তাই শেষরক্ষে হল না। নিতাইয়ের কথাটা শেষ হবার আগেই ভাবিনীও “রে-রে” করে তেড়ে এল।
কী! কী বললে? আর একবার বল তো শুনি? তোমার পেয়ারের বৌঠানের কাছে আমি যাব রান্না শিখতে? বলি আর কত অপমান তুলে রেখেছ আমার জন্যে? যা রেখেছ একসঙ্গে বার কর। একেবারে বুকে ভরে নিয়ে মা-গঙ্গার কোলে আশ্রয় নিই গে!– রেখে এস, আজ আমায় রেখে এস বারুইপুরে। এত অপমান সয়ে থাকতে পারব না, এই বলে দিলাম সাদা বাংলা ওগো মাগো, এই সুখ করাতে তুমি আমায় শহরে এনেছিলে? ঝাড় মারি আমি অমন সুখের মাথায়! ভাবছিলাম দোষ হয়ে গেছে, ঘাট মানব, চুকে যাবে ন্যাটা, তার আর ডালপালা গজাবে না। ওমা এ যে দেখি থামেই না! শক্তের ভক্ত আর নরমের যম তুমি, কেমন? উঠতে বসতে নড়তে চড়তে খালি বৌঠান আর বৌঠান! বলি এতই যদি মন্তরপূত করে রেখেছিলো বৌঠান তো আমাকে আবার আনতে গেলে কেন? লোকের কাছে মুখ রাখতে? শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে? তোমার–
আবার শেষ ঘাটে ধাক্কা!
আবার কথার উপর হাতুড়ি!
নিতাই আসন থেকে দাঁড়িয়ে উঠে গলা ফাটিয়ে বলে, কী বললি?
অ্যাঁ! তুই! তুই বললে তুমি আমাকে হাড়ি-কাওরার মতন? এও বোধ হয় শহুরে সভ্যতা? ভাবিনী ধেই ধেই করে ওঠে, তোমায় আমি কড়ে আঙ্গুলের ছেদ্দা করি না, বুঝলে? কানা কড়ার না। দুশ্চরিত্র স্বামী আবার স্বামী?! আমি যাব সেই মায়াবিনী ডাকিনীর কাছে শিক্ষে করতে! গলায় দেবার দড়ি জুটবে না আমার? যাও তুমি যাও, দু-বেলা তার পাদোদক খাও গে
নিতাই সহসা গম্ভীর হয়ে যায়। হাত দুখানা আড়াআড়ি করে বুকের ওপর রেখে বার দুই পায়চারি করে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে বলে, পাদোদক যদি জোটে তো শুধু খাবো কেন, মাথায় মেখে বর্তাব! তবে এই তোমার মতন মেয়েমানুষেরও সেটা করা উচিত। বিশ বছর তার পায়ের কাছে বসে শিক্ষে করলে, আর দুবেলা পা-ধোয়া জল খেয়ে যদি তাঁর কড়ে আঙ্গুলের নখের যুগ্যিও হও!
নিতাই চরম অভিব্যক্তিতে তার হৃদয়ের শ্রদ্ধা প্রকাশ করতে পারে, কিন্তু স্ত্রীর পক্ষে যে পরস্ত্রীর প্রতি এ শ্রদ্ধা প্রকাশ কাটাঘায়ে নুনের তুল্য তাতে তো আর সন্দেহ নেই। অতএব এর পর ভাবিনী যদি কোমরে কাপড় জড়ায়, তাকে দোষ দেওয়া যায় না। ভাবিনী জীবনাবধি যা দেখেছে তাই শিখেছে। দেখার ঊর্ধ্বে শেখবার মত অনুভূতি কটা মেয়েমানুষের থাকে?
তা ছাড়া যে মেয়েমানুষ যতই নীরেট হোক নির্বোধ হোক, স্বামী মন পেলাম কিনা বুঝতে বাধে না তার। আর সে মনের অধীশ্বরী যদি আর কেউ থাকে, তাকে চিনতেও দেরি হয় না। কলকাতার মাটিতে পা দিয়েই তাকে চিনেছে ভাবিনী। সেই জ্বালাকর সত্যটা বুঝে ফেলেছে।
এই ভয়ঙ্কর জ্বালা ভাবিনী মহান উদারতায় সহ্য করে যাবে, এ তো আর হয় না।
অতএব কোমরে কাপড় জড়িয়ে কী যেন একটা ছড়া আউড়ে ছিটকে কাছে সরে আসে ভাবিনী।
বটে! বটে! কড়ে আঙ্গুলের যুগ্যি! চরিত্রহীন পুরুষের উপযুক্ত কথাই বলেছ! পরের ইস্তিরীর সবই মিষ্টি যাদের! বলি তোমার প্রাণের নিধি বৌঠানের সব ‘খেলা’ জান? ও কথা তুলি না, তুলতে পিরবিত্তি হয় না তাই বলি না। তুললেই তো পুরুষের মুখ বুক সব খুলে যাবে। যা দেখবে তাই সুচক্ষে দেখবে। নইলে জেনেছি অনেকদিন। এইবার তোমায় জানাই স্বামীকে লুকিয়ে রোজ ভরদুপুরে বিবিটি সেজে কোথায় যান গিন্নী, জান সেকথা?
স্বামীকে লুকিয়ে মানে?
নিতাই যেন দুর্বল পক্ষ হয়ে পড়ে। অতএব সবল পক্ষ ভাবিনী কুটিল হেসে বলে, নুকিয়ে মানে নুকিয়ে! ঝি মাগীই বলেছে আমার ঝিকে, ছেলেদেরকে শেখানো আছে বলিস নে।
নিতাই বিশ্বাস করতে পারে না সত্যবতীর পক্ষে লুকোচুরি সম্ভব। তাই সগর্জনে বলে, বিশ্বাস করি না।
ওঃ, তাই নাকি? এইটুকুই বিশ্বাস কর না? আর শুনলে না জানি কি বলবে!… বলি তোমাদের ওই জাতধর্ম খোয়ানো মাস্টারটার সঙ্গে তলে তলে দহরম মহরম তা জান! তেনার সঙ্গে তো বেম্ভধর্মের আপিসে পর্যন্ত যাওয়া হয়েছিল। বলি নি এতদিন, ওর কথা তোমার কাছে কইতে ঘেন্না হয়, তাই বলি নি। আমি বলছি ও মেয়েমানুষ একদিন
খবরদার!
নিতাই তীব্র চীৎকারে এগিয়ে আসে, মিথ্যাবাদী! মিছিমিছি করে আর কিছু বলতে যাস তো জিভ খসে পড়বে! চুপ, একেবারে চুপ!
দিশেহারা দেখায় নিতাইকে।
একে তো দুটো অপবাদই ভয়ানক মারাত্মক, অথচ এমনই সর্বনেশে সত্যগন্ধী মত যে একেবারে উড়িয়ে দিতেও বুকে বল আসে না। তদুপরি আবার সেই ভবতোষ মাস্টার। মাস্টার জাতধর্ম খুইয়ে বেম্ভ হয়েছিল, নিতাইয়ের হাড়ে বাতাস লেগেছিল। ভেবেছিল অন্তত নবকুমারের বাড়িতে আসা-যাওয়ার পথে তার কাটা পড়ল!
কিন্তু এ কী কথা শোনা যায় মন্থরার মুখে? দিশেহারাই হয়ে যায় নিতাই।
এই সুযোগে ভাবিনী কোমরের আঁচলটা আর একটু শক্ত করে।
বলি গায়ের জোরে চুপ করিয়ে রাখলেই তো আর সত্যিটা মিথ্যে হয়ে যাবে না? আমি এই তোমায় বলে রাখছি, ওই তোমার পেয়ারের বৌঠান বেম্ভ হবে হবে হবে। ওই যে একটা বুড়ো ধিঙ্গী মেয়ে পুষেছে, মিছে করে বলে ভাইঝি, ভগবান জানেন বেধবা না আইবুড়ি, বয়সের তো গাছপাথর নেই, সেটাকে তো আর হিদুর সংসারে গছাতে পারবে না? তাই বেম্ভ হয়ে তার–
তুমি চুপ করবে?
ভাবিনী মুখে একটা আঙ্গুল ঠেকিয়ে ভেঙিয়ে উঠে বলে, তবে এই করলাম! কিন্তু আমি চুপ করলেই তো আর জগৎ চুপ করে থাকবে না? জানতে সবাই পারবে।
