্য প্রকাশ হয়ে পড়লে মাকে কী ভাববে সুহাস? কোন দিনই কি প্রাণ থেকে ক্ষমা করতে পারবে মাকে? যখন শুনবে কেবলমাত্র নিজের সুবিধার্থে মা তার কপালে দুর্ভাগ্যের ছাপ দেগে রেখে দিয়েছে, আজকাল খাওয়া পরা থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে, মা কি নিতান্ত ছোট হয়ে যাবে না তার চোখে? স্বার্থপরতার নির্মমতায়? সে যে মড়ার ওপর খাড়ার ঘা!
আর যদি মাকে সে দেবীর আসনে বেদীতে বসিয়ে রেখে থাকে, বিশ্বাসের ভালবাসার ভক্তির নড়চড় না হয়, তা হলে হয়তো বা সত্যকেই সন্দেহ করে বসবে। ভাববে সত্যই এখন তার বিয়ের সুবিধে করতে
এই সব সাতপাঁচ ভেবেছে সত্য সুহাসের সম্পর্কে। ভেবেছে, থাক, আর একটু জ্ঞানবুদ্ধি বাড়ুক। সত্যিমিথ্যে বোঝবার চোখ হোক। তখন দেখা যাবে।
তাই এখন ওদিক দিয়ে না গিয়ে সত্য দোষ মেনে নেওয়ার ভঙ্গীতে বলে, স্বামী দেবতা এ কথা শুধু আমরা কেন, ত্রিজগতের সবাই বলে। কিন্তু দেবতার অসন্তোষ ঘটানোও তো দোষের রে। আমি পাঠশালা খুলে গুরুমশাইগিরি করছি শুনলে তোর পিসে অসন্তোষের পরাকাষ্ঠা করবে বৈ তো না? অনর্থক রাগিয়ে দিয়ে লাভ? তাকেই মনে যন্তন্না দেওয়া। আর না বুঝেসুঝে দুম করে যদি বারণ করে একটা দিব্যিদিলেশা দিয়ে বসে, তাতেও তো বিপদ।
সুহাস একটু চুপ করে থেকে আস্তে আস্তে বলে, তা পিসেমশাই যাতে রাগ করতে পারেন, সে কাজ তোমার না করাই উচিত।
সত্য সুহাসের এই সদ্বিবেচনার কথায় খুশি হয়, তবে সত্য মনে মনে একটু হাসে। ভাবে তাই যদি উচিত হত, তুই কোথায় থাকতিস বাপু? এত কথা ভাববার মত বুদ্ধিই বা পেতিস কোথা থেকে? কম লড়ালড়ি করতে হয়েছে ওর সঙ্গে তোর জন্যে? তোকে কাছে রাখা নিয়ে তো বটেই, তাছাড়া ইস্কুলে ভর্তি করা নিয়ে?
সাহেবী ইস্কুলে পড়ালে মেয়েকে, সে মেয়ের হাতের জল খাওয়া চলবে না, এ বলেও নিবৃত্ত করতে চেয়েছে নবকুমার। তবু সত্য ব্যাপারটা ঘটিয়ে তুলেছে।
