অতএব নিতাইয়ের বৌ যদি কলকাতায় যায়ই, জাতিপাত হবে না। তা ছাড়া নেহাৎ অগঙ্গার দেশও নয় যখন। বরং কালীঘাটের কালীমাতা বিদ্যমান।
জমি আপনিই প্রস্তুত হয়ে ছিল।
তবে নিতাই এত জানত না। নিতাই এক কথায় মত পেয়ে অবাক হয়েছিল।
কিন্তু সে আর কতটুকু?
এখন নিতাইকে মুহূর্তে মুহূর্তে অবাক করছে ভাবিনী।
সে যেন আর এক মূর্তি পরিগ্রহ করেছে।
নিতাই কি স্বপ্নেও ভেবেছিল ভাবিনীর এত মুখ আছে?
কিন্তু ভাবিনীকেও দোষ দেওয়া যায় না।
প্রথম কথা, সে এসেছে ঘাঁটি রক্ষা করতে, বরকে শায়েস্তা করার ব্রত নিয়ে। দ্বিতীয় কথা, এই এতদিনের বিবাহিত জীবনে ‘মুখ’কে অবিরত চুপ করিয়েই রেখে এসেছে ভাবিনী, তা সে ভয়েই হোক আর সুখ্যাতি কিনতেই হোক। সেই রাখার একটা প্রতিক্রিয়া তো দেখা দেবেই।
তৃতীয় কথা হচ্ছে, এখন আর সে মুখকে চুপ করিয়ে রাখার কোনও প্রয়োজন নেই। অতএব এই দীর্ঘকালের রুদ্ধ জল বাঁধ ভেঙে প্রবল কল্লোলে নিজেকে বিস্তার করতে শুরু করেছে।
উঠতে বসতে নিতাই বাক্যবাণে জরজর!
অথচ উল্টে চড়ে ওঠবার মুখ তার নেই, কোথায় যেন হার হয়েছে তার। বোঝা যায় না হারটা কোথায়, অথচ কী এক লজ্জা মাথা তুলতে দেয় না।
আবার সব থেকে মর্মান্তিক এই, যেখানে নিতাইয়ের পূজার বেদী হৃদয়ের নৈবেদ্য, ঠিক সেখানেই যেন ভাবিনীর যত আক্রোশ। সত্যবতীর নামে জ্বলে ওঠে সে। অথচ কেন এই অগ্নিদাহ, হৃদয়ঙ্গম হয় না নিতাইয়ের। মানুষ জাতটা কি এতই অকৃতজ্ঞ।
নিতাই ভাবে, কার দয়ায় বাসায় আসতে পেলি তুই? কে তোর জন্যে সংসার গুছিয়ে রেখেছিল? কে তোর স্বামীকে বিপথ থেকে সুপথে আনল? এত স্বাধীনতা এত বাবুয়ানা থাকতো কোথায় তোর যদি সত্যবতী না সুপারিশ করত? ধান সেদ্ধ করতে করতে, ক্ষার কাঁচতে কাঁচতে আর পেঁকিতে পাড় দিতে দিতেই তো জীবন কাটছিল, আর তাই কাটত।
তা তার জন্যে কৃতজ্ঞতার বালাই মাত্তর নেই! জানে না নাকি! নিতাই তো কলকাতার বাসায় পা দিয়েই বলেছিল, এই যে গিন্নেপনার স্বাধীনতাটি পেলে, এর কারণ স্বরূপ হচ্ছে সেই মানুষটি! বৌঠান না হুকুম করলে কোন শালা এত ঝামেলা পোহাতে যেত।
ভাবিনীর যে ‘মুখ’ বলে একটা বস্তু আছে, সেই দিনই যেন হঠাৎ একটু আভাস পেয়েছিল নিতাই। ঝপ করে বলে উঠেছিল ভাবিনী, সভ্য শহরে বাসা করলে বুঝি কথাবাত্রা এমন চোয়াড়ে হয়!
তা ইদানীং কথাবার্তা একটু অসভ্য হয়ে গিয়েছিল নিতাইয়ের। যে সঙ্গের যে ফল! যে বন্ধু তাকে উচ্ছন্নের পথ চেনাচ্ছিল, সে নিজে যে দরের, তার গতিবিধিও তেমনি দরের ঘরে। কাজেই কথাবার্তা চালচলনে একটু প্রভাব পড়বেই, না পড়ে যাবে কোথায়?
নিতাই ‘শালা’ শব্দটা উচ্চারণ করেই ঈষৎ লজ্জিত হয়েছিল, ভাবিনীর মন্তব্যে আরো দমে গিয়ে বলল, এ্যাই দেখো! বাসায় পা দিতে না দিতেই যে গিন্নীত্ব শুরু করলে!
সেদিন ওইটুকুর ওপর দিয়েই গিয়েছিল।
কিন্তু দিনে দিনে কলা চাঁদ বেড়ে যায়। এখন ষোল কলায় বিকশিত হয়ে উঠেছে ভাবিনী।
আজ সকালেই হয়ে গেল একচোট।
রাত থেকে মাথাটা টিপটিপ করে সর্দিজ্বর মত হয়েছিল নিতাইয়ের, বলেছিল ভাতও খাব না, অফিসও যাব না। শুনে একটু প্রসন্নই হয়েছিল ভাবিনী। বাজা মানুষ, সারাটা দিন একাই কাটে, এ তবু বাড়িতে থাকবে লোকটা। চোরের রাত্রিবাস, একটা দিন একটা দিনই! ছুটির দিনগুলো তো নিতাইয়ের কাটছে আজকাল এক নতুন নেশায়। ঠিক নতুনও নয়, পুরোনো নেশা ঝালানো। দেশে গ্রামে তো ওই ছিল একমাত্র আনন্দ। মাছধরা ধরেছে আজকাল নিতাই আর নবকুমার ফি রবিবার।
অফিসের সহকর্মীদের মধ্যে অনেকেরই একটু এদিকে সেদিকে বাড়ি বাগান পুকুর আছে, তারা নেমন্তন্ন করে মাছ ধরতে। অতএব শনিবার দুপুর থেকেই ছিপ হুইল বঁড়শি চার’ নিয়ে ব্যস্ততা পড়ে যায় দু বাড়িতে।
সে যাক।
আজ রবিবার নয়, তাই খুশি হল ভাবিনী। আর শহরের বাসায় কম কাজ করে করে আয়েসী হয়ে যাওয়া মনে ভাবল, যাক, তাহলে আজ রাঁধবই না। ও যেমন ভাতের বদলে মুড়ি চিড়ে খেয়ে থাকবে, আমিও তাই থাকব। তবে আজ তিথিটা ভাল নয়, দশমী। এয়োৎ রক্ষে করতে একটু মাছ মুখে দেওয়া দরকার। তা রাতে সে লক্ষণটুকু পাললেই হবে। কলসীতে কৈ মাছ জিয়ানো আছে।
সেই মন নিয়েই খানিক বেলায় আধসেলাই কথাখানা আর ছুঁচসুতো পেড়ে নিয়ে বসেছিল ভাবিনী। নিতাই ঘরে শুয়ে পা নাচাচ্ছিল। হঠাৎ উঠে এসে বলল, এ কী, রান্না না চড়িয়ে কথা পেড়ে বসেছ যে?
ভাবিনী মুখ কুঁচকে বলে, তুমিই যখন খাচ্ছ না, তখন আর নিজের জন্যে কে আবার হাঁড়ি নাড়ে!
নিতাই অবাক হয়ে বলে, তার মানে? আমি খাব না বলে তুমিও হরি মটর? ছি ছি, এ আবার একটা কথা নাকি? খাবে কি?
ভাবিনী একটা উচ্চাঙ্গের দার্শনিক ভঙ্গী করে বলে, মেয়েমানুষের আবার খাওয়া ও তোমার সঙ্গে দুটো খই-মুড়ি খেলেই হবে।
এ্যাই দ্যাখো! চুলোই জ্বালবে না?
দরকার তো দেখছি না কিছু– নিতাই ইতস্তত করে বলে, তবে আর কথা কি! নইলে ভাবছিলাম
কি ভাবছিলে?
নাঃ থাক! ভাবিনী কাথা সরিয়ে রেখে বলে, থাকবেই বা কেন? বলই না?
নিতাই বলে, না, মানে বলছিলাম কি তেমন কিছু জ্বর তো হয় নি, আলুমরিচের দম দিয়ে দুখানা গরম গরম রুটি খেলে মন্দ হত না।
রুটি!
রুটি শুনেই ভাবিনীর মাথায় বজ্রাঘাত হয়। রুটি কথাটাই শুনেছে এ যাবৎ, হাতে করে গড়ে নি কখনো। তাদের গায়ে-ঘরে ও বস্তুর চলনই নেই। ভাত খাও ভাত, না খাও মুড়ি আছে চিড়ে আছে, খই বাতাসা ফুলুরি কলাইসিদ্ধ আছে, যেমন যার শরীরের অবস্থা বুঝে সেবা কর। রুটির কথা ওঠে না!
