চুপ সত্যিই তখন করেছিল ভাবিনী।
বোধ করি অস্নাত অভুক্ত স্বামীকে পরাজিত শত্রুপক্ষের মতই দেখতে লেগেছিল বলে অস্ত্র সংবরণ করেছিল।
কিন্তু নিতাই ছটফটিয়ে বেড়িয়েছিল পাগলের মত।
বৌঠানের দ্বারা এসব সম্ভব?
লুকোচুরি, অভিসার, ব্রাহ্মসমাজের যাতায়াত, ভবতোষের সঙ্গে চুপি চুপি মেলামেশা! ভাবিনীর অভিযোগ যদি সত্যিই হয়, তা হলে তো ধর্ম মিথ্যে, ভগবান মিথ্যে, জগতে যা কিছু বস্তু আছে সবই মিথ্যে!
অসুস্থ শরীর, না-স্নান, না-আহার আরও উদ্ভ্রান্তি আনছিল। ভাবিনী এক-সময় এসে পায়ে ধরে মাপ চেয়ে দুটো নারকেলনাড়ু আর একটি ঘটি জল নিয়ে সেধেছিল, গলা দিয়ে নামাতে পারে নি নিতাই, পরে হবে- বলে সরিয়ে রেখে বালিশে মাথা ঘষতে ঘষতে অবশেষে একসময় ঘুমিয়েও পড়েছিল।
ওবেলা ঘটেছিল এসব।
ঘুম ভাঙ্গল পড়ন্ত বেলায় নবকুমারের ডাকে।
নবকুমার ব্যস্তসমস্ত হয়ে ঠেলা মেরে প্রশ্ন করছে, নিতাই নিতাই, তোদের বৌঠান এসেছে এ বাড়িতে?
ধড়মড়িয়ে উঠে বসে নিতাই।
উপবাসক্লিষ্ট শরীরের মাথাটা ঝিমঝিম করে ওঠে, প্রশ্নের কথাটা চট করে হৃদয়ঙ্গম হয় না। তাই উত্তরের বদলে নিজেই সে প্রশ্ন করে, কি? কে এসেছে?
আরে বাবা তোর বৌঠান ছাড়া আর কে? আর কাকে খুঁজে বেড়াব আমি? ভেতরে গিয়ে একবার খবর নিয়ে আয় দিকি, বৌমার কাছে বেড়াতে এসেছে কিনা?
নিতাই হতচকিত দৃষ্টি মেলে আস্তে মাথা নাড়ে।
কী মুশকিল! বসে বসে হাত গুনছিস কেন? তুই তো ঘুমোচ্ছিলি মদ্দারাম! ইত্যবসরে এসেছে কিনা
এতক্ষণে বড়সড় একটা কথা বলে নিতাই ভেবেচিন্তে, কেন, বাড়িতে নেই?
এই দেখ! থাকবে যদি তো আমি ছুটে এসে হামলা করছি কেন? ওঠ তুই একবার
অগত্যাই উঠতে হয় নিতাইকে।
এবং বাড়িতে তৃতীয় ব্যক্তি না থাকার অসুবিধেটা হঠাৎ এখন স্পষ্ট করে উপলব্ধি করে নিতাই।
ভিতরে গিয়ে ওই প্রশ্নটা এখন করতে হবে ভাবিনীকে! নিতাইয়ের মুখ থেকেই বার করতে হবে, বৌঠান এসেছেন?
উত্তরটা যা আসবে সে তো নিতাইয়ের জানাই। নেহাৎ নবকুমারের নির্দেশেই ওঠা। নইলে সত্যবতী এসেছে, আর নিতাই টের পায় নি? ঘুমিয়েছিল বৈ তো মরে ছিল না?
খানকয়েক বাড়ির ব্যবধানেই দুটো বাড়ি। আসা-যাওয়া তো আছেই। ভাবিনী আসার পর তার সুবিধে অসুবিধে দেখতে প্রথম প্রথম খুবই এসেছে সত্য, কিন্তু ভাবিনীর অনাগ্রহেই যাওয়াটা আসাটা কমিয়ে ফেলেছে।
কিন্তু সে সব আসা বেশীর ভাগই নিতাইয়ের অনুপস্থিতিতে। উপস্থিতিতে দৈবাৎ। আজই কি আর হঠাৎ সেই সৌভাগ্য–
নবকুমারের অধীরতায় উঠে গেল নিতাই। ভিতরের গিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরে চলে এসে মাথা নাড়ল।
মান খুইয়ে জিজ্ঞেস আর করতে হল না।
দেখল ভাবিনী একা বসে সন্ধ্যের অন্ধকার তুচ্ছ করে কথাখানাই সেলাই করছে। ভরসন্ধ্যেয় যে উঁচসুতো হাতে করতে নেই, এ শিক্ষাও যেন বিস্মৃত হয়ে গেছে ভাবিনী।
কী হবে নিতাই? নবকুমার প্রায় ভ্যাঁক করে কেঁদে ফেলে।
নিতাই শুষ্কমুখে বলে, আর কোথাও গেছেন হয়তো!
আর কোথায় যাবে? একা আর কোথা যাবে? নবকুমার কাতর ভাবে বলে, কপালক্রমে ঠিক এই সময় তুড়ু খোকা দুদিনের জন্যে ওদের ঠাকুমা-ঠাকুদ্দাকে দেখতে বারুইপুর গেছে–
একা গেছে? চমকে ওঠে নিতাই।
না না! আমাদের অবনী যাচ্ছিল দেশে- ভাবলাম ওদের তো ছুটি রয়েছে, যাক দুদিন। দেশভিটে কিছুই তো চিনলো না! কী করে জানব এই ফাঁকে এই বিপদ হবে!
নিতাই আরও শুষ্ককণ্ঠে বলে, তোমার সঙ্গে কোনও বচসা-টচসা হয় নি তো? মানে গঙ্গার দিকেটিকে
না না। সে সব কিছু নয় নিতাই। তবে আমাকে না জানিয়ে তো তুড়ুর মা কোথাও—
আবেগের মুখে এসেছিল নিতাইয়ের, তা তিনি যান। শুনেছি সে খবর
কিন্তু আবেগকে প্রশমিত করে। আস্তে আস্তে অন্য কথা বলে, সেই যে মেয়েটা মানে সুহাস আর কি– সে নেই?
সে তো ইস্কুল থেকে এসে পর্যন্ত না দেখে ভাবনা করছে। ঝিটাও কিছু জানে না। কী হবে নিতাই?
কী হবে, কী হচ্ছে, কী হতে চলেছে, তার কি কিছুই জানে নিতাই? তার শূন্য মস্তিষ্কে যেন সহস্র বোলতা শনশনিয়ে ওঠে। মাথার ভার ঘাড় বহন করতে রাজী হয় না। বালিশে ধপ করে মাথাটা ফেলে ভাঙা গলায় বলে ওঠে নিতাই, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
কিন্তু আর একজন তো সবই বুঝতে পেরে ফেলেছে।
নিতাইয়ের ওই একবার নিঃশব্দে অন্তঃপুরে পাক খেয়ে আসার পরমুহূর্তেই কাঁথা ফেলে উঠে এসেছে ভাবিনী।
দরজার ফাঁকে চোখ কান রেখে আড়ি পেতে এপিঠের কথাবার্তা শুনেছে, এবং শুনেই সমস্ত রহস্য হৃদয়ঙ্গম করে ফেলেছে।
একটা বদ বিচ্ছিরি মেয়েমানুষের জন্যে দু-দুটো দস্যিপুরুষ যে এরকম মচ্ছি হয়ে পড়বে, এও তো অসহ্য! চোখে দেখাই শক্ত!
ওই অসহ্য ব্যাপারটা আর বেশীক্ষণ বরদাস্ত করতে পারে না ভাবিনী, ঠনঠনিয়ে দরজার শেকলটা নেড়ে দেয়।
সেই ঠনঠনানির মধ্যে যেন কোনও রহস্যবার্তার ইশারা।
.
ছেলের বৌ যেমনই হোক, নাতি বড় জিনিস। বংশধর, সর্বেশ্বর, নাড়িতে নাড়িতে বাঁধন। ছেলে দুটো আসা অবধি এলোকেশী যেন উথলে বেড়াচ্ছেন। অবিশ্যি সঙ্গে সঙ্গে বৌয়ের নিন্দেরও বিরাম নেই। যে ছোটলোকের বেটী’ তাঁকে এই পরম বস্তু থেকে বঞ্ছিত করে রেখেছে, তার যে কখনো ভাল হবে না, এ বিষয়ে শেষ রায় দিয়ে এলোকেশী নাতিদের যত্নে তৎপর হয়ে বেড়াচ্ছেন। কারণ এবার ওরা একা এসেছে। কোন-কোনবার পূজোয় আসে, বাপের সঙ্গে তিন-চারটে দিন মাত্র থাকে, বিশেষ হাতে পান না। না, সত্য আর আসে নি। এলোকেশী আর তার মুখ দেখতে চান না, সেটা বড় গলায় জানিয়ে দিয়েছেন। ছেলেদের পৈতে দিয়ে গেছে ভিটেয় এসে, তাও নবকুমার একা। দুই ছেলের একসঙ্গে মাথা মুড়িয়ে দিয়েছে। কৃপণস্বভাব নীলাম্বরের বাড়িতে সমারোহময় কাজের ধরনও নেই। নবকুমার শেখে নি।
