কলকাতায় এসে নিতাই এই চালটি শিখেছে। আর একদিন অমনি সন্ধ্যেবেলা ফিরে বলে বসেছিল, দেহটা কেমন ম্যাজম্যাজ করছে, দুখানা রুটি গড়ো না। আটা নিয়েই এসেছি একেবারে।
সেদিন একটু অনৃতভাষণ করতে হয়েছিল ভাবিনীকে। স্বামীর কাছে মিথ্যা বলার পাপের জন্য অলক্ষ্যে একবার নাকটা কানটা মলে নিয়ে বলেছিল, ও হরি! তা কি জানি ছাই! ভাত তো চড়িয়ে ফেলেছি!
নিতাই অবশ্য রান্নাঘর খানাতল্লাস করতে যায়নি, তবে থাক তবে থাক বলে আটার ঠোঙাটা নামিয়ে রেখেছিল। সেই ঠোঙাসুদ্ধ আটা মজুত আছে নিতাইয়ের জানা, কাজেই বাসনাটা প্রকাশ করে ফেলে, অন্য চিন্তায় পড়ে না।
কিন্তু ভাবিনীর মাথায় যে দুশ্চিন্তার পাহাড় চাপল।
রুটি গড়তে পারব না বলাটাও যেমন কঠিন, রুটি গড়তে জানি না বলাটাও তেমনি কঠিন।
তবু শেষ চেষ্টা করে সে।
বলে, দিনদুপুরে শুকনো রুটি আর কেন খাবে তবে? বরং একটু খিচুড়ি চড়িয়ে দিই, তাই গরম গরম
না না, খিচুড়ি না, নিতাই ভাবিনীর আশার মূলে কুঠারঘাত করে, অন্ন দ্রব্যটা থাক, ওতে শরীর রসস্থ হয়। রুটিটা নেয়াৎ শুকনো না কর, গাওয়া ঘি একটু মাখিও। মেলা করো না, ওই খান বারো-চোদ্দ। অল্পাহারই ওষুধ!
অগত্যাই আটার ঠোঙা নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকতে হয় ভাবিনীকে ভাগ্যকে ধিক্কার দিতে দিতে। কোথায় আজ কাঁথাখানা মিটিয়ে ফেলবে আশা করছিল, আশা করছিল উনুনের দায়ে ধরা পড়বে না, সে জায়গায় কিনা একেবারে মাথায় আকাশ!
বলা বাহুল্য রুটির ব্যাপারে ভাবিনীর প্রচেষ্টা সাফল্যমণ্ডিত হল না।
কারণ প্রথমেই প্রয়োজনাতিরিক্ত জল ঢেলে আটাটাকে প্রায় শির্ণীতে পরিণত করে ফেলেছিল সে। তার পর যদিও ছিঁড়েখুঁড়ে বহুঁকোণবিশিষ্ট খানকয়েক আটার চাকলা বানাল হিমসিম খেয়ে, তাদের উনুনে ফেলে তুলতে তুলতে পুড়ে উঠল প্রায় সবগুলোই। অথচ আবার গঠন-সৌকুমার্যে জায়গায় জায়গায় কাঁচাও বর্তমান।
ওদিকে দুপুর গড়িয়ে যায়।
নিতাই অনুমান করে, নিজের জন্যেও রুটি করছে ভাবিনী। আর সে রুটির সংখ্যা অনুমান করে মনে মনে একটু হেসে ধৈর্য ধরে বসে থাকে।
কিন্তু ধৈর্যেরও তো একটা সীমা আছে। পেটের মধ্যে যে সাড়া উঠেছে।
বার বার সাড়া দিয়ে উসখুস করে অবশেষে রান্নাঘরের দরজাতেই এসে দাঁড়ায় নিতাই, কী এত নশো-পঞ্চাশ ব্যঞ্জন রাধ? বললাম যে শুধু দুখানা রুটি আর আলু মরিচের দম হলেই হবে।
ভাবিনী আজও মনে মনে নাক-কান মলে বলে, ওমা তাই কি আবার খেতে পারে মানুষ? একটু সোনামুগের ডাল চড়াচ্ছি
এ্যাই দ্যাখো! আবার ওই সব! তাই এত দেরি হচ্ছে! দরকার নেই দরকার নেই, ওই যা হয়েছে তাই দিয়ে দাও।
দিয়ে তো দেবে, কিন্তু আলু-মরিচের দম কই?
আলু তো এখনও ঝুড়িতে।
অগত্যাই হাটে হাঁড়ি ভাঙতে হয় ভাবিনীকে। সবটা নয়, হাঁড়ির কানাটা। বলতে হয়, একটু অপেক্ষা কর, দেরি আছে।
নিতাই ছটফট করে আর বলতে থাকে, ও না হয় পরেই হবে। শুধু গুড়-রুটিও মন্দ না।
অতএব শুধু গুড়-রুটিই ধরে দিতে হয় ভাবিনীকে স্বামীর পাতের গোড়ায়।
আর জোর ক্ষিদের মুখে সেই গুড়ের ডেলা এবং আটার পিণ্ডি দর্শনে নিতাইয়ের সমস্ত রক্তকণিকা মুহূর্তের মধ্যে অগ্নিকণিকায় পরিণত হয়ে মার মার করে ওঠে।
থালাটা ধরে দিয়েই ছুতো করে রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছিল ভাবিনী। হঠাৎ থালা-আছড়ানোর ঝনঝন শব্দে চমকে বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। এতটা আশঙ্কা ছিল না তার। কিন্তু দেখল থালাটা অদূরে নিক্ষিপ্ত।
সব কখানা রুটি একসঙ্গে তাল করে হাতে চটকে নিতাই চেঁচাচ্ছে, কী হয়েছে কী এ? আমার ছেরাদ্দর পিণ্ডি! বলি দুখানা রুটি গড়বারও যদি ক্ষমতা না থাকে, বল নি কেন আগে? কোন শালা বেকুব খেতে চাইত তা হলে? আমার যেমন মুখ্যমি: বাজার থেকে দু আনার পুরী-তরকারি কিনে এনে খেলেই চুকে যেত। তা নয়, সাধ করে রুটি খেতে চাইলাম আমার কর্মিষ্ঠ পরিবারের কাছে। হুঁ! বোঝা উচিত ছিল এসব সভ্য কাজ সবাইয়ের জন্যে নয়। সেই যে বলে– বাপের জন্মে নেইকো চাষ, ধানকে বলে দুর্বোঘাস! এ হচ্ছে তাই। তা শহরে যখন এসেছ, সভ্য কাজ একটু শিখতে হবে বৈকি। তোমার ধান সেদ্ধ টেকি কোটার মহিমা তো চলবে না এইখানে। তাই পরামর্শ দিই– একবার আধবার বৌঠানের কাছে গিয়ে মানুষের মতন কাজকর্ম শিখে এসো দু-একখানা–
বড্ড বেশী খিদের মাথায় বড্ড বেশী আশাভঙ্গ হয়েই বোধ করি মেজাজের ওপর রাশ রাখতে পারে নি নিতাই। কিন্তু সকলেরই ধৈর্যের সীমা আছে।
বিশেষ অপ্রতিভ হয়ে গিয়েছিল বলেই এতগুলো কথা নীরবে শুনেছিল ভাবিনী, মানুষটার খিদের মাথায় উত্তর-প্রত্যুত্তর করবে নাই ভাবছিল, এবং মনে মনে আঁচ করছিল রাগটা একটু নরম হলে বরং তুতিয়ে পাতিয়ে চারটি খই দুধ
কিন্তু শেষরক্ষা হল না।
শেষ টানটা আর সইতে পারল না যন্ত্রের তার। ছিঁড়ে পড়ল ঝনঝনিয়ে।
পড়বেই।
তোমার গায়ে আমার পায়ের আগাটা একটু ঠেকে গেছে বলে তুমি আমায় কষে লাথালে আমি সইব? তোমার গোয়ালে আমার তামাকের কাঠকয়লাখানা ছিটকে পড়েছে বলে আমার ঘরে তুমি আগুন দেবে আর আমি চুপ করে থাকব? তোমার বাগানে আমার ছাগলটা একবার মুখ লাগিয়েছে বলে গরুর পাল ঢুকিয়ে আমার তাবৎ বাগান তুমি মুড়োবে, আমি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকব?
ইয়ার্কি নাকি? মানুষ মানে পাথর নয়।
