আর সত্য? তার যদি বা কোন সাধ থেকেও থাকে, এলোকেশীর কথা ভেবে সে তুলে রেখেছে। সমারোহ করতে গেলেই তো তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। এ বরং কদিন ঝিকে রাত্তিরে থাকতে বললেই বেশ থাকতে পারবে সত্য। তাই থেকেছে।
ভারি তো মনিষ্যি সাধন সরল, তুড়ু খোকা ছাড়া পোশাকী নামে যাদের আজ পর্যন্ত কেউ ডাকে নি, বড় একেবারে খাইয়ে, তবু তাদের জন্যে পুকুরে জাল ফেলা হচ্ছে, টাটকা চিড়ে কোটানো হচ্ছে, পিঠে পায়েস, নাড়, পাটিসাপটা গোকুলপিঠে, ক্ষীরতক্তি ইত্যাদি করে যতরকম জানা আছে এলোকেশীর, একটু ভুল বলা হলে– যত রকম বানাতে জানা আছে সদুর, সব চলছে একধার থেকে।
নাকে নল ছেঁচে যাচ্ছে সদুর।
নীলাম্বর অবশ্য এক-আধবার বলছেন, ওরে তোদের পেট-টেট ভাল আছে তো? দেখিস, দিনকাল ভাল নয়। শেষে আবার কলকাতায় ফিরলে তোদের মা না বলে ঠাকুরমার কাছে আদর খেয়ে পেটের রোগ ধরিয়ে এনেছে!
কিন্তু এলোকেশী সে কথায় কর্ণপাত মাত্র করছেন না।
নাতিদের অসুখ এবং বৌয়ের কথা শোনানো সম্পর্কে তার মনে লেশমাত্রও ভয় আছে বলে মনে হচ্ছে না। বরং ঝঙ্কার দিয়ে বলে উঠেছেন, তুমি থাম তো! অসুখই বা হতে যাবে কেন? বালাই ষাট। আমি কি পচা পান্তো খাওয়াচ্ছি নাতিদের? অসুখ যদি হয় তো বলতে হবে যে ওদের গর্ভধারিণীর গুণেই হয়েছে। শহরে গিয়ে শহুরে চাল ধরেছেন, ছেলে দুটোকে আধপেটা খাইয়ে খাইয়ে পেট মেরে রেখেছেন। সারা দিনমানে একবার বৈ দুবার ভাত নয়।… আর নবুকে আমার আমি তিনবার করে ভাত দিতাম। সকালবেলা কী খাচ্ছে ছেলেরা, না গজা জিলিপি তিলকুট! দোকান থেকে কিনে আনিয়ে রাখে। কেনা খাবারে ছেলেপিলের পেট ভরে? কেন সকালে একবার দুটো ফেনাভাত দিতে হাতে পোকা পড়ে?… ইস্কুল থেকে এসে খাবার কি? না পরোটা! খিদের সময় ময়দা? দেখলে চোখ ফেটে জল আসে না ছেলেদের?… নবু আমার একদিন যদি ইস্কুল থেকে এসে মাছভাতের বদলে অন্য কিছু দেখেছে তো ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে কেঁদেছে!
সদু এক আধবার বলতে চেষ্টা করেছিল, তা নবুর ছেলেদেরও যে কান্না আসে, তা বলেছে ওরা তোমাকে?
এলোকেশী সে কথাও উড়িয়েছেন।
বলেছেন বলবে আর কোন সাহসে? যে খাণ্ডারনী মা, ভয়ে তার বিপক্সে কথা একটা বলতে পারে? বড়টাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে যদিবা দু-একটা পেটের কথা টেনে বার করছি, ছোটটা একেবারে তুষোড় পাকা। জানে কথা প্রকাশ পেয়ে গেলে মা আর আমার কাছে পাঠাবে না, তাই
আহা প্রকাশেরই বা আছে কি? বৌ তো আর বাসায় গিয়ে চুরি ডাকাতি করছে না?
চুরি-ডাকাতি না করুক, অনেক কাণ্ডই তো করছে। কোথাকার একটা অখদ্যে-অবদ্যে ছুঁড়িকে তো পুষছে, তাকে পয়সা খরচ করে ইস্কুলে দিয়েছে, বই খাতা কিনে দিচ্ছে, সে তো গেল! নিজে নাকি রোজ দুপুরে কোথায় গিয়ে মেয়ে পড়াচ্ছে। বিদ্যেবতী লীলাবতী! বলি চুরি-ডাকাতির চেয়ে কমটাই বা কি হল তা হলে? বাবার জন্মে শুনেছিস কেউ এ কথা? ভদ্রঘরের বৌ যায় গুরুমশাইগিরি করতে হলে?
নীলাম্বরও অবশ্য এ সংবাদে ছিটকে উঠেছিলেন, গাল দিয়ে নবকুমারের পিতৃশ্রাদ্ধ ঘটিয়ে সংকল্প ঘোষণা করেছিলেন, নিজে গিয়ে খড়ম পেটা করে ছেলে বৌকে গায়ে ফিরিয়ে নিয়ে আসবেন, পরে সে সংকল্প ত্যাগ করেছেন। বলেছেন, নাঃ, গায়ে এনে আর দরকার নেই! জাত যা যাবার তা। তো গেছেই, ও বৌয়ের হাতের ভাত তো আর খাচ্ছি না আমরা, মিথ্যে আর ধরা-বাঁধার দরকার কি? এ বরং বাইরে আছে, এখানে আনলেই তো পাড়া জানাজানি। ঘোমটা দিয়ে কোণে বসে থাকবার বৌ যখন নয়, তখন চোখের আড়ালে থাকাই মঙ্গল। বরং ছেলে দুটোকে যদি হাত করতে পার সেই চেষ্টা দেখ। আখেরে বুড়ো-বুড়ীকে দেখবার একটা তো চাই!
এলোকেশী গলা খাটো করে মুচকি হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, সে চেষ্টার কসুর করছি মনে করছ? মায়ের ওপর মন বিষ করে তোলবার জন্যে, মায়ের যত গুণাগুণ সবই ব্যক্ত করছি। তবে মায়াবিনীর যে মহামন্তর জানা! ছেলেরা মাতৃভক্তিতে ডগমগ! মন্তর নইলে আমার নিজের পেটের ছেলেটা অমন পর হয়ে যায়?
সাধন সরল অবশ্য ভেতরের এত কথা জানে না, তারা প্রাণভরে ছুটির আনন্দ উপভোগ করছে। কলকাতার ধরা-বাঁধা জীবনের বাইরে এসে, শৈশবের লীলাভূমি ফিরে পেয়ে, মাঝে মাঝে সত্যিই মায়ের ওপর রাগ হচ্ছে তাদের। মার জেদের জন্যেই যে কলকাতায় বাস, সেটা সবিস্তারে এবং স নিয়ে শুনছে তো উঠতে বসতে।
তবে সদু ন্যায্য কথা কয়।
অবশ্য মামীর সামনে তত নয়, কারণ এলোকেশীর রণরঙ্গিণী মূর্তিকে সে বড় ডরায়। রাতের খাওয়ার সময় একলা পায় ভাইপোদের, এলোকেশী সন্ধ্যার মধ্যে বিছানা নেন। সদু ভাত বেড়ে দিয়ে কাছে বসে গল্প করে। বলে, ঠাকুরমার কথায় তোমাকে দুষছিস, বলি মা যাই টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেছল তাই না এই বয়সে এতটা পড়া করেছিস, ভাল ভাল করে পাস করছিস। এখানে থাকলে হত এসব? দেখছিস তো এখানে তোদের বইসী ছেলেদের। কেউ এরই মধ্যে পড়া ছেড়ে দিয়ে মাছ ধরছে আর তামাক খাচ্ছে, কেউবা একটা কেলাসে তিন-চার বছর ঘষটাচ্ছে। না সভ্যতা, না ভব্যতা। বামুনের ঘরের ছেলেটা আর চাষার ঘরের ছেলেটার তফাৎ বোঝবার উপায় নেই।
সাধন ঠাকুমার মুখের বচন ঝেড়ে বলে, তা এত এত দিন, এত এত যুগ ধরে লোকে তা দেশগায়েই থেকেছে? তারা কি আর মানুষ নয়? মায়ের বাবাও তো পাড়াগাঁয়ের ছেলে?
