তোদের দাদামশাইয়ের কথা বলছিস? তার কথা বাদ দে। তিনি হলেন হাজারে একটা। তবে তিনি কি আর তোর এই ঠাকুদ্দার মতন বদ্ধজলা? তিনি হলেন নদীর মতন। শুধু পাড়াগাঁয়ে কেন? শহর-বাজারেই তার অনেকদিন পর্যন্ত কেটেছে। তা হ্যাঁ রে মামারবাড়ি যাস-টাস না?
না তো!
যাস না? আমি বলি, এখন তোর মা স্বাধীন হয়েছে, হয়তো।
হঠাৎ সরল ফট করে বলে বসে, মা আবার একলা একলা কি স্বাধীন হল? আমাদের দেশেরই কেউই তো স্বাধীন নয়, ভারতবর্ষটাই তো পরাধীন!
সদু কথাটা চট করে অনুধাবন করতে পারে না, বলে, ভারতবর্ষটা কি বললি?
পরাধীন, পরাধীন! গোরা সাহেবরা রাজা নয়?
সদু বিস্ময়ে প্রশ্ন করে, ওমা? শোন কথা, ওদের রাজ্য ওরা রাজা হবে না?
বাঃ, ওদের রাজ্য কি করে হবে? ওরা কি আমাদের এ দেশের লোক?
তা ওরা তো রাজার জাত? তা ছাড়া ওরা সমুদ্রের ওপার থেকে এসে তোদের কত ভাল করছে।
ভাল করছে না হাতী! অনেক লোকসানই করেছে বরং। আর মা বলেন, যে যার নিজের দেশের মালিক হবে এই নিয়ম। যারা পরের দেশে এসে লোভ করে সেখানে শেকড় গেড়ে বসেছে, তাদের
সদু অবাক হয়ে বলে, এই সব কথা বলে তোদের মা? তা হলে তো দেখছি মামী যা বলে মিথ্যে নয়! মাথারই দোষ! কিন্তু ওসব কথা বলতে নেই রে থোকা, সাহেবরাই তোদের বাপের অন্নদাতা।
অন্নদাতা কথাটার সম্যক অর্থ বুঝতে না পেরেই বোধ করি সরল উত্তর দেয় অন্য পথে, মা তো সাহেবদের নিন্দে করেন না, শুধু বলেন, সব ছেলেরই মনে এই চিন্তা নিয়ে মানুষ হওয়া দরকার, পৃথিবীর মধ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে। তা দেশটাই যাদের পরাধীন, তারা আর মাথা উঁচু করবে কি করে?
সদু হতাশ নিশ্বাস ফেলে বলে, কি জানি বাবা, ওসব কথার মর্ম বুঝি না। তোর মায়ের চিরদিনই চোটপাট কথা, উদভুট্টে বিদঘুট্টে চিন্তা। এত দেশ থাকতে কিনা সাহেব বাঙালী নিয়ে মাথা ঘামানো, কে রাজা কে প্রজা তার ভাবনা! আজন্ম পরাধীনতায় কাটল, স্বাধীনতা কাকে বলে তাই জানলাম না। তার মর্ম বুঝবো কি ছাই! মানুষ পরাধীন হয় তাই জানি, দেশের আবার স্বাধীন পরাধীন? যাক গে মরুক গে ওসব কথা, তোর মা নাকি গুরুমশাইগিরি করতে যায় রে?
সাধন সরল দুই ভাই একবার মুখ-চাওয়াচাওয়ি করে, তার পর সরলই সহসা সবেগে বলে ওঠে, তা বল না দাদা, ভয়টা কি? মা তো বলেছেন, লুকোচুরি মিথ্যে কথা, এর বাড়া পাপ নেই। তবে বাবাকে বলতে মানা, বাবা পাছে মাকে যেতে নিষেধ করেন। নিষেধ করলে তো মুশকিল। অথচ মাস্টার মশাই বলেছেন-।
সদু চোখ কুঁচকে বলে, মাস্টার মশাই কে?
বাঃ, মাস্টার মশাই কে জান না? ভবতোষবাবু! বাবাকে যিনি—
বুঝেছি বুঝেছি! তা সে না ব্রহ্মজ্ঞানী হয়ে গেছে?
সাধন ভয়ে ভয়ে মাথা কাত করে।
তার সঙ্গে বৌ কথা কয়?
সাধন ততোধিক নম্রতায় আর একবার মাথা কাত করে।
ব্রহ্মজ্ঞানী হয়ে যাবার পরও তোদের বাড়িতে আসে সে?
না, বাড়িতে আসে না, সরল গম্ভীরে ভাবে বলে, বাবা তো তার মান রাখেন নি, বাড়িতে ঢুকতে বারণ করেছেন। তাই মা বলেন, বেশ, আমিই তাঁর বাড়ি যাব। মাস্টারমশাই কত উপকারী।
সদু গালে হাত দিয়ে বলে, তোমার কথা শুনে আমি তাজ্জব হয়ে যাচ্ছি তুড়ু ইচ্ছে হচ্ছে গিয়ে দেখে আসি তোদের মার আর দুখানা হাত-পা বেরিয়েছে কিনা। যা ত্রিভুবনে কেউ শোনে নি, সেই সব ঘটনা ঘটাচ্ছে সে? কিন্তু এও বলি, এক-কালে মাস্টার উপকার করেছে বলে এখন জাতধর্ম নষ্ট করার পরও কি দরকার তার কাছে যাবার?
যে কথা মনে আনাও পাপ, হঠাৎ তেমনি একটা সন্দেহ দংশন করে ওঠে সদুকে। তাই এই প্রশ্ন।
কিন্তু সাধন ততক্ষণে সদুত্তর দিয়েছে।
পাঠশালা তো মাস্টার মশাই-ই বানিয়েছে। বুড়ো বুড়ো গিন্নীরা অ আ ক খ শিখতে আসে। মাস্টার মশাই বলে, দিনভোর গালগল্প করে, তাস খেলে আর কোদল করে নয়তো বা ঘুমিয়ে নষ্ট করার চাইতে কত ভাল কাজ লেখাপড়া শেখা, তাই সর্বমঙ্গলা তলায় দুপুরবেলায় ওই পাঠশালা খুলে দিয়েছে। তোমাদের মতন বড়রাও পড়তে আসে।
সদু একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলে, এজন্মে যদি কখনো মরি, তবে আবার তোদের ওই কলকাতায় জন্মাব, আর তোর মার ইস্কুলে পড়ব।
তা এখনই তো পড়তে পার?
পারব সেই একেবারে যখন চিতায় শোব! নে, ভাত কটা যে পাতে পড়েই আছে।
খাচ্ছি। বাবা, রাতদিন যা খাচ্ছি আর পেটে ধরছে না!
তবে থাক, জোর করে খাস নে।
সাধন সদুর সেই হঠাৎ স্থির হয়ে যাওয়া মুখটার দিকে একটুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আস্তে বলে, পিসি, তুমি চল না আমাদের সঙ্গে
আমি? সদু হঠাৎ চড়ে উঠে বলে, আমি কলকাতায় যাই আর এই বুড়ো-বুড়ী দুটো না খেয়ে মরুক!
আহা চিরকাল কি? দু-একদিনের জন্যে বেড়াতে
থাক বাবা। তুই যেতে বললি এই ঢের, বেড়াতে আর এজন্যে কোথাও যাচ্ছি না, যাব তো চিরকালের মতন সেই যমরাজের বাড়িতে। তবে বড় হয়েছিস তুই, চুপি চুপি একটা যদি কাজ করতে পারিস। কাউকে কিন্তু বলতে পাবি না। যে বলবে সে আমার মরা মুখ দেখবে–
আহা কি কাজ তাই বল না?
বলছি– তোদের ওই বাগবাজারেই, তাই বলছি। ওখানের একটা বাসার ঠিকানায় একখানা চিঠি দেব, পৌঁছে দিতে পারবি?
সাধন মহোৎসাহে বলে, কেন পারব না, কত নম্বর বল?
লেখা আছে দেব। কিন্তু শোন কেউ যেন না জানতে পারে।
জানতে না পারে? কেন বল তো পিসি?
পরে বলব।
৩৮. হারিয়ে যাওয়া সত্য
হারিয়ে যাওয়া সত্য যখন ফিরল, তখন সন্ধ্যে হয়-হয়। একটা ভাড়াটে ঘোড়ার গাড়ি থেকে নামল সত্য, সঙ্গে একটি গিন্নীবান্নি বিধবা।
